এখনও না। তবে তাতে কিছু যায় আসে না।
বিশ্বাস করো, আজ সন্ধ্যায় আমার নাম রাউল না হয়ে যদি থিবল্ট হত, তোমাকে তুলে নিয়ে দোতলায় না থেমে সোজা চিলেকোঠায় চলে যেতাম।
এ সময় একটা দরজার কবাট নড়ার শব্দ ভেসে এল।
তাড়াতাড়ি মঁসিয়ে, মাদাম অধৈর্য হয়ে পড়ছেন।
থিবল্টকে টেনে নিয়ে করিডোর পেরোল মেয়েটা। তারপর একটা দরজা খুলে ওকে ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে আটকে দিল। এই ভেবে আশ্বস্ত হলো সে যে ব্যারন রাউল দু ভোপাফোঁ, পৃথিবীর সবচেয়ে ভুললামনা মানুষটাকে নিরাপদে নিয়ে আসতে পেরেছে!
সপ্তদশ অধ্যায় – ব্যারন দু মন-গুবে
কাউন্টেসের কামরায় নিজেকে আবিষ্কার করল থিবল্ট। বেইলিফের বাড়িতে অনেক দামী দামী আসবাব দেখে মুগ্ধ হয়েছিল ও। আর এখানে যা দেখল তাতে বিস্মিত হলো। একজন মানুষ যা কখনও দেখেনি, যা সে কখনও কল্পনাও করতে পারে না।
ওর মনের চোখে একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল। অ্যানলেটের ছোট্ট কুঁড়ে, মাদাম পুলের খাবার ঘর, বেইলিফের স্ত্রীর শোবার ঘর। কিন্তু এই ঘরের তুলনায় সেগুলো কিছুই নয়। যা দেখছে তা সত্যি, না কোন জাদুকরের প্রাসাদে চলে এসেছে-বুঝতে পারছে না থিবল্ট। কেন ও চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ব্যারন হতে চাইল? এরচেয়ে সারাজীবনের জন্য মাদামের কুকুর হতে চাইলেও তো পারত। এইসব অকল্পনীয় আসবাব দেখার পর আবার থিবল্ট হিসেবে কীভাবে ও জীবন কাটাবে?
ড্রেসিংরুমের দরজা খুলে কাউন্টেস হাজির হলো। এমন ঘরে এমন নারীকেই মানায়! মাথায় হীরের পিন লাগানো। লেসের কাজ করা গোলাপি গাউন শরীরের কোন আকর্ষণকেই ঢাকতে পারছে না। পায়ে রূপোর জুতো। গলায় মুক্তোর একটা হার ছাড়া আর কোন গহনা নেই। আর সে মুক্তোও বোধকরি শুধু রাজার ঘরেই শোভা পায়!
এই বিলাসী সৌন্দর্য্যের ভারে যেন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বিল্ট।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিচু হও। আরও নিচু। আমার পায়ে চুমু খাও। কার্পেটে, তারপর মেঝেতে। তা-ও আমি তোমাকে ক্ষমা করব না। তুমি একটা অসুর।
সত্যি কথা বলতে কী মাদাম, তোমার তুলনায় আমি তার চেয়েও অধম।
হ্যাঁ, ভাব দেখাও যেন তুমি আমার কথার ভুল মানে করছ। ভাবছ, আমি তোমার বেশভূষা আর চেহারা নিয়ে কথা বলছি? কিন্তু না, আমি কথার বিষয়বস্তু তোমার চরিত্র। তোমার ভেতরের চেহারাটা যদি বাইরেও দেখা যেত, তাহলে তোমার দিকে আর তাকানো যেত না। শত দোষ থাকার পরও, তুমি সবচাইতে সুদর্শন পুরুষ। কিন্তু মঁসিয়ে, এটা তো স্বীকার করবে যে তুমি লজ্জিত?
লজ্জিত, কারণ আমি সবচেয়ে সুদর্শন? কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারছে থিবল্ট, অপরাধ যা-ই করে থাকুক ব্যারন, সেটা ক্ষমার অযোগ্য নয়।
না, কারণ হাসিখুশি মুখের আড়ালে তোমার মনটা কালো, আর তোমার হৃদয় বলে কিছু নেই। এখন ওঠো। কাউন্টেস তার হাত বাড়িয়ে দিল। সে হাত একই সঙ্গে ক্ষমা নির্দেশ করছে আবার চুম্বনও আশা করছে।
থিবল্ট নরম, মিষ্ট হাতটায় চুমু খেল। একটা সোফায় বসে পড়ল কাউন্টেস। রাউল রূপী থিবকে ইঙ্গিত করল পাশে বসার।
এবার বলল, শেষবার দেখা হওয়ার পর কী কী করেছ?
তার আগে মনে করিয়ে দেবে, শেষ কখন এসেছিলাম?
ভুলে গেছ? নাকি ঝগড়া করতে চাইছ? নইলে এসব কথা কেউ বলে না।
ঠিক তার উল্টো। শেষবারের কথা এখনও এত তাজা মনে হচ্ছে, যেন গতকালের ঘটনা। তারপর যে কী করেছি, মনে করতে পারছি না। বিশ্বাস করো, গতকালের পর থেকে, তোমাকে ভালবাসা ছাড়া আর কোন অপরাধ আমি করিনি।
মন্দ বলোনি। তবে প্রশংসা দিয়ে পদস্থলনের দোষ থেকে মুক্তি পাবে না।
জবাবদিহির কাজটা অন্য কোন সময়ের জন্য তুলে রাখি?
না, আমার এখনই জবাব চাই। শেষবার দেখা হওয়ার পর পাঁচদিন পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে তুমি কী করেছ?
কাউন্টেস, তুমি না বললে আমি কীভাবে জানব? আমি তো জানি, আমি নির্দোষ।
বেশ! করিডোরে তোমার কালক্ষেপণ নিয়ে কোন কথা শুরু করব না আমি।
এটা দিয়েই শুরু করি! তোমার মতো সেরা হীরের টুকরো পাওয়ার পর, নকল মুক্তো নিয়ে আমি কী করব?
হুঁহ! পুরুষের স্বভাব আমার জানা আছে। তাছাড়া লিযেট যথেষ্ট সুন্দরী।
ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, জেন। লিযেট আমাদের সব জানে। ওকে ঠিক পরিচারিকা হিসেবে ভাবাটা ঠিক হবে না।
কী যুক্তি! আমি কোতেস দু মন-গুবের সাথে প্রতারণা করছি, আবার আমি মঁসিয়ে খামোজির প্রতিদ্বন্দ্বীও।
ঠিক আছে তাহলে। করিডোরে আর দেরি হবে না। বেচারি লিযেট আর কোন চুমুও পাবে না, যদি বা কখনও পেয়েও থাকে!
যা-ই হোক, তাতে খুব একটা ক্ষতি হয়নি।
তার মানে আমি এরচেয়েও খারাপ কিছু করেছি?
তোমাকে যে রাতে এনেভিলা আর ভিলারস-কটেরেটের মাঝের রাস্তায় দেখা গিয়েছিল, সে রাতে কোথায় ছিলে?
কেউ আমাকে দেখেছিল?
হ্যাঁ। এনেভিলার রাস্তায়। কোথা থেকে আসছিলে?
মাছ ধরে ফিরছিলাম।
মাছ ধরে?
পুকুর খালি হচ্ছিল।
তুমি কত বড় জেলে সেটা আমার খুব ভাল জানা আছে। তা রাত দুটোর সময় কোন্ মাছটা তুমি ধরে আনছিলে?
ব্যারন, আমার বন্ধু, ভেযে ওর সাথে খাওয়া-দাওয়া করছিলাম।
তোমার বন্ধু যে সুন্দরীকে বন্দী করে রেখেছে, নিশ্চয়ই তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছ। কিন্তু সেটাও আমি ক্ষমা করে দিতে পারি।
কী, এরচেয়েও খারাপ অপরাধ থাকতে পারে? অপরাধ যত বড়ই হোক, তারপরই ক্ষমা আসতে দেখে থিবল্ট আশ্বস্ত হতে শুরু করেছে।
