বিদূষক বলল রাজাকে, গরম কড়াইতে গোটা মাছ ছেড়ে দিয়ে মেয়েরা যেমন তার মৃত্যু কামনা করে, ঘোড়া তৈলাক্ত জিনিস খায় না জেনেও যে নির্বোধি তার বিচালিতে তেল মেশায়, তেমনি আপনিও নির্বোধের মতো বৃথা চেষ্টা করছেন আপনার ক্রোধকে প্রমাণ করতে।
রিগান বলল, বাবা আপনি আমার শ্রদ্ধা নেবেন।
পূর্বের সবকিছু ভুলে গিয়ে লিয়ার বললেন, আমি জানি তোমরা উভয়েই খুশি হয়েছ আমি আসায়।
রিগান বলল, প্রিয় বাবা, আমার বিবেচনায় সে যদি আপনার উদ্ধত উচ্ছঙ্খল নাইটদের আচরণের প্রতিবাদ করে থাকে, তাহলে সে ঠিকই করেছে। আপনার এই মানসিক অসুস্থত। আর দোষহীন দুর্বলতা, যা বার্ধক্যের কারণে হয়েছে বলে আপনি মনে করেন, তার একমাত্র প্রতিকার কারও কাছে অনুগত হয়ে থাকা। তাই বলছি আপনি অন্যায় স্বীকার করে ফিরে যান তার কাছে।
অবাক হয়ে বললেন লিয়ার, কী বলছি, আমি ক্ষমা চাইব? তুমি কি আমায় দীন-হীন ভিখারির বেশে দেখতে চাও? এই বলে নতজানু হয়ে রাজা বললেন, আমি করজোড়ে তোমার কাছে পোশাক, খাদ্য এবং আশ্রয় ভিক্ষা চাইছি! ভেঙে পড়লেন রাজা লিয়ার।
রিগান বলল, না সেটা সম্ভব নয়।
লিয়ার বললেন, আমার অনুচরের সংখ্যা কমিয়ে দেবার কথা বলে গনেরিল অপমান করেছে আমায়। রূপ আর শক্তির গর্বেই সে সাহস পেয়েছে। এরূপ কাজ করার। সে ধ্বংস হয়ে যাবে ভগবানের অভিশাপে।
কিন্তু তুমি এক মধুর স্বভাবের মেয়ে। আমার শাখ-আহ্রদ বন্ধ করে দিয়ে আমায় অপমান করতে তুমি সাহসী হবে না। আর সে ইচ্ছাও তোমার নেই, তা আমি জানি। আমি তোমার বাবা আর তুমি আমার অর্ধেক সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী— সেকথা তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাবে না। এই কথা বলে থেমে গেলেন রাজা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর কেন্টের কথা মনে পড়ল রাজা লিয়ারের। তিনি বললেন, আমি জানতে চাই কার এত দুঃসাহস যে আমার দূতের পায়ে এই যন্ত্রণাদায়ক কাঠের খুঁটোটা পরিয়েছে?
এমন সময় দূর থেকে জোরদার গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে কর্নওয়াল জিজ্ঞেস করল রিগানকে, কে এল?
বোধ হয় আমার দিদি। তারই আসার কথা ছিল, বলল রিগান। তারপর অসওয়াল্ডকে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করল, দিদি কি আসছেন?
অসওয়াল্ডকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন রাজা লিয়ার, আমার সামনে থেকে তুই দূর হয়ে যা ঘৃণ্য গনেরিলের প্রশ্রয় পাওয়া পাজি শয়তান চাকর কোথাকার! তারপর রিগানকে বললেন, আমার দূতের পায়ে কে খুঁটা পরিয়েছে। আশা করি তুমি তা জান না। হে ঈশ্বর, মানুষের প্রতি তোমার মমতা সাহায্য করুক আমায়। হায় রিগান, এই ঘৃণ্য নারী গনেরিল তোমার এত প্রিয়, যে তুমি ওর হাত ধরেছ।
উদ্ধতভাবে উত্তর দিল গনেরিল, অবুঝের মতো তোমার কাজ-কৰ্মই বিচারের শেষ কথা।।।
লিয়ার বললেন, আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। আমার সহ্যশক্তির সীমা দেখে। বল, কে আমার দূতের এ অবস্থা করেছে?
আমি করেছি, বলল কর্নওয়াল, কিন্তু তাতেও ওর উপযুক্ত শাস্তি হয়নি।
অবাক হয়ে বললেন লিয়ার, তুমি, তুমি করেছ এ কাজ?
রিগান বলল, বাবা, আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন, আগের মতো আর সবল নন। এখন আপনার উচিত ভাগাভাগি করে একবার আমার কাছে অন্যবার দিদির কাছে গিয়ে থাকা। বর্তমান অবস্থায় আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় আপনাকে আশ্রয় দেওয়া।
লিয়ার বললেন, তার চেয়ে আমি বন্য জন্তুর সাথে বাস করব, সহ্য করব দারিদ্র্যের চরম কশাঘাত, প্রয়োজনে আশ্রয় ভিক্ষা চাইব ফ্রান্সের রাজার কাছে–তবুও আমি সেখানে যাব না অনুচরদের ছেড়ে। সেরূপ পরিস্থিতি হলে আমি বরং ক্রীতদাসটার অবশ্য হয়ে থাকব, তবুও সেখানে যাব না। আশা করি তুমি আমায় সেরূপ দুর্ভাগ্যের মুখে ঠেলে দেবে না। রিগান। আমার দেহের দুষ্ট ক্ষত হলেও আমি তো জানি তুমি আমারই মেয়ে। আমি তোমায় অভিশাপ দেব না। নিজের ভুল একদিন তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।
আমি বরঞ্চ আমার অন্য মেয়ে রিগানের কাছেই থাকব। আর সাথে রইবে একশোজন নাইট।
রিগান বলল, আমার কিন্তু ইচ্ছে নয় বাবা যে আপনি আমার কাছে থাকেন। বুড়ো হয়ে আপনার জ্ঞান-গাম্যি সব লোপ পেয়েছে। একমাত্র আমার দিদিই সঠিক জানে সে কী করেছে।
লিয়ার বললেন, তোমার কি মনে হয় তুমি যা বলছি তা সত্য?
রিগান বলল, হ্যাঁ, আমি সত্যি কথাই বলছি। খুব বিপদের দিনেও পাঁচিশজন লোক রাখার কোনও অর্থ হয় না। আর মালিকানা যেখানে ভাগ হয়ে গেছে, সেখানে এত লোকের মাঝে বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
এবার গনেরিল আর রিগান দুজনেই একসাথে বলল, বাবা, আমাদের সাথে না থাকার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণই আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা তীক্ষ নজর রাখব যাতে আপনার প্রতি কোনও অন্যায় না হয়।
রিগান বলল, পাচিশ জনের বেশি নাইট কিন্তু আপনি সাথে রাখতে পারবেন না।
লিয়ার বললেন, ওরে অকৃতজ্ঞ মেয়েরা, তোরা কি ভুলে গেছিস যে সব সম্পত্তি আমারই?
আপনার যথাসর্বস্ব। আপনি দান করেছেন আমাদের, উত্তর দিল রিগান।
লিয়ার বললেন, আমি চাই না সে সব সম্পত্তি ফেরত নিতে। কিন্তু কোন সাহসে তোরা বলছিস আমার অনুচরের সংখ্যা কমাতে?
উদ্ধতভাবে আবারও তার মতামত ব্যক্ত করল রিগান।
ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও অসহায়ভাবে বললেন রাজা, উপরে ভালোমানুষির নিচে তোর এই নীচ মনের কথা আগে জানা ছিল না। গনেরিল, একশোর অর্ধেক পঞ্চাশ হলেও তা কিন্তু পাঁচিশের দ্বিগুণ। আজ থেকে তোর প্রতি আমার ভালোবাসাও দ্বিগুণ হল, আমি তোর কাছেই থাকব।
