এবার সীমাহীন ক্ৰোধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল জনতা। তারা চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ওরে বিশ্বাসঘাতক শয়তানের দল! তোদের কাউকে রেহাই দেব না। আমরা। পুড়িয়ে দেব ব্রুটাসের বাড়ি। সিজার হত্যার প্রতিশোধ নেব আমরা। হত্যাকারীদের বধ করে, তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে ছাই করে দেবার সংকল্প নিয়ে দল বেঁধে এগুতে লাগল। জনতা ব্রিটাস আর ক্যাসিয়াস যখন জানতে পারলেন তাদের ধরতে আসছে, তখন তারা যে যার বাড়ি-ঘর ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে বহুদূরে পালিয়ে গেলেন। তাদের যে সব সহযোগী সিজার হত্যার সাথে জড়িত ছিল, জনতা তাদের খুঁজে বের করে বিনাবিচারে মেরে ফেলল, পুড়িয়ে ছাই করে দিল তাদের ঘর-বাড়ি। এবার ব্রুটাস আর ক্যাসিয়াস বুঝতে পারলেন দেশে ফিরে গেলে জনতার হাতে মৃত্যু হবে তাদের। আর যদিও বা জনতার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যায়, তাহলেও মার্ক অ্যান্টনির হাত থেকে রক্ষা নেই তাদের। অ্যান্টনির হাত থেকে বাঁচতে হলে লড়াইয়ের প্রয়োজন। তাই তারা প্রচুর টাকাকড়ি খরচ করে লড়াইয়ের জন্য অস্ত্ৰ-শস্ত্র এবং সৈন্যর জোগাড় করতে লাগলেন। এরইমধ্যে রোমে এসে পৌঁছালেন সিজারের ভাইপো অক্টেভিয়াস। তিনি বয়সে অ্যান্টনির চেয়ে ছোটো হলেও ভালো যোদ্ধা এবং যথেষ্ট রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন লোক। তাছাড়া রোমের এক শাসক মার্কাস এমিল লেপিডাসকেও বন্ধু হিসেবে পেলেন তিনি। তারা উভয়ে যোগ দিলেন অ্যান্টনির সাথে। অ্যান্টনি অক্টেভিয়াসকে জানালেন যে যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছেন ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াস। এবার তারাও তৈরি হতে লাগলেন শত্রুর সাথে মোকাবিলার জন্য।
সিজারকে হত্যার প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যে তার সেনাবাহিনীর কয়েকজন অভিজ্ঞ সেনানীও যোগ দিলেন মার্ক অ্যান্টনির সাথে। সামান্য কয়েকদিন বাদেই যুদ্ধ বেধে গেল দু-পক্ষের মধ্যে। যুদ্ধ চলাকালীন ব্রুটাসের পত্নী সোফিয়া আত্মহত্যা করলেন বিষ খেয়ে। পত্নীর শোকে মুহ্যমান হয়ে গেলেন ব্রুটাস। ইতিমধ্যে বিবেকের দংশনে অস্থির হয়ে গেছেন তিনি। ক্যাসিয়াসের বুদ্ধিতে সিজার হত্যার চক্রান্তে যোগ দিয়ে তিনি যে মোটেই ভালো কাজ করেননি, সে কথা এতদিনে উপলব্ধি হল তার। যুদ্ধ চলাকালীন মাঝে মাঝেই তার সাথে ঝগড়া ও কথা-কাটাকাটি হতে লাগল ক্যাসিয়াসের। কিন্তু অন্যায়ের সাহায্য নিতে রাজি নন। ব্রুটাস। অথচ অর্থ এবং সৈন্য সংগ্রহের জন্য যে কোনও নীচ কাজ করতে সবসময় তৈরি ক্যাসিয়াস। একদিন তাদের বিবাদ চরমে উঠে গেল। বুদ্ধিমান ক্যাসিয়াস নিজেকে সামলে নিলেন, নইলে হয়ত সেদিন উভয়ের মাঝে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যেত। সেদিন রাতে তাঁবুর ভেতর ব্রুটাসের সামনে আবির্ভূত হলেন জুলিয়াস সিজারের প্ৰেতাত্মা। যাবার আগে সেই প্ৰেতাত্মা বলে গেলেন, আবার দেখা হবে ফিলিগির যুদ্ধক্ষেত্রে।
সিজারের প্ৰেতাত্মা দেখা দিলেও ফিলিগির যুদ্ধে শত্রুসৈনের হাতে পরাস্ত হলেন ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াস। ধরা পড়লে অ্যান্টনি তাদের প্রাণদণ্ড দেবেন। তাই ধরা পড়ার আগেই প্রাণদণ্ডের বিকল্প হিসাবে সম্মানজনক মৃত্যুর আশ্রয় নেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করলেন তারা। যে ছুরি একদিন সিজারের বুকে বসিয়েছিলেন ক্যাসিয়াস, সেই ছুরি বিশ্বস্ত ভূত্য জিন্ডারাসের হাতে দিয়ে তাকে আদেশ দিলেন সে যেন ছুরিটা তার বুকে বসিয়ে দেয়। চোখের জল ফেলতে ফেলতে প্রভুর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল জিন্ডারাস। এবার ব্রুটাসও তার তলোয়ার ভৃত্য স্ট্র্যাটোর হাতে গুজে দিয়ে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সে তলোয়ারের উপর। গোটা তলোয়ারটাই ঢুকে গোল তার হৃৎপিণ্ডে।
সিজারের আত্মার শান্তি হোক — শুধু এইটুকু বলে রক্তাক্ত দেহে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ব্রুটাস।
ইশারায় ব্রুটাসের মৃতদেহকে দেখিয়ে যুবক অক্টেভিয়াসকে বললেন অ্যান্টনি, সবদিক দিয়েই উনি ছিলেন একজন খাঁটি রোমান। সিজার হত্যার চক্রান্তকারীদের একজন হলেও তিনি একজন মহান লোক —প্ৰয়াত সিজারের বিশিষ্ট বন্ধুদের অন্যতম। ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে অন্যান্য সব চক্রান্তকারীরা হত্যা করেছে সিজারকে। একমাত্র উনিই দেশ ও দশের মঙ্গলের কথা ভেবে যোগ দিয়েছিলেন তাদের সাথে।
টাইটাস অ্যাড্রোনিকাস
রোম সম্রাটের মৃত্যুর পর সিংহাসনের অধিকারী কে হবে তাই নিয়ে বিবাদ বেধেছে সম্রাটের দুই ছেলের মধ্যে। বড়ো ছেলে স্যাটার্নিনাস বললেন, আমি সম্রাটের বড়ো ছেলে সেহেতু সিংহাসনে বসার অধিকার একমাত্র আমারই!
সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলে উঠল। ছোটো ছেলে বাসিয়ানাস, হে রোমের জনগণ! আমি যদি কখনও আপনাদের প্রিয় হয়ে থাকি, তাহলে আপনারা আমার সিংহাসনে বসার পথকে সুগম করুন। কিন্তু তাদের কারও দাবি মেনে নিলেন না। রাজপ্রতিনিধি মার্কাস অ্যাভেড়ানিকাস। রোমের পরবতী সম্রাট হিসেবে তিনি ঘোষণা করলেন বীর যোদ্ধা টাইটাস অ্যান্ডোনিকাসের নাম। তার অভিমতকে সমর্থন করলেন সেনেটের সদস্যরা। ঘোষণা শেষ হবার কিছুক্ষণ বাদেই গথ বাহিনীকে যুদ্ধে পরাস্ত করে রোমে ফিরে এলেন টাইটাস অ্যান্ডোনিকাস। তার পেছু পেছু দুজন সৈনিক বহন করে নিয়ে এল একখানা কফিন। এরপর যুদ্ধে পরাজিত গথদের রানি ট্যামোরা ও তার তিন ছেলে অ্যালার্বাস, চিরন এবং ডিমেট্রিয়াসকে বন্দি অবস্থায় নিয়ে এলেন সৈনিকেরা।
