কেনেডির বয়স ত্রিশের সামান্য বেশি, কিন্তু এই অল্পবয়সেই পুরোনো রোমের ওপর পুরাতাত্ত্বিক গবেষণায় তার নাম সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। ধনী পরিবারের সন্তান হিসেবে আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য কেনেডি মাঝে-মাঝে একটু আধটু পয়সা উড়িয়ে ফুর্তি করলেও তার বুদ্ধি এত তীক্ষ্ণ এবং প্রত্নতত্ত্বের প্রতি ভালোবাসা এত তীব্র যে, সে দীর্ঘসময় নিবিষ্টচিত্তে গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকে। কেনেডি বেশ সুপুরুষ কপাল চওড়া, নাকটি তীক্ষ্ণ। মুখে যুগপৎ দৃঢ়তা ও দুর্বলতার ছাপ।
কেনেডির বন্ধু জুলিয়স বার্গার কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ। বার্গারের বাবা জার্মান, মা ইটালিয়ান। জার্মানির শারীরিক শক্তি ও কঠোরতার সঙ্গে ইটালির কমনীয়তা এই বৈপরীত্যের সমাবেশ বার্গারের ব্যক্তিত্বে। তার চেহারায় প্রথমেই চোখে পড়ে তার নীল চোখ, বিশাল কপাল ও সোনালি চুল। সেই সঙ্গে নজরে পড়ে তার রোদে জ্বলা গায়ের রং। সব মিলিয়ে বাগারকে দেখলে পুরোনো রোমের আবক্ষ মূর্তিগুলির মুখাবয়ব মনে পড়ে যায়। বার্গারের সরল হাসি আর স্বচ্ছ দৃষ্টি অবশ্যই ওর বংশপরিচয়ের ইঙ্গিতবাহী। বয়স ও খ্যাতিতে বার্গার কেনেডির সমকক্ষ, কিন্তু লক্ষণীয় কৃপা না পাওয়ায় তাকে অনেক কষ্ট করে ওপরে উঠতে হয়েছে। বারো বছর আগে জার্মানির বনবিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য একটা বৃত্তি নিয়ে ও বোমে এসেছিল। তারপর এত বছর ধরে অনেক কৃচ্ছসাধন করে ধীরে ধীরে পুরাতত্ত্বে খ্যাতিলাভ করে ও আজ বার্লিন আকাঁদেমির একজন সদস্য। কিন্তু পুরাতত্ত্বের বাইরে অন্য সমস্ত ব্যাপারে, বিশেষ সামাজিক আদবকায়দায়, বার্গার ধনী কেনেডির থেকে অনেক নীচে। নিজের পড়াশোনার বিষয়ে কথা বলতে গেলে ওর মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, কিন্তু বাকি সব ব্যাপারেই বার্গার চুপচাপ ও মুখচোরা গোছের।
চারিত্রিক বৈপরীত্য সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে এদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ক্রমশ গাঢ় হয়েছে। দুজনেই পরস্পরের পেশাগত দক্ষতার ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল। বার্গারের সহজ সরল ব্যবহারে মুগ্ধ হত কেনেডি। আবার কেনেডির প্রাণপ্রাচুর্য, উচ্ছলতা ও রোমের হাই-সোসাইটিতে ওর অবাধ বিচরণ বার্গারের ভালো লাগত। আপাতত একটা কারণে দুজনের সম্পর্কের ওপর একটু কালো ছায়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তার কারণ একটা গুজবকেনেডি নাকি একটি মেয়ের সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন ব্যবহার করেছে। রোমের অনেকেই খানিকটা কৌতূহলবশত এবং খানিকটা ঈর্ষার জন্য এই ঘটনাটি নিয়ে কানাঘুষো করছিল।
–আচ্ছা বার্গার। তুমি কেন আমাকে বিশ্বাস করে সবকিছু খুলে বলছ না? বার্গারের শান্ত মুখের দিকে চোখ রেখে ও মেঝের কার্পেটের দিকে আঙুল দেখিয়ে কেনেডি আবার একই কথা বলল। কার্পেটের একধারে একটা লম্বামত বেতের ঝুড়ি রয়েছে। তাতে নানা জিনিস। যেমন টালির টুকরো, শিলালিপির ভগ্নাবশেষ, মরচে-ধরা পুরোনো গয়না, ছেঁড়া প্রাচীন কাগজ ইত্যাদি। জিনিসগুলি দেখলে প্রথমেই মনে হবে এগুলি কোনও ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে আনা। কিন্তু পুরাতাত্ত্বিকের চোখে এগুলি অতি দুর্লভ মহার্ঘ বস্তু। জিনিসগুলি কেনেডির ঘরে এনেছে বার্গার।
লোভে চকচক করছিল কেনেডির চোখ। ও আবার বলল,–তোমার এই অমূল্য রত্নভাণ্ডারে আমি ভাগ বসাচ্ছি না। কিন্তু তোমার এই আবিষ্কার একেবারে প্রথম সারির। পুরো ইউরোপে সাড়া পড়ে যাবে। কিন্তু কোথায় পেলে এসব আমায় বলবে না?
একটা চুরুট ধরিয়ে বার্গার বলল,–এখানে যা দেখছ, তা কিছুই নয়। আমার আবিষ্কৃত জায়গায় বারো জন পুরাতাত্ত্বিক এই ধরনের জিনিসের মধ্যে অনায়াসে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।
কেনেডি কপাল কুঁচকে গোঁফে হাত বুলোত বুলোতে বলল,বার্গার, তুমি না বললেও আমি বুঝতে পেরে গেছি। তুমি নিশ্চয়ই ভূগর্ভে কোনও একটা বড় কবরখানা আবিষ্কার করেছ। এত ধরনের পুরোনো জিনিস কবরখানা ছাড়া আর কোথায় পাওয়া যাবে?
–ঠিকই বলেছ। আমি ভূগর্ভে একটা নতুন কবরখানার খোঁজ পেয়েছি।
–কোথায়?
–সেটা কী করে বলি কেনেডি? এটুকু বলতে পারি আমি না দেখিয়ে দিলে জায়গাটা কারও পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। এই কবরখানাটা ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকের জন্য। সুতরাং এখানে যে ধরনের ভগ্নাবশেষ ও স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে আছে তা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। আমি প্রথমে এটার ওপর গবেষণা করে একটা পেপার লিখব, তারপরে তোমার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে সমস্ত কিছু খুলে বলব।
পুরাতত্ত্বের প্রতি কেনেডির ভালোবাসা অসীম। এই নতুন আবিষ্কারের ব্যাপারে জানার জন্য সে প্রায় অধৈর্য হয়ে বার্গারকে বলল,-বার্গার, আমি তোমায় শপথ করে বলছি, তোমার অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে আমি কোনও পেপার লিখব না। অতএব তুমি নির্দ্বিধায় আমাকে তোমার আবিষ্কারের ব্যাপারটা খুলে বলতে পারো। নাহলে কিন্তু আমি নিজে চেষ্টা করে জায়গাটা খুঁজে বের করব। আর এই ব্যাপারে তোমার আগেই আমার গবেষণাপত্র প্রকাশ করব।
চুরুটে টান দিয়ে হালকা হেসে বার্গার বলল,–দ্যাখো ভাই, তুমি কিন্তু তোমার কোনও কথাই আমাকে কখনও খুলে বলল না। আজ পর্যন্ত তোমার একান্ত গোপনীয় কিছু আমায় খুলে বলেছ কি?
–তুমি কি বলতে চাইছ ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে তোমার যে-কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি রাজি আছি।
