০২.
যুদ্ধ শেষ হবার পর ঘোড়ায় চেপে ম্যাকবেথ আর ব্যাংকে রওনা দিলেন ফরেসের শিবিরের দিকে। তারা কেউই লক্ষ করেননি যে ঘন কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে সারা আকাশ। অল্প কিছুদূর যাবার পরই প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল। মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে চারদিক, বাজপড়ার শব্দে কেঁপে উঠছে পায়ের নিচের মাটি। যুদ্ধ জয়ের আনন্দে মগ্ন থাকলেও প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করতে লাগলেন ম্যাকবেথ; যেতে যেতে এমন একটা জায়গায় এসে পড়লেন তারা যার একদিক খোলা অন্য দিক পাহাড়ঘেরা জলা। সেই জলা থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে কুয়াশার মতো ঘন ধোঁয়া। সেদিকে তাকিয়ে মানুষের মতো দেখতে তিনটি অদ্ভুত প্রাণীর দেখা পেয়ে ঘোড়া থেকে নেমে এলেন তারা। তাদের গড়ন মেয়েদের মত হলেও প্রত্যেকের মুখেই দাড়ি। তাদের হাড় বের করা শীর্ণ মুখ আর কোটরে বসা চোখ দেখে মনে হয় না। তারা পৃথিবীর প্রাণী। তারা সত্যিই পৃথিবীর প্রাণী নয়— আসলে তারা জলার ডাইনি। দৈববাণী শোনাবার নামে মানুষকে কুবুদ্ধি দিয়ে তার সর্বনাশ করাই এদের উদ্দেশ্য।
আপন মনে ঘুরে ঘুরে নাচছিল ওই তিন ডাইনি— ছড়ার ধরনে হেঁয়ালির মতো অদ্ভুত কথাবার্তা বলছিল তাদের নিজেদের মধ্যে। কথাগুলো এইরকম–
একজন বলল, মন-জলের এই বিজন রাতে,
আবার কবে মিলব মোরা একসাথে?
দ্বিতীয় জন উত্তর দিল –
তাণ্ডবের পালা শেষ হলে
হারা-জেতা মিটে গেলে
এমন সময় দূর থেকে ভেসে এল বিজয়ী ম্যাকবেথ বাহিনীর ভেরী আর দামামার আওয়াজ। সেই শুনে চেঁচিয়ে উঠে বলল তিন ডাইনি—
বাজে এই সেনাদের দামামা,
তুর্য উঠেছে আজ ম্যাকবেথের সূর্য।
দূর থেকে ওই সব কথা বলেও তা স্পষ্ট শুনতে পেলেন ম্যাকবেথ আর ব্যাংকো।
সাহসে ভর করে দূর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন ব্যাংকো, জিজ্ঞেস করলেন, কে তোমরা? মেয়েদের মতো দেখতে হলেও তোমাদের তিনজনের মুখেই রয়েছে দাড়ি। তাই মেয়েমানুষ বলে মেনে নিতে পারছি না তোমাদের। এবার ব্যাংকের পেছন থেকে ম্যাকবেথও এসে দাঁড়ালেন তাদের সামনে, জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা যদি কথা বলতে পোর, তাহলে নিজেদের পরিচয় দাও।
প্রথম ডাইনি বলল, গ্রামিশ-এর থেন ম্যাকবেথ, তুমি আমাদের অভিনন্দন গ্ৰহণ কর।
দ্বিতীয় ডাইনি বলল, হে কডর-এর থেন ম্যাকবেথ, তুমি আমাদের অভিনন্দন গ্ৰহণ কর।
এবার বলল তৃতীয় ডাইনি, হে স্কটল্যান্ডের ভাবী রাজা ম্যাকবেথ,আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ কর তুমি।
ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে ধাঁধার মাঝে পড়ে গেলেন ম্যাকবেথ। তিনি অবশ্যই গ্লামিশ-এর থেন, কিন্তু কডর -এর যেন বেঁচে থাকতে কীভাবে তার খেতাবটা পাবেন তিনি? ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারলেন না। ওদিকে, আবার তৃতীয় ডাইনি তাকে স্কটল্যান্ডের ভাবী রাজা বলে অভিনন্দন জানিয়েছে। তিনি কিছুতেই ভেবে পেলেন রাজা ও তার দুই ছেলে বেঁচে থাকতে কী করে তা সম্ভব।
এগিয়ে এসে ব্যাংকে বললেন, আমার বন্ধুর সম্পর্কে অনেক কিছুই তো বললে তোমরা। এবার আমার ব্যাপারে। যদি কিছু বলার থাকে তো বলে ফেল! তোমরা যেই হও না কেন, মনে রেখা আমি তোমাদের ভয় করি না। আর তোমাদের ভবিষ্যদ্বাণীর উপর নির্ভরশীলও নই আমি। তোমাদের করুণা বা ঘৃণা, কিছুই চাই না আমি।
প্রথম ডাইনি বলল, স্বাগত ব্যাংকো। বয়সে ম্যাকবেথের চেয়ে ছোটো হলেও অন্যদিক দিয়ে তুমি তার চেয়ে বড়ো।
এবার দ্বিতীয় ডাইনি বলল, ব্যাংকে, তোমায় স্বাগত। ম্যাকবেথের মতো সুখী না হলেও অন্যদিক দিয়ে তুমি তার চেয়ে বেশি সুখী।
শেষে মুখ খুলল তৃতীয় ডাইনি, ব্যাংকো! তুমি সিংহাসনে বসবে না ঠিকই, কিন্তু তোমার বংশের অনেকেই রাজা হবে। আমি তোমাদের দু-জনকেই স্বাগত জানাই।
জোর গলায় চেঁচিয়ে বলে উঠলেন ম্যাকবেথ, দাঁড়াও তুমি! কডর-এর থেন বেঁচে থাকতে কীভাবে তার খেতাব পাব আমি? তাছাড়া তোমরা বলেছ। আমি স্কটল্যান্ডের ভাবী রাজা। তা কী করে সম্ভব? কেন শোনালে আমাদের এ সব ভবিষ্যদ্বাণী?
তাদের প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে নিমেষের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলব তিন ডাইনি।
ম্যাকবেথের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল ব্যাংকো, দেখেছ, কেমন অদ্ভুত ভাবে ওরা মিলিয়ে গেল আমাদের সামনে থেকে?
ওরা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ব্যাংকো, জবাব দিলেন ম্যাকবেথ। তবে আরও খানিকক্ষণ ওরা থাকলে ভালো হত। হয়ত ওদের মুখ থেকে ভালো ভালো কথা শোনা যেত।
সত্যিই কি ওরা এখানে ছিল? ম্যাকবেথকে জিজ্ঞেস করলেন ব্যাংকো, নাকি কোনও মাদকদ্রব্য খেয়ে আমাদের বোধ-বুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গিয়েছিল?
ম্যাকবেথ জবাব দিলেন, ওরা তো বলল তোমার বংশেরও কেউ কেউ রাজা হবে।
ওরা এও বলেছে তুমি নিজেই রাজা হবে, বললেন ব্যাংকো।
একই সঙ্গে ওরা বলল আমি নাকি কডর-এর থেন হবে— বললেন ম্যাকবেথ, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না। কীভাবে তা সম্ভব হবে।
ম্যাকবেথের কথা শেষ হতে না হতেই ঘোড়ায় চেপে সেখানে এসে হাজির রাজা ডানকানের দুই অমাত্য। ঘোড়া থেকে না নেমেই তারা ম্যাকবেথকে অভিবাদন জানিয়ে বলল, বিদ্রোহ দমনে আপনার ভূমিকায় মহারাজ খুব খুশি হয়েছেন। আপনার এই অসাধারণ কৃতিত্বের পুরস্কার স্বরূপ মহারাজ। আপনাকে কডর-এর থেন খেতাবে ভূষিত করেছেন। আমরা এসেছি আপনাকে রাজসভায় নিয়ে যাবার জন্য।
