গনেরিল বলল, এখানে যা লোক আছে তার ডবল লোক সেখানে সেবা করবে আপনার। কিন্তু আপনার অনুচরদের সেখানে নিয়ে যাবার কোনও দরকার নেই।
লিয়ার বললেন, কেউ জানে না, প্রয়োজনের সীমা কোথায়। শীতনিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক থাকা সত্ত্বেও যেমন তুমি অতিরিক্ত কিছু পরেছ, তেমনি মনে রেখ প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা কিছু মানুষকে পশুদের চেয়ে আলাদা করে তা হল সহনশীলতা। এই সহনশীলতাই এখন আমার দরকার। হে ঈশ্বর, তুমি করুণা করে এই বুড়ো লোকটির সহ্যের সীমা বাড়িয়ে দাও। তোমার চক্রান্তেই যদি আমার মেয়েদের মন বিষিয়ে ওঠে তাহলে তোমার কাছে আমার মিনতি, চোখের জলে আমায় নাভিজিয়ে সাহায্য কর আমার রাজ্যকে জ্বলে উঠতে। তাই কাঁদব না। আমি, ফেলব না চোখের জল। এই ঝড়জলের মাঝে যদিও আমায় আশ্রয়হীন হয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে হবে, তবুও কেঁদে কেঁদে আমি ভারাক্রাস্ত হতে দেব না। আমার মনকে। সব কষ্ট সহ্য করব আমি। কী বোকা আমি। এই অসহ্য যাতনা পাগল করে তুলেছে আমায়–বলেই ছুটে বেরিয়ে গেলেন রাজা। সেই সাথে গ্লস্টার ও বিদূষকও চলে গেলেন সে স্থান ছেড়ে।
রিগান বলল, এই ছোটো বাড়িটাতে একসাথে থাকার জায়গা হত না বুড়ো আর তার অনুচরদের।
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশা জলাঞ্জলি দিয়ে এই ঝড়ের রাতে দুর্ভোগ পোহাবার জন্য দায়ী তার নিজের বোকামি, বলল গনেরিল।
রিগান বলল, লোকজন ছাড়া তার নিজের ঢোকার ব্যাপারে তো কোনও বাধা ছিল না।
নিশ্চয়, বলল গনেরিল; কিন্তু গ্লস্টারকে দেখছি না কেন?
কর্নওয়ালের ডিউক বলল, তিনি গেছেন রাজার সাথে। আবার ফিরে আসবেন।
এ সময় গ্লস্টার ফিরে এসে বলল, রাগে পাগল হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যেতে চান রাজা।
কোথায়? জানতে চাইল রিগান।
গ্লস্টার উত্তর দিলে, জানি না।
তার চলে যাওয়াই উচিত, বলল অসওয়াল্ড।
সায় দিয়ে বলল গনেরিল, তাকে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করা আমাদের উচিত নয়।
কিন্তু বিষণ্ণতার ছায়া পড়ল গ্লস্টারের মুখে। তিনি বললেন, একেই এই ঝড়-জলের রাত, তায় ঘন অন্ধকার। এর মধ্যে কী করে বাইরে যাবেন তিনি?
অমনি তাড়াতাড়ি বলল রিগান, একগুয়ে লোকদের স্বভাবই এই। আর গুণের দিক দিয়ে ওর সঙ্গী-সাথীরা আরও এককাঠি উপরে। যাইহোক, দরজাটা দিয়ে দাও যাতে তারা কেউ ঢুকতে না। পারে।
চিৎকার করে জানতে চাইল কেন্ট, এই দুর্যোগপূর্ণ রাতে কে ওখানে?
উত্তর এল, আমি ওই লোক যার কাছে প্ৰচণ্ড ঝড় কোনও নতুন কথা নয়।
কেন্ট বলল, গলা শুনে আমি তোমায় চিনতে পারছি না। তুমি তো রাজার অনুচর। তাহলে বল রাজা কোথায়?
রাজানুচর বলল, পাগল হয়ে তিনি আজ ছুটে বেড়াচ্ছেন গুহায় গুহায়। এই পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে ফেলার জন্য তিনি ব্যথিত হৃদয়ে অনুরোধ করছেন সমুদ্রের জলরাশিকে। প্রবল ঝড়বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দুহাতে মাথার চুল উপরে তুলে বিপদের বাতাবরণকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি মেতে উঠেছেন এক বিকৃত বীভৎস খেলায়। শুধুমাত্র বিদূষককে সাথে নিয়ে অনবরত চিৎকার করে চলেছেন তিনি।
বিদূষক ছাড়া আর কি কেউ তার সাথে নেই? জানতে চাইল কেন্ট।
না, আর কেউ নেই। শুধু সেই চেষ্টা করছে হালকা হাসির মধ্যে দিয়ে রাজার শোক কমিয়ে দেবার, উত্তর দিল অনুচর।
কেন্ট বলল, শোন, তুমি আমার বিশেষ পরিচয়। তোমাকে একটা গোপন কথা বলতে চাই আমি। কথাটা বাইরে প্রকাশ না পেলেও জেনে রেখা একটা ঠান্ডা লড়াই চলছে আলবেনি আর কর্নওয়ালের মাঝে। তারা একে অপরকে ঠকিয়ে রাজ্যের উন্নতি করতে চাইলেও তাদের ভূত্য ও অনুচরেরা রাজার উপর আরোপিত ষড়যন্ত্র, তার প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের যে খবর শুনছে। দেখছে–তা সবই গোপনে পাঠিয়ে দিচ্ছে ফ্রান্সে। একদল ফরাসি সৈন্যও গোপনে রয়েছে বন্দরে। আমার নির্দেশ অনুযায়ী তুমি তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে রাজার দুরবস্থার কথা। একজন লোককে জানাবে। পারিশ্রমিক হিসেবে এই থলিটা আমি তোমায় দিচ্ছি। আর ফ্রান্সের রানি কার্ডলিয়ার সাথে দেখা করে এই আংটিটা তাকে দিলেই তিনি তোমায়ে জানিয়ে দেবেন। আমার পরিচয়। এবার তুমি যাও।
অনুচরটি কিছুদূর যাবার পর ফের তাকে ডাকলেন কেন্ট, বললেন, ওহে শোন, আগের চেয়েও একটা বেশি গোপনীয় কথা আছে তোমার সাথে। কথাটা হল, যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের রাজাকে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের উভয়ের মধ্যে যেই আগে খবরটা পাক, সে তা জানিয়ে দেবে অন্যদের। খুব সাবধান, এ কথা যেন কেউ জানতে না পারে।
আপনার আদেশ যথারীতি পালিত হবে— বলে অনুচর বিদায় নিল।
লিয়ার বললেন, হে বাতাস, তুমি সমস্ত শক্তি দিয়ে চূর্ণ করে দাও এ পৃথিবীটাকে। আমার রাজ্যের আগুনকে বাড়িয়ে দিয়ে তুমি তৈরি কর দাবানল। হে মেঘ, অঝোর ধারায় বর্ষিত হয়ে তুমি নেমে এস পৃথিবীতে, ধুয়ে মুছে শেষ করে দাও সবকিছু। অবিশ্রান্ত আঘাত হানো গির্জাগুলির চুড়ার উপর। হে আগুন, দ্রুতগতিতে নেমে এসে তুমি জ্বালিয়ে দাও আমার সাদা দাড়ির গোছগুলি আর তোমার প্রভু কঠিন বজকে বলো যেন তার আমোঘ শক্তিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এই পৃথিবীটা আর সে যেন ধ্বংস করে দেয় অকৃতজ্ঞ মানুষের বাসস্থান-মোয়াজলে ঘেরা এই বিশ্বকে।
বিদূষক বলল, আপনি বরং ঘরে এসে ওদের তোষামোদ করুন। আজকের রাতটা বড়োই দুৰ্যোগপূর্ণ।
আপন মনে বললেন লিয়ার, হে প্রাকৃতিক বস্তুসমূহ! তোমরা নিশ্চয়ই আমার মেয়ের মতো অকৃতজ্ঞ নও কিংবা আমার অধীনও নও। এক অসহায় দুর্বল বৃদ্ধ করজোড়ে মিনতি জানাচ্ছে তোমাদের কাছে–আরও প্রবল এবং প্রচণ্ড হয়ে ওঠ তোমরা। হে বিদ্যুৎ, আগুন, বাতাস, তোমরা সবাই নেমে এস আমার মাথার উপর। তোমরা আর দেরি করো না। এই দেখ, এক ক্রীতদাসের মতো আমি তোমাদের করুণাপ্রার্থী। আমায় দয়া করে তোমরা।
