আমার কাছে খবর ছিল যে লিভারপুল থেকে লন্ডন পোঁছনোর পরে কারাতালের সঙ্গে অনেক রক্ষী থাকবে। সুতরাং আমার যা করণীয় তা উনি লন্ডন পৌঁছনোর আগেই করতে হবে। ছরকম প্ল্যান বানিয়েছিলাম। একটা ব্যর্থ হলে অন্যটা কাজে লাগাতে হবে।
টাকায় সবকিছু হয়। প্রথমেই ইংল্যান্ডের রেলওয়ের ওপর এক বিশেষজ্ঞকে জোগাড় করে ফেললাম। এঁর মাধ্যমে রেলওয়ের কিছু অভিজ্ঞ কর্মচারীকেও আমার দলে টেনে নিলাম। পুরো প্ল্যানটা ওই বিশেষজ্ঞের তৈরি, আমি খালি খুঁটিনাটিগুলোর দিকে লক্ষ রেখেছিলাম। জেমস ম্যাকফারসনকে হাতে রাখলাম, কেন না কারাতাল যদি স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করেন, জেমস-এর তাতে গার্ড হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ষোলোআনা। ফায়ারম্যান স্মিথকে দলে নেওয়া হল। খালি ইঞ্জিন ড্রাইভার স্লেটারকে বাগানো গেল না–লোকটা একটু গোঁয়ার টাইপের। আমাদের মোটামুটি ধারণা ছিল যে কারাতাল স্পেশাল ট্রেনেই লিভারপুল থেকে লন্ডন যাবেন এবং সেখান থেকে প্যারিস। হাতে সময় কম থাকায় স্পেশাল ট্রেন নেওয়া ছাড়া তাঁর কোনও উপায় ছিল না। তার জাহাজ লিভারপুল পৌঁছনোর আগেই আমার প্ল্যান তৈরি হয়ে গেছল। শুনলে মজা পাবেন, জাহাজটাকে যে পাইলট বোট বন্দরে নিয়ে এসেছিল, তাতেও আমার লোক ছিল।
কারাতালকে দেখেই আমরা বুঝেছিলাম যে তিনি বিপদের আশঙ্কা করছেন এবং খুবই সতর্ক। তার রক্ষী গোমেজ লোকটা বিপজ্জনক ধরনের, দরকার হলে ও পিস্তল চালাতে পিছপা হবে না। নথিপত্রের বাক্সটাও তার হাতে। হয়তো সে কারাতালের প্যারিসে আসার কারণ সম্বন্ধেও অবহিত। সুতরাং গোমেজকে ছেড়ে শুধু কারাতালকে সরানো হবে নিতান্তই পণ্ডশ্রম। তাই দুজনের পরিণতি একই হতে হবে, এবং স্পেশাল ট্রেনে সেই পরিণতি ঘটানো বিশেষ সুবিধাজনক। ট্রেনের তিনজন কর্মচারীর মধ্যে দুজন আমাদের হাতের মুঠোয়, কেন না তাদের আরামদায়ক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।
আমার একজন সঙ্গীকে লিভারপুলে রেখে আমি নিজে কেনিয়নের এক সরাইখানায় ওর ইঙ্গিতের অপেক্ষায় রইলাম। যেই কারাল স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করলেন আমার সঙ্গী তখনই হোরেস মূর নাম নিয়ে ওই ট্রেনেই তাদের সঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করল। এই প্ল্যান লেগে গেলে আমার সঙ্গী ওদের দুজনকেই ট্রেনে হত্যা করে সঙ্গের কাগজপত্রগুলো নষ্ট করে দিতে পারত। কিন্তু কারাতালের অনমনীয় মনোভাবের জন্য এই প্ল্যান কাজে লাগল না। আমার সঙ্গী তখন স্টেশন থেকে বেরিয়ে গিয়ে তারপর আর-একটা গেট দিয়ে আবার স্টেশনে এসে ওই স্পেশাল ট্রেনেই গার্ড ম্যাকফারসন-এর কামরায় ঢুকে পড়ল।
এবার বলি, আমি এদিকে কী করছিলাম। সব প্ল্যানই ছকা, শুধু ফিনিশিং টাচ দেওয়ার কাজ আমার। রেলের যে সাইডিংটা আমরা ব্যবহার করব বলে ঠিক করেছিলাম, সেটা মেনলাইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছল। খানিকটা লাইন পেতে সেটা জোড়া লাগানো হল। ফিশপ্লেট, বোল্ট, জোড়া লাগানোর পয়েন্ট ইত্যাদি দিয়ে আমাদের কেনা রেলের কিছু দক্ষ কর্মী কাজটা সহজেই নিখুঁতভাবে করে দিল। সুতরাং স্পেশালটা যখন হঠাৎ সামান্য ঝাঁকুনি খেয়ে মেনলাইন থেকে সাইডিং-এ চলে গেল, তখন কারাতাল ও গোমেজ কিছু বুঝতে পারলেন না।
প্ল্যানমাফিক ফায়ারম্যান স্মিথের কাজ ছিল ক্লোরোফর্ম দিয়ে ইঞ্জিন ড্রাইভার স্লেটারকে অচেতন করে দেওয়া, যাতে যাত্রী দুজনের সঙ্গে সে-ও অনন্তলোকে যাত্রা করে। কিন্তু এই ছোট্ট কাজটা করতে গিয়ে স্মিথ এমন তালগোল পাকিয়ে ফেলল যে স্লেটারের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হল এবং ফলত স্লেটার ট্রেন থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে ঘাড় ভেঙে মারা গেল।
আমার নিখুঁত প্ল্যানে এই একটিমাত্র ত্রুটি হয়েছিল এবং আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি যে আমার সুবিখ্যাত অপরাধ জীবনে এটি একটি কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। পরে অবশ্য আরও একটা গণ্ডগোল হয়েছিল। ট্রেনের গার্ড হতভাগা ম্যাকফারসন আমেরিকায় পৌঁছে ওর স্ত্রীকে যে একটা চিঠি লিখেছিল, সেটাও আমার পুরো প্ল্যানের মধ্যে আরেকটা খুঁত। অবশ্য তার জন্যে আমি দায়ী ছিলাম না।
হ্যাঁ, আবার ট্রেনের কথায় ফিরে আসি। এই ছোট্ট দু-কিলোমিটার লম্বা সাইড লাইনটা একটা অধুনা পরিত্যক্ত কয়লাখনিতে গিয়ে শেষ হয়েছিল। আপনারা জানতে চাইবেন, এই সাইডলাইন দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রেনটা কারোর নজরে পড়েছিল কি না। আসলে এই রাস্তাটুকু ছিল অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো–দু-দিকেই উঁচু জমি। ওই জমির ওপর গিয়ে না দাঁড়ালে ট্রেনটা কারোর চোখে পড়ার কথা নয়। একজনেরই সেটা চোখে পড়েছিল–সেটা এই অধমের চোখে। উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কী দেখেছিলাম সেটা বলি।
আমার আর-একজন সঙ্গী চারজন সশস্ত্র লোককে নিয়ে লাইনের জোড় দেওয়া জায়গায় অপেক্ষা করছিল। মরচে ধরা লাইনে কোনও কারণে ট্রেনটা যদি আটকে যায়, যাত্রীদের উপযুক্ত ব্যবস্থা করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া ছিল। কিন্তু ট্রেনটা সুচারুভাবে সাইডলাইনে যেতেই আমার এই সঙ্গীর কাজ শেষ হল। তখন আমি দুজন সশস্ত্র লোককে নিয়ে নাটকের বাকি অংশটুকুর প্রতীক্ষা করতে লাগলাম।
ট্রেনটা সাইডলাইন দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পরেই ফায়ারম্যান স্মিথ গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই আবার গতি বাড়িয়ে দিয়ে স্মিথ, গার্ড ম্যাকফারসন আর আমার ইংরেজ সঙ্গী (ছদ্মনাম হোরেস মুর) তিনজনেই লাফ দিয়ে ট্রেনের বাইরে নেমে এল। গাড়ির গতি কমতেই যাত্রী দুজন একটু অবাক হয়েছিল। কিন্তু গতি আবার বাড়তে তারা দুজন জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল।
