এরপর পুলিশের অপদার্থতা নিয়ে কাগজে লেখালেখি হতে ইনস্পেকটর কলিক্স এই তদন্তের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিলেন।
পুলিশ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এরপর মাসখানেক চেষ্টা করেও এই রহস্যের কোনও সমাধান করতে পারলেন না। পুরস্কার ঘোষণা, অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি পদক্ষেপও ব্যর্থ হল।
ইংল্যান্ডের এক জনবহুল অঞ্চলে প্রকাশ্য দিবালোকে যাত্রীসমেত একটা ট্রেন ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে কেউ বললেন আধিদৈবিক, কেউ বা বললেন আধিভৌতিক। কারাতাল বা তার সঙ্গী হয়তো রক্তমাংসের মানুষই নন।
খবরের কাগজে চিঠিপত্র কলমে কয়েকজন পাঠক সমাধানের কিছু সূত্র পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন তর্কশাস্ত্রে পণ্ডিত। তিনি লিখলেন : একটি-একটি করে সমস্ত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে এবং একে-একে সেগুলি বাদ দিয়ে শেষে যে সম্ভাবনাটি পড়ে থাকবে, তা যতই অসম্ভব লাগুক না কেন, সেটিই সত্যি। কলিয়ারির ওই তিনটে রেল লাইনে তদন্ত চালানো হোক। নিশ্চয়ই ওখানে খনিশ্রমিকদের কোনও গুপ্ত সংগঠন আছে। তারাই যাত্রীসমেত ট্রেনটিকে হাপিস করে দিয়েছে। ওই খনিশ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
আর-একজন লিখলেন যে, ট্রেনটি নিশ্চয়ই লাইনচ্যুত হয়ে রেললাইনের পাশের খালে পড়ে গেছে। এই যুক্তি অবশ্য সরাসরি নাকচ হয়ে গেল কেন না ট্রেনটি সম্পূর্ণভাবে ডুবে যাওয়ার মতো গভীর কোনও খাল আশেপাশে নেই।
অন্য একজনের মতে, কারাতালের সঙ্গীর ব্রিফকেসে এমন শক্তিশালী ও অভিনব বিস্ফোরক পদার্থ ছিল যে, পুরো ট্রেনটিই বিস্ফোরণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এই যুক্তিও ধোপে টিকল না, কেন না সেই বিস্ফোরণ সত্ত্বেও রেললাইন তাহলে কী করে অক্ষত রইল।
যাই হোক, সবাই যখন এই রহস্য সমাধানের আশা ছেড়ে দিয়েছে, তখন একটা নতুন ঘটনা ঘটল।
ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। একটা চিঠি। যেটা সেই নিরুদ্দেশ ট্রেনের গার্ড ম্যাকফারসন ৫ জুলাইতে তার স্ত্রীকে লিখেছিলেন। চিঠিটা নিউইয়র্ক থেকে পোস্ট করা এবং তার স্ত্রী সেটা পান ১৪ জুলাই। চিঠির সঙ্গে ছিল একশো ডলার। চিঠিটা এইরকম :
তোমাকে আর তোমার বোন লিজিকে ছেড়ে এসে আমার কষ্ট হচ্ছে। যা টাকা পাঠালাম তাতে জাহাজের টিকিট কিনে তোমরা আমেরিকায় চলে এস। এখানে এসে জনস্টন হাউসে ওঠো। আমি তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব। তোমাদের আসার প্রতীক্ষায় রইলাম।
ম্যাকফারসনের নির্দেশমতো তার স্ত্রী ও শ্যালিকা নিউ ইয়র্কে গিয়ে জনস্টন হাউসে তিন সপ্তাহ ছিলেন। কিন্তু ম্যাকফারসন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় অগত্যা তারা ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন। মনে হয়, খবরের কাগজ পড়ে ম্যাকফারসন ধারণা করেছিলেন যে তাঁকে ধরার জন্য পুলিশ তার স্ত্রী ও শ্যালিকাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে।
গত আট বছর ধরে রহস্য এই পর্যায়ই থেমে ছিল। একটা ট্রেনের হারিয়ে যাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ও অভূতপূর্ব ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। অবশ্য এটুকু জানা গেছল যে, মঁসিয়ে কারাতাল মধ্য আমেরিকার লোক এবং আর্থিকভাবে সম্পন্ন ও রাজনৈতিক ব্যাপারে প্রভাবশালী। তার বিশালদেহী সঙ্গীর নাম এডুয়ার্ডো গোমেজ এবং সে গুন্ডাপ্রকৃতির ও বদমেজাজের মানুষ। ক্ষীণতনু কারাতালের রক্ষী হিসেবেই সে এসেছিল। কারাতাল প্যারিসে কেন যেতে চাইছিলেন, তারও কোনও কারণ প্যারিসে খোঁজখবর করে পাওয়া গেল না।
.
১৮৯৮ সালে ফাঁসির আসামি হারবার্ট দ্য লেরনক-এর স্বীকারোক্তি প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাটা বলা হল। এবার ঘটনার বাকিটুকু হারবার্টের স্বীকারোক্তির ভাষাতেই শোনা যাক:
বড়াই করে বলার মতো অনেক কিছুই জীবনে করেছি। তবে সেসব আমি সাধারণত প্রকাশ করি না। কারাতাল সম্পর্কিত ঘটনাটা বলতে বাধ্য হচ্ছি, যাতে আমার শাস্তি লাঘব হয়। আপাতত ঘটনার সঙ্গে প্যারিসের রুই-কাতলারা যারা জড়িয়ে ছিলেন তাঁদের নাম বলব না, তবে শাস্তি লাঘব না হলে সেসবও ফাঁস করে দেব। এখন বলি কীরকম সুনির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী বুদ্ধি খাঁটিয়ে আমি পুরো কাজটা করেছিলাম।
১৮৯০ সালে প্যারিসের আদালতে একটা বিখ্যাত মামলা চলছিল। রাজনীতি এবং আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত এই মামলায় ফ্রান্সের অনেক বিখ্যাত লোকই জড়িত ছিলেন। মঁসিয়ে কারাতাল প্যারিসে আসছিলেন এঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ নিয়ে। তিনি প্যারিসে এলেই এই মামলার ইতি হত এবং তথাকথিত সেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের আসল রূপ জনসমক্ষে প্রকাশ পেত। সুতরাং ঠিক করা হল যে, কারাতালের প্যারিসে আসা যেভাবেই হোক আটকাতে হবে।
কয়েকজন লোক নিয়ে তৈরি একটা ছোট সংগঠনকে ভার দেওয়া হল পুরো ব্যাপারটা সামলানোর। প্রভূত অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারী এই সংগঠনের দরকার ছিল এমন একজন লোকের যে একাধারে বুদ্ধিমান, সাহসী, দৃঢ়চেতা ও সমস্তরকম পরিবেশের মোকাবিলা করতে সক্ষম–অর্থাৎ লাখে এক। তারা আমাকেই, এই কাজের জন্য নির্বাচন করেছিল। নিজের ঢাক পেটাচ্ছি না, তবে এটুকু বলতে পারি তাদের লোক নির্বাচনে কোনও খুঁত ছিল না।
প্রথমেই বিশ্বাসী একটা লোককে মধ্য আমেরিকায় সঁসিয়ে কারাতালের কাছে পাঠিয়ে দিলাম, যাতে তিনি আমার লোকের সঙ্গেই যাত্রা করেন। কিন্তু দুভার্গ্য! আমার লোকটা পৌঁছোনার আগেই কারাতাল রওনা হয়ে গেছেন। কিন্তু আমার কাছে বিকল্পের অভাব ছিল না–একটা উপায় ব্যর্থ হলে অন্য উপায়ের ব্যবস্থা ছিল। ভেবে দেখুন, পুরো কাজটা কী কঠিন! কারাতালকে খুন করা এমন কিছু একটা কাজ নয়। তাকে সরাতে হবে, তার সঙ্গের নথিপত্র ইত্যাদি নষ্ট করতে হবে এবং তাঁর কোনও সঙ্গী থাকলে তাকেও ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
