পিস্তলটা ডেস্কের দিকে ছুঁড়ে দিল হেনরি, দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ইনগ্রিডকে। ইনগ্রিডের লাল সুতী শার্টের ওপরের তিনটে বোতাম খোলা, হেনরিকে ভেতরটা হাতড়াবার সুযোগ করে দিল সে। একটু পরই তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। কিন্তু হেনরি শার্টের বোতামে হাত দিতেই তাকে নির্মমভাবে ঠেলে সরিয়ে দিল সে।
পরে, শুকনো গলায় বলল ইনগ্রিড, আগে সব মিটে যাক। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে কম্বলের একটা কোণ একটু সরাল সে, ককপিটের সাইড উইন্ডোর বাইরে চোখ ধাঁধানো রোদ। উজ্জ্বল আলোটা চোখে সয়ে এল। অবজার্ভেশন ডেকের নিচে পাঁচিল ছাড়িয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে হেলমেট পরা সৈনিকদের মাথা, মার্চ করে চলে যাচ্ছে লোকগুলো। মনে মনে খুশি হলো ইনগ্রিড, ওরা তাহলে সৈনিকদেরও ফিরিয়ে নিচ্ছে। এবার কথা বলার সময় হয়েছে। না, আরো একটু ঘামুক ওরা। ইতোমধ্যে ধাতস্থ হয়ে গেছে হেনরি।
উঠে দাঁড়াল ইনগ্রিড, শার্টের বোতাম লাগাল, গলায় স্ট্র্যাপের সাথে ঝুলতে থাকা ক্যামেরাটা অ্যাডজাস্ট করল, তারপর গ্যালিতে একবার থেমে ঠিকঠাক করে নিল সোনালি চুলগুলো। মাঝখানের প্যাসেজ ধরে কেবিনের পুরো দৈর্ঘ্য হেঁটে এল ধীরপায়ে, একবার থেমে ঘুমন্ত একটা শিশুর গায়ে ঠিকমতো টেনে দিল কম্বলটা, আরেকবার থামল গর্ভবতী একজন আরোহীনির অভিযোগ শোনার জন্যে। মহিলার স্বামী টেক্সাসের একজন নিউরোসার্জেন।
বাচ্চারা আর আপনি সবার আগে প্লেন থেকে নামবেন–কথা দিলাম।
নিঃসাড় ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকল সে। জানতে চাইল, এখন কেমন আছে ও?
ঘুমোচ্ছে। মরফিন ইঞ্জেকশন দিয়েছি। মুখের ভেতর আরো কি যেন বিড়বিড় করে বলল মোটাসোটা ডাক্তার, ইনগ্রিডের দিকে একবারও তাকাল না। ইঞ্জিনিয়ারের আহত হাতটা উঁচু করে স্লিংয়ের সাথে বাঁধা হয়েছে, রক্ত বন্ধ করার জন্যে, ক্ষতের ওপর ব্যান্ডেজ তো আছেই।
ডাক্তারের কাঁধে নরম একটা হাত রাখল ইনগ্রিড।
অনেক করেছেন আপনি। ধন্যবাদ। অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল ডাক্তার। ইনগ্রিড হাসছে, কিন্তু ডাক্তারের চোখে ঘৃণার ভাবটুকু তার চোখ এড়ায়নি। নিচু গলায়, যেন আর কেউ শুনতে না পায়, জিজ্ঞেস করল সে, উনি আপনার স্ত্রী? দ্রুত মাথা ঝাঁকাল ডাক্তার, কাছাকাছি একটা সীটে বসা মোটাসোটা ইহুদি মহিলার দিকে একবার তাকাল। আমি দেখব উনি যাতে প্রথম দলটার সাথে নামতে পারেন, ফিসফিস করে বলল ইনগ্রিড। ডাক্তারের চেহারায় কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল। সিধে হয়ে আবার হাঁটা ধরল ইনগ্রিড।
টুরিস্ট কেবিনের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল লাল শার্ট পরা জার্মান যুবক, দ্বিতীয় গ্যালির পর্দা ঢাকা দরজার পাশে। চেহারা দেখেই বোঝা যায়, ফ্যানাটিক। দুটুকরো আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে চোখ, লম্বা চুলে প্রায় ঢাকা পড়ে আছে কাঁধ, ওপরের ঠোঁটের এক কোণে সাদা একটা শুকনো ক্ষতচিহ্ন থাকায় মনে হয় সারাক্ষণ যেন ভেঙচাচ্ছে।
কার্ট, সব ঠিক আছে তো?
খাইখাই করছে সবাই।
আরো দুঘণ্টা পর খেতে দেয়া হবে, তবে পেট ভরে নয় ঘাড় ফিরিয়ে গোটা কেবিনটা ঘৃণাভরে একবার দেখে নিল ইনগ্রিড, চর্বি, হিসহিস করে বললে সে, চর্বিসর্বস্ব বুর্জোয়া শূকর একেকটা। পর্দা সরিয়ে গ্যালিতে ঢুকল সে, ঘাড় ফিরিয়ে কার্টের দিকে আমন্ত্রণ ভরা চোখে তাকাল। চকচকে চোখ নিয়ে তার পিছু নিল কার্ট, গ্যালিতে ঢুকে পর্দাটা টেনে দিল ভালো করে।
ক্যারেন কোথায়? কার্ট তার কোমরের বেল্ট খুলছে দেখে জিজ্ঞেস করল ইনগ্রিড। এখুনি এক দফা সুখ দরকার তার, সাদা ব্যান্ডেজের গায়ে লাল রঙ আর উত্তেজনা তার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
বিশ্রাম নিচ্ছে, কেবিনের পিছনে। কেউ ডিসটার্ব করবে না আমাদের।
শার্টের চেইনটা নিচের দিকে টেনে দিল ইনগ্রিড।
ঠিক আছে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি, কার্ট, মনে থাকে যেন, চাপা রুদ্ধ গলায় বলল সে। ঝটপট।
.
ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারের সীটে বসে আছে ইনগ্রিড, তার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালো চুল ক্যারেন। ওর পরনে উজ্জ্বল লাল স্কার্ট, কাঁধ থেকে ঝুলে আছে কান্ট্রিজ বেল্টটা। কোমরে জড়ানো হোলস্টারে কুৎসিত পিস্তল।
ইনগ্রিডের হাতে ধরা মাইক্রোফোনটা ঠোঁটের কাছে ভোলা, অপর হাতের আঙুল দিয়ে সে তার সোনালি চুলে বিলি কাটছে। শান্ত গলায় কথা বলছে সে। একশো আটানব্বই জন ব্রিটিশ নাগরিক, একশ ছেচল্লিশ জন আমেরিকান, বন্দীদের তালিকা পড়ছে সে। একশ বাইশ জন মেয়ে, বাচ্চাকাচ্চা ছাব্বিশটা, ছয় থেকে দশ বছর বয়স। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে কথা বলছে, সে এতক্ষণে নড়েচড়ে বসল সীটে। মুখ ফিরিয়ে ক্যারেনের দিকে তাকিয়ে হাসল, উত্তরে তার সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে দিল ক্যারেন।
আমরা আপনার শেষ ট্রান্সমিশন কপি করেছি।
নাম ধরে ডাকো আমাকে। আমি ইনগ্রিড, বলিনি? যেন রসিকতা করছে, হাসিতে দুষ্টামির ভাব। অপরপ্রান্তে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, ধাক্কাটা সামলাতে সময় নিল কন্ট্রোলার।
রজার, ইনগ্রিড। আমাদের জন্যে আর কোনো মেসেজ আছে আপনার?
একজন মুখপাত্র চাই, দুঘণ্টার মধ্যে। আরোহীদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে আমার কিছু শর্ত আছে, তার কাজ হবে কথাগুলো মন দিয়ে শোনা।
স্ট্যান্ড বাই, ইনগ্রিড। অ্যামব্যাসাডরদের সাথে কথা বলার পরপরই আবার আমরা ফিরে আসব।
