দূর থেকে তাকালে মিলের চিমনিটাই আগে চোখে পড়ে। কাছে না আসলে এই দৃশ্যগুলো দেখা যায় না। জায়গাটা থিবল্টের চেনা। তবে এবার অন্য দৃষ্টিতে দেখছে থিবল্ট। মালকিন যে দৃষ্টিতে তার সম্পত্তির দিকে তাকায়, অনেকটা সে দৃষ্টিতে।
খামারে ঢুকতেই চোখে পড়ল কবুতর, হাঁস আর মুরগী ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানারঙের দুধেল গরু দেখা যাচ্ছে। গাড়ি থেকে মালপত্র নামছে। ঘোড়াগুলোও দেখতে চমৎকার। একটা ছেলে গুদাম থেকে বস্তা টেনে আনছে। একটা মেয়েকেও দেখা গেল মাল বইতে। একটা শুয়োর ঘুমোচ্ছে। সবমিলে নানান ধরনের পশুপাখির বাস এখানে।
মুগ্ধ এবং তৃপ্ত ভঙ্গিতে দেখছে থিবল্ট। ল্যান্ড্রি যদি নিজের চিন্তায় বুঁদ না হয়ে থাকত, তাহলে বিষয়টা লক্ষ করত। বিধবা ডাইনিং রুমে ছিল। থিবকে দেখে পরিচয় জানতে চাইল।
নিজের পরিচয় দিল থিবল্ট। জানাল, ওর কাজিনের সাথে দেখা করতে এসেছে।
বিধবা হাসিমুখে ওকে অভ্যর্থনা জানাল। সেই সাথে দিনটা খামারে কাটাবার আমন্ত্রণও জানিয়ে দিল! মহিলার হাসিকে শুভলক্ষণ বলেই ধরল থিবল্ট।
বন থেকে কিছু জাম নিয়ে এসেছে ও উপহার হিসেবে। মহিলা সেগুলো সাজিয়ে আনতে ভেতরে পাঠিয়ে দিল। থিবল্ট লক্ষ করল, বিধবা ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে কিছু একটা দেখছে। পেছনে তাকিয়ে দেখল ল্যান্ড্রি মাল নামাচ্ছে। মহিলা ওকেই দেখছিল। থিবল্ট এটা টের পেয়েছে বুঝে তার গাল লাল হয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল মাদাম, আপনার ভাইকে যদি একটু সাহায্য করেন, দেখতেই পারছেন কাজটা ওর একার পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে বলে ঘরে ঢুকে গেল সে।
কপাল। প্রথমে মাদাম পলে, পরে ল্যাভিকে দেখে মন্তব্য করল থিবস্ট। ও তো মনে হচ্ছে ওর ধারণার চাইতেও ভাগ্যবান। আবার কি কালো নেকড়েকে ডাকতে হবে?
মালকিনের অনুরোধ অনুযায়ী ভাইকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল থিবল্ট। মাদাম ভেতর থেকে দেখছে এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত। তাই কাজে সাহায্যের বেলায় নিজের শক্তি-সামর্থ্য দেখাতে কসুর করল না। কাজ শেষ হলে খাবার ঘরে গিয়ে বসল ওরা। কাজের মেয়েরা টেবিল সাজিয়ে দিল। মাদাম টেবিলের মাথায় বসেছে, আর থিবল্ট বসেছে তার ডানে। থিবল্টের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিল মাদাম পুলে। আশান্বিত হয়ে উঠল ও। তবে ভুল ভাঙতে দেরি হলো না! ওর রসিকতায় হাসতে হাসতেই ল্যাড্রির দিকে চোরা চোখে তাকাতে লাগল মাদাম পুলে। এদিকে ও বেচারা মাদামের বেড়ে দেয়া কোন খাবারই স্পর্শ করেনি। ছেলেটার দুগাল বেয়ে পানি পড়ছে। ছেলেটার দুঃখ মহিলার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। মাদাম নরম দৃষ্টিতে মাথা নেড়ে ল্যাভ্রিকে খেতে অনুরোধ করল।
.
এই ছোট্ট ইঙ্গিতের ভেতর না বলা অনেক প্রতিশ্রুতি লুকিয়ে ছিল। সাথে সাথে মালকিনের অনুরোধে খেতে শুরু করল ল্যান্ড্রি।
এসবের কছুই থিবল্টের নজর এড়াল না।
এখন যেহেতু শয়তান ওর পাশে আছে, সিনর জঁ-এর মতো করে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করল থিবল্ট, মহিলা এই বাচ্চা ছেলেটাকে ভালবাসে, এ-ও কি সম্ভব? স্বীকার করতেই হবে মহিলার রুচি খুব একটা উন্নত নয়। আমারও তাতে কোন উপকার হচ্ছে না। না, না সুন্দরী, তোমার দরকার আমার মতো একজন পুরুষ, যে এই মিলের দেখাশোনা করতে পারবে।
থিবল্ট লক্ষ করল, বিধবা ল্যান্ড্রির প্রতি তার প্রথম দিককার দৃষ্টি আর হাসিতে ফিরে গেছে। ব্যবস্থা একটা তাহলে নিতেই হচ্ছে। আমার জন্য এরচেয়ে ভাল জুড়ি আশেপাশে আর কোথাও নেই। কিন্তু ল্যান্ড্রির কী করব? ওর ভালবাসা তো আমার পরিকল্পনা কেঁচে দিচ্ছে। আমি কখনও-ই চাই না ল্যান্ড্রির পরিণতি ম্যাকোটের মতো হোক। এটা নিয়ে আমি ভাবছি কেন? এটা তো কালো নেকড়ের মাথাব্যথা। তারপর নিচু স্বরে বলল, কালো নেকড়ে, এমন ব্যবস্থা করো যাতে ল্যান্ড্রির কোন দুর্ঘটনা না ঘটে, কিন্তু আমার পরিকল্পনায়ও ও কোন বাগড়া বাধাতে না পারে। প্রার্থনা শেষ হয়েছে কি হয়নি, মিলিটারি উর্দি পরা জনা চার-পাঁচজন লোককে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মিলের দিকে আসতে দেখা গেল। ল্যান্ড্রি ওদের দেখে চিৎকার দিয়ে পালাতে গিয়েও আবার বসে পড়ল।
অষ্টম অধ্যায় – থিবটের ইছা
সৈনিকদের আসতে দেখল সবাই। ল্যাস্ট্রির প্রতিক্রিয়া দেখে ভয় পেয়ে গেল বিধবা।
ঈশ্বর। কী হয়েছে ল্যাড্রি?
থিবল্টও জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ, ল্যান্ড্রি, কী ব্যাপার?
গত বৃহস্পতিবার দো-ফা ইনে রিক্রুটিং-সার্জেন্টের সাথে দেখা হয়েছিল। তখন মুহূর্তের হতাশাবোধের কারণে আমি আমার নাম তালিকাভুক্ত করেছিলাম।
মুহূর্তের হতাশাবোধ! কেন জানতে পারি? প্রশ্ন করল মাদাম।
সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল ল্যান্ড্রি, হতাশাগ্রস্ত ছিলাম। কারণ আমি আপনাকে ভালবাসি!
বোকা ছেলে! আমাকে ভালবাসো, তাই তুমি সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছ?
আপনি তো বলেছিলেন, আমাকে মিল থেকে তাড়িয়ে দেবেন।
কিন্তু তাড়িয়ে কি দিয়েছি? মাদাম পুলের মুখে যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠল তাতে ভুল বুঝবার কোন অবকাশ নেই।
ঈশ্বর! আপনি আমাকে সত্যিই তাড়িয়ে দিতেন না?
বোকা ছেলে! মিল মালকিনের হাসি আর অভিব্যক্তি দেখে অন্য সময় হলে খুশিতে পাগল হয়ে যেত ল্যান্ড্রি, কিন্তু এখন ওর দুঃখ আরও বেড়ে গেল। চেষ্টা করলে হয়তো এখনও লুকাতে পারব আমি।
