অন্যদিকে ক্রেসিডাকে গ্রিক শিবিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রয়ের সেনাপতি ইনিস প্যান্ডারাসের বাগানবাড়িতে এলেন গ্রিক বীর ডায়োমিডিসকে সাথে নিয়ে। কাকার মুখে সব কথা শুনে ক্রেসিডা কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিল ট্রয়লাসের কাছ থেকে। ক্রেসিডাকে হাতে পেয়ে ট্রয়ের বন্দি বীর সেনানায়ক অ্যান্টিনারকে মুক্তি দিল গ্রিক বাহিনী।
পরদিন শেষ বেলায় নিরস্ত হেক্টরকে হত্যা করলেন গ্রিক বীর অ্যাকিলিস। সেনাদের মনোেবল বাড়াতে পরম শত্রু হেক্টরের রক্তাক্ত মৃতদেহ রথের সাথে বেঁধে নিয়ে গোটা যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোরালেন অ্যাকিলিস।
সেদিন রাতে ক্রেসিডার সাথে গোপনে দেখা করতে এলেন ট্রয়লাস। আড়াল থেকে ডায়োমিডিসের সাথে ক্রেসিডার প্রেমালাপ শুনে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল তার মাথায়। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, পরদিন যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করবেন ডায়োমিডিসকে।
ম্যাকবেথ
০১.
প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে ঘোড়ায় চেপে ফরেস -এর শিবিরে ফিরে আসছেন। রাজা ডানকানের দুই সেনাপতি ম্যাকবেথ এবং ব্যাংকো।
খুবই শান্তিপ্রিয় এবং প্রজাবৎসল ছিলেন স্কটল্যান্ডের রাজা ডানকান। রাজার অধীনস্থ সামন্তরা সে সময় রাজার কাছ থেকে থেন খেতাব পেতেন। এই থেনদের মধ্যে সবচেয়ে পরাক্রমশালী ছিলেন ফন্ডর-এর থেন। কিন্তু একদিন তিনিই বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসলেন রাজা ডানকানের বিরুদ্ধে। কডর-এর থেন জানতেন যতই শান্তিপ্রিয় হোন না কেন রাজা ডানকান, বিদ্রোহ দমন করতে তিনি সসৈন্য কাঁপিয়ে পড়বেন তার উপর। আর রাজার সাথে লড়াইয়ে পেরে উঠবেন না তিনি। কারণ রাজার সামন্তদের অধিকাংশই নামি যোদ্ধা। তিনি স্থির করলেন বিদেশি শক্তির সাহায্য নেবেন। স্কটল্যান্ড আক্রমণ করার জন্য তিনি আহ্বান কুরলেন নরওয়ের রাজা সোয়েনো এবং ভাড়াটে আইরিশ যোদ্ধা ম্যাকডোল্যান্ডকে।
সে আমলে নরওয়ের রাজারা ছিল যুদ্ধবাজ। তারা জাহাজে করে অন্যদেশে গিয়ে লুটপাট করত। এ কারণেই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকেরা তাদের জলদসু্য বলে বর্ণনা করেছেন। কডৱএর থেনের ডাক পাবার সাথে সাথেই জাহাজ বোঝাই সৈন্য নিয়ে স্কটল্যান্ড হাজির হলেন নরওয়ের রাজা সোয়েনো। অপরদিকে ভাড়াটে যোদ্ধা ম্যাকডোনাল্ড তার সৈন্যবাহিনী সহ আয়ারল্যান্ডের দিক দিয়ে স্কটল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ল।
ঐ বিদেশিদের সাথে হাত মিলিয়ে কডর -এর থেন এগিয়ে চলছেন রাজা ডানকানের ফৌজী ঘাঁটিগুলি দখল করতে। বিদ্রোহের খবর আগেই পেয়েছিলেন রাজা ডানকান। বিদেশিদের মদতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে কডর-এর থেন স্কটল্যান্ড হানা দিয়েছে শুনে তিনি ডেকে পাঠালেন তার সেনাপতি ও সামন্তদের। তার সেনাপতি এবং সামন্তরা — যেমন ম্যাকবেথ, ব্যাংকো, লেনক্স, ও রস, সেন্টিন, অ্যাঙ্গাস, কেইথনেস প্রমুখ সবাই এসে হাজির হলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ম্যাকবেথ যিনি গ্রামিশ-এর থেন এবং সম্পর্কে রাজার জ্ঞাতি ভাই। তাদের উভয়ের শরীরে বইছে একই বংশের রক্তধারা।
রাজা ডানকান আদেশ দিলেন যে কোনও ভাবেই হোক বিদ্রোহ দমন করে হানাদার বিদেশিদের ধ্বংস করে ফেলতে হবে। রাজাদেশে সেনানী ও সামন্তরা সবাই রওনা দিলেন যুদ্ধে। নিজস্ব বাহিনী নিয়ে তাদের আগে আগে চললেন রাজার বড়ো ছেলে ম্যালকম।
কিন্তু ম্যালকম বেকায়দায় গেলেন ভাড়াটে যোদ্ধা ম্যাকডোনাল্ড ও তার সেনাদের সাথে লড়তে গিয়ে। তাকে বন্দি করার জন্যে ম্যাকডোনাল্ডের নির্দেশে তার সৈন্যরা চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলল তাকে। যুদ্ধ করতে করতেই ম্যালকমের উপর নজর রেখেছিলেন ম্যাকবেথ। তাকে বাঁচাতে তিনি তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুদের উপর। শত্রুদের ধ্বংস করে তিনি ফিরিয়ে নিয়ে এলেন বড়ো রাজপুত্রকে। ম্যালকমকে অন্যদের জিম্মায় রেখে পুনরায় শত্রুনিধনে এগিয়ে গেলেন ম্যাকবেথ। বাঁধভাঙা বন্যার মত বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে। ম্যাকডোনাল্ড, কেউ আটকাতে পারছে না। তাকে। এ অবস্থা দেখে সাহসী সেনানী আর একদল নিভীক সৈনিক নিয়ে ম্যাকবেথ সাহসে ভর করে এগিয়ে গেলেন, কাঁপিয়ে পড়লেন শক্রসেনার উপর। ঘোড়ার পিঠে থাকা অবস্থায় তলোয়ার নিয়ে বহুক্ষণ ম্যাকডোনাল্ডের সাথে লড়লেন ম্যাকবেথ। একসময় তারতলোয়ারের আঘাতে ম্যাকডোনান্ডের হাত থেকে খসে পড়ল তলোয়ার। সাথে সাথে ঘোড়া থেকে নেমে এসে ম্যাকবেথ তার তলোয়ার সরাসরি ঢুকিয়ে দিলেন ম্যাকডোনান্ডের হৎপিণ্ডে। শেষে এক কোপে ম্যাকডোনান্ডের শিরস্ত্ৰাণ সহ মাথাটা কেটে নিয়ে একজন সৈনিককে দিয়ে বললেন, যাও, এটা নিয়ে গিয়ে আমাদের দুর্গের মাথায় টাঙিয়ে দাও। তারপর রাজাকে খবর দিও।
মুখোমুখি লড়াইয়ে ম্যাকডোনাল্ডকে মেরে ফেলার পর ম্যাকবেথ তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেলেন নরওয়েরাজ সোয়োনোর সাথে লড়াই করতে। কিন্তু হানাদারবাহিনী মোটেও দাঁড়াতে পারল না। ম্যাকবেথের নিজস্ব বাহিনীর আক্রমণের সামনে ইচ্ছা করলেই তিনি নরওয়ে রাজকে বন্দি বা হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। জরিমানা স্বরূপ এক জাহাজ বোঝাই টাকা আদায় করে দলবল সহ স্কটল্যান্ড সীমান্ত থেকে তাদের তাড়িয়ে দিলেন।
অমোত্যদের সাথে ফরেস-এর শিবিরে অপেক্ষা করছিলেন রাজা ডানকান। তিনি খুব খুশি হলেন যখন শুনলেন বিদ্রোহ দমন করে হানাদারদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের সীমানা থেকে। শিবিরে উপস্থিত সবার সামনেই কডর-এর থেনকে প্রাণদণ্ড দিলেন রাজা ডানকান। সেই সাথে ঘোষণা করলেন আজ থেকে ম্যাকবেথই কডর-এর থেন।
