ওদের হতভম্ব অবস্থা দেখে আমার বেশ মজা লাগছিল। ভাবুন ব্যাপারটা–ট্রেনের বিলাসবহুল কোচে বসে আপনি হঠাৎ দেখলেন ট্রেনটা লাল-হলুদ রঙের মরচে পড়া একটা অব্যবহৃত লাইনের ওপর দিয়ে চলেছে। ওরা দুজনেই ততক্ষণে হয়তো বুঝতে পেরে গেছে যে পরের বড় স্টেশন ম্যানচেস্টারের বদলে ওরা পরলোকের দিকে এগিয়ে চলেছে।
চালকবিহীন ট্রেন তখন দুলতে-দুলতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে। মরচে ধরা লাইনের সংস্পর্শে এসে চাকা থেকে বিকট আওয়াজ হচ্ছে। আমি ওদের দুজনের মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। কারাতালের ঠোঁট নড়ছে–হয়তো ঈশ্বরের নাম নিচ্ছে। আর গোমেজকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা ষাঁড়কে কসাইখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হঠাৎ গোমেজ আমাদের দেখতে পেয়ে পাগলের মতো হাত নাড়তে লাগল। তার পরেই কবজির স্ত্রাপটা ছিঁড়ে হাতের ব্রিফকেসটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিল। ভাবখানা এই-নথিপত্রগুলো সব নাও, কিন্তু আমাদের প্রাণে মেরো না। কিন্তু কোনও কাজে আমি দুনম্বরি করি না। তা ছাড়া, ট্রেন তখন ওদের কেন, আমাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
একটু পরেই ট্রেনটা যখন খনির অন্ধকার গহ্বরের কাছে এসে পড়ল, তখন গোমেজের চেঁচামেচি বন্ধ হল। খনির নীচে যাওয়ার ও কয়লা ওপরে তোলার যে সটান সুড়ঙ্গ আছে সেই অবধি আমরা লাইন পেতে রেখেছিলাম। ওদের দুজনের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। খনির অতল গহ্বরের আন্দাজ পেয়ে দুজনেই তখন বাকরুদ্ধ ও স্থাণু।
এত দ্রুতগতিতে চলা একটি ট্রেন কীভাবে গর্তে তলিয়ে যায় সেটা দেখার জন্য আমি একটু কৌতূহলীই ছিলাম।
প্রথমে ট্রেনটি খনির সুড়ঙ্গের উলটোদিকের দেওয়ালে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারল। ইঞ্জিন, বগি দুটো, গার্ডের কামরা সব তালগোল পাকিয়ে এক হয়ে গেল। তারপর সেই পুরো জিনিসটা এক মুহূর্তের জন্যে গর্তের মুখের ওপর ঝুলে রইল। পরক্ষণেই লোহা, জ্বলন্ত কয়লা, পিতলের ফিটিংস, চাকা, কামরার কাঠের বেঞ্চি, গদি সবগুলো একসঙ্গে জট পাকিয়ে খনির অতল গহ্বরে চলে গেল। বিভিন্ন পদার্থের এই সমষ্টি খনিগহ্বরের দেওয়ালে ধাক্কা খেতে-খেতে নীচে যাওয়ার সময় তার যে আওয়াজ–স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপরে দামামার নির্ঘোষের মতো একটা আওয়াজ শোনা গেল। বুঝলাম সবকিছু নীচে পৌঁছে গেছে। বয়লারটা মনে হয় ফেটে গেছল কারণ বিস্ফোরণের একটা শব্দ কানে এল।
একটু পরেই অন্ধকার গহ্বর থেকে বাষ্প ও কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আমাদের ঢেকে ফেলল। ধীরে ধীরে সেই গলগল করে বেরোনো ধোঁয়া সরু সুতোর মতো হয়ে গেল। বাইরে তখন গ্রীষ্মের ঝলমলে বিকেল। খানিকক্ষণ পরে খনিটা আগের মতোই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এরপর আমাদের একটাই কাজ বাকি রইলকৃতকর্মের কোনও চিহ্ন না রাখা। রেলকর্মীদের সেই ছোট্ট দলটি লাইন সংযোগের জায়গায় পাতা লাইন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ চটপট সরিয়ে ফেলল। সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে গেল। খনির ভেতরে ঢোকানো লাইনের অংশটুকু ও ট্রেনের ধ্বংসবশেষের কিছু টুকরো যেগুলো খনির মুখের কাছে ছিল, সেসব আমরা খনির গর্তে নিক্ষেপ করলাম। তারপর কোনওরকম তাড়াহুড়ো না করে আমরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়লাম–আমি প্যারিসে, আমার এক সঙ্গী ম্যানচেস্টারে, ম্যাকফারসন জাহাজে করে আমেরিকায়। সে সময়ের খবরের কাগজ দেখলেই আপনারা বুঝবেন কত কুশলতায় আমরা এই কাজ করেছিলাম ও বিশ্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভদের বোকা বানিয়েছিলাম।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, গোমেজ ব্রিফকেসটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল। আমি বলাবাহুল্য, সেটা আমার নিয়োগকর্তাদের ফেরত দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, তবে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দু-একটা কাগজ আমি নিজের কাছে রেখে দিয়েছি। ওইসব কাগজ প্রকাশ করে দেওয়ার আমার কোনও ইচ্ছে নেই। তবে সেই বিশেষ ব্যক্তিরা যদি আমার মুক্তির ব্যবস্থা না করেন, তা হলে কাগজগুলোর ব্যাপারে আমায় নতুন করে ভাবতে হবে। বিশ্বাস করুন, একা-একা মৃত্যুদণ্ড পেতে আমার একদম ভালো লাগে না।
মঁসিয়ে অমুক, জেনারেল তমুক–আমার কথা আপনারা শুনছেন তো? না শুনলে কিন্তু অমুক, তমুকের জায়গায় আসল নামগুলো বলে দেব।
পুনশ্চ : আমার স্বীকারোক্তিতে একটা কথা বাদ গেছে। সেটা ওই ম্যাকফারসনের কথা। বোকার মতো ও স্ত্রীকে চিঠি লিখে ফেলেছিল। এইরকম লোককে বিশ্বাস করা কঠিন। ভবিষ্যতে যে-কোনও সময়ে ও স্ত্রীকে এই পুরো ঘটনাটা বলে দিতে পারত। তাই ও যাতে ওর স্ত্রীকে কোনওদিন আর দেখতে না পায় সেই ব্যবস্থাটাও করে দিয়েছিলাম। মাঝে-মাঝে মনে হয় ওর স্ত্রীকে চিঠি লিখে জানাই যে, তিনি চাইলে আবার বিয়ে করতে পারেন।
The Lost Special গল্পের অনুবাদ
প্রতিশোধ
আচ্ছা, বার্গার, তুমি কেন আমাকে বিশ্বাস করে সবকিছু খুলে বলছ না?
কথা হচ্ছিল দুই বন্ধুর মধ্যে–একজনের নাম কেনেডি, অন্যজন বার্গার। শীতের সন্ধ্যায় রোম শহরে কেনেডির বসার ঘরে। বাইরে আলোয় ঝলমলে আধুনিক রোম। জনবহুল রাস্তা, গাড়িঘোড়া চলছে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় আলোর বাহার। কিন্তু কেনেডির ঘরে প্রাচীন রোমের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্নের সমারোহ। কেনেডির আসল বাড়ি ব্রিটেনে–পেশায় ও নেশায় পুরাতত্ত্ববিদ। ঘরের একটি দেওয়ালে ঝুলছে প্রাচীন রোমের একটি দেওয়ালচিত্রের অংশবিশেষ। এদিক-ওদিকে রাখা পুরোনো আমলের কিছু আবক্ষ মূর্তি– রোমান সেনেটর ও যোদ্ধাদের। ঘরের সেন্টার টেবিলের ওপর পুরোনো রোমের জন-স্নানাগারের একটা ছোট সংস্করণ রাখা আছে। এ ছাড়া ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো পুরোনো রোমের টুকিটাকি স্মৃতিচিহ্ন–শিলালিপির টুকরো, গয়না, বাসনপত্র ইত্যাদি। সবই প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের সময়ে উদ্ধার করা। এমনকী সিলিং-এ ঝোলানো একটা অতি প্রাচীন ফুলদানি। প্রতিটি জিনিসই প্রামাণ্য এবং দুর্লভ। অর্থ দিয়ে এগুলির দাম নিরুপণ করা যায় না।
