ক্যাসিয়াস বললেন, বুঝতে পারছি না। কী হবে। আমার কিন্তু মোটেও ভালো ঠেকছে না। কাজটা বোধহয় ঠিক হল না।
আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে অ্যান্টনিকে বললেন ব্রুটাস, সমাধি দেবার জন্য এবার তুমি নিয়ে যেতে পার সিজারের মৃতদেহ। সিজারের গুণাবলি সম্পর্কে জনতাকে কিছু বলার থাকলে তাও বলতে পার তুমি। তবে আমার বক্তব্য শেষ হবার পরই তোমার যা বলার তা বলবে।
অ্যান্টনি বললেন, বেশ, তাই হবে। এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না আমি।
বেশ, তাহলে তুমি তৈরি হও আমার পেছন পেছন সিজারের মৃতদেহ নিয়ে যাবার জন্য–বলে ক্যাসিয়াসকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন ব্রুটাস।
সিজারের মৃতদেহ নিয়ে অ্যান্টনি চলে এলেন রোম শহরের মাঝখানে একটা খোলামেলা প্রশস্ত জায়গায়–যেখানে কারও ভাষণ শুনতে বা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে সমবেত হতেন রোমের নাগরিকেরা। সিজারের মৃতদেহ সেখানে নিয়ে যাবার রোমের সাধারণ মানুষ, যারা ভালোবাসতেন অ্যান্টনিকে, তারা দলে দলে এসে সেখানে ভিড় জমাল। ভিড় জমছে দেখে জনতার সামনে এগিয়ে এসে তার ভাষণ শুরু করলেন ব্রুটাস :
হে রোমের অধিবাসীবৃন্দ! তোমাদের মনে স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্ন জেগেছে আজ তারই জবাব দিতে এসেছি আমি। তোমরা সবাই জান আমি ছিলাম সিজারের অন্তরঙ্গ বন্ধু–এ বন্ধুত্ব দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছিল আমাদের মধ্যে। সিজারকে আমি যতটা ভালোবাসতাম, তোমরা কেউ ততটা বাসতে না। সিজার ছিলেন একজন খাঁটি রোমান, মহান বীর–তাই আমি তাকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু দিনে দিনে তার উচ্চাশা বেড়ে উঠছিল। নিজে রাজা হবার জন্য সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে শুরু করছিলেন তিনি। কিন্তু তোমরা জেনে রাখা সিজার আমার যতই প্রিয় হোন না কেন, আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমার জন্মভূমি—রোম। এই রোম থেকে বহুদিন আগে রাজতন্ত্রকে হঠিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছি। গণতন্ত্রের। সেই গণতান্ত্রিক দেশের স্বাধীন নাগরিক তোমরা। হে আমার বন্ধু রোমানরা! আজ সিজার বেঁচে থাকলে তিনি হতেন রাজা আর স্বাধীনতা হারিয়ে তোমরা হতে তার প্রজা। সেই স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই আমরা বাধ্য হয়েছি সিজারকে হত্যা করতে। এবার তোমরাই বিচার কর, বল আমরা ঠিক কাজ করেছি কিনা?
সেখানে উপস্থিত রোমের জনতা সমবেতভাবে বলে উঠল, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তোমরা ঠিক কাজই করেছ ব্রুটাস।
ব্রুটাস বললেন, তোমাদের অভিমত যদি এই হয় তবে তার সাথে আমি একমত। এবার সবাই মন দিয়ে শোন আমার কথা। আমার মতোই মার্ক অ্যান্টনিও ছিলেন সিজারের এক অভিন্নহৃদয় বন্ধু। সিজারকে সমাধি দেবার আগে তিনি তার সম্বন্ধে তোমাদের কিছু বলতে চান। আমি চাই সিজারের প্রতি সম্মান জানাবার জন্য তোমরা সবাই মন দিয়ে তার কথা শুনবে।
ব্রুটাসের বক্তব্য শেষ হবার পর মঞ্চে এলেন অ্যান্টনি। সমবেত জনতাকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন, হে আমার রোমান বন্ধুরা! মাননীয় ব্রুটাস আমায় সুযোগ দিয়েছেন সিজার সম্পর্কে তোমাদের কাছে কিছু বলার। আশা করি তোমরা সবাই মন দিয়ে শুনবে আমার কথা।
সে সময় উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একদল লোক জোর গলায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, আপনার যা খুশি তা বলতে পারেন। তবে আগেই জানিয়ে রাখছি ব্রুটাসের নিন্দ বা সমালোচনা সহ্য করব না। আমরা। আমরা মনে করি সিজারকে হত্যা করে ব্রুটাস ও তার সঙ্গীরা ঠিক কাজই করেছেন।
সে তো নিশ্চয়ই, সায় দিয়ে বললেন অ্যান্টনি, ক্রটাস একজন মহৎ ব্যক্তি, রোমের সবাই জানে সে কথা। কোনও অন্যায় কাজ করতে পারেন না তিনি। আজ আমি এখানে এসেছি সিজারকে সমাধি দিতে, তার প্রশৃংসা করতে নয়। কিছুক্ষণ আগে ব্রুটাস বলেছেন সিজার খুব উচ্চাভিলাষী ছিলেন। ব্রুটাসের অভিযোগ সত্যি হলে বলতেই হবে খুব অন্যায় করেছেন সিজার। আমরা জানি প্রতিটি মানুষই কিছু না কিছু উচ্চাশাকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। সেই সাথে আমরা এও জানি উচ্চাশা জিনিসটাই খারাপ। তবে সিজারের উচ্চাশার কোনও প্রমাণ কিন্তু কেউ পায়নি। এই তো সেদিনের কথা তোমরা সবাইজান, আমি নিজে সিজারের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি নেননি। পরপর তিনবার আমার হাত ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। এবার তোমরাই বল, এর দ্বারা কী প্রমাণ হয় সিজার সত্যিই উচ্চাভিলাষী ছিলেন?
জাদুমন্ত্রের মতো কাজ হল অ্যান্টনির কথায়। ব্রুটাসের কথা শুনে যেমন মোহগ্ৰস্ত হয়েছিল জনতা, অ্যান্টনির কথায় সে মোহের ঘোর কেটে গেল। তারা ভেবে দেখল, সত্যিই তো, যে সিজার বার বার রাজমুকুট প্রত্যাখ্যান করেছেন, তিনি কি উচ্চাভিলাষী হতে পারেন? তাহলে কিছুক্ষণ আগে ব্রুটাস তাদের কী বুঝিয়েছেন? স্বভাবতই এ প্রশ্ন জাগল তাদের। জনতার চোখমুখ আর হাবভাব দেখে অ্যান্টনি বুঝতে পারলেন এবার সফল হতে চলেছে তার উদ্দেশ্য। তিনি এমনভাবে সিজারের গুণাবলির বর্ণনা দিতে লাগলেন যা শুনে কিছুক্ষণ আগে হত্যাকারীদের প্রতি যে সামান্য শ্রদ্ধা-ভক্তি জন্মেছিল জনতার মনে, এবার তা কপূরের মতো উবে গেল। ব্রুটাস, ক্যাসিয়াস, কাসকা ইত্যাদি যারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল সিজারকে, তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠল জনতার মনে।
আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে অ্যান্টনি জনতাকে পড়ে শোনালেন সিজারের উইল। সেই উইলে সিজার তার নিজস্ব বাগান ও অন্যান্য সম্পত্তির কথা ছিল। সেই বাগানে মানুষ আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারবে। তাছাড়া রোমের সাধারণ মানুষকে ভালোবেসে তিনি তাদের প্রত্যেককে নগদ পচাত্তর লিরা করে নগদ অর্থ দান করে গেছেন। উইলটা জনতাকে পড়ে শোনাবার পর অ্যান্টনি বললেন, এমনই মহান মানুষ ছিলেন সিজার। এবার আপনারাই বিচার করে বলুন তিনি উচ্চাভিলাষী ছিলেন কিনা।
