ঠিক সাড়ে চারটের সময় কারাতাল ও তার সঙ্গীকে নিয়ে স্পেশাল ট্রেন লিভারপুল স্টেশন ছাড়ল। আগে লাইন ক্লিয়ার করাই আছে, সুতরাং ট্রেন সোজা গিয়ে সন্ধে ছটা নাগাদ প্রথমে থামবে ম্যানচেস্টার স্টেশনে। কিন্তু সওয়া ছটার সময় ম্যানচেস্টার স্টেশন থেকে লিভারপুলে টেলিগ্রাফ এল ও স্পেশাল ট্রেন এখনও ওখানে পৌঁছোয়নি। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, ট্রেনটি চারটে বাহান্নয়, ঠিক সময়ে সেন্ট হেলেন্স স্টেশন পেরিয়ে গেছল। সন্ধে সাতটায় আবার ম্যানচেস্টার থেকে টেলিগ্রাফ এল? পরের ট্রেন ম্যানচেস্টার পৌঁছে গেছে এবং সেই স্পেশাল ট্রেনটির দ্যাখা পাওয়া যায়নি।
এই বিচিত্র ও অভাবনীয় ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষ অবাক হয়ে গেলেন। ট্রেনটি কোনও দুর্ঘটনায় পড়েনি তো? কিন্তু সে ক্ষেত্রে পরের ট্রেনটি তা দেখতে পেত। ছোটখাটো কোনও সারাইয়ের জন্য ড্রাইভার কি ট্রেনটিকে কোনও সাইড লাইনে নিয়ে গেল? পরিস্থিতি বোঝার জন্য তখন সেন্ট হেলেনস এবং ম্যানচেস্টার স্টেশনের মধ্যের সব স্টেশনে টেলিগ্রাফ পাঠানো হল। উত্তরগুলো এল এইরকম :
স্টেশনের নাম — স্পেশাল ট্রেন কখন গেছে
কলিন্স গ্রিন – ৫.০০
আর্লসটাউন – ৫.০৫
নিউটন – ৫.১০
কেনিয়ন জংশন – ৫.২০
বার্টন মস – ট্রেন এখানে আসেনি।
–আমার তিরিশ বছরের চাকরিতে এরকম কাণ্ড দেখিনি। বললেন হতভম্ব মিঃ ব্ল্যান্ড।
–কেনিয়ন জংশন ও বার্টন মস স্টেশনের মাঝখানে নিশ্চয়ই কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। বললেন ট্র্যাফিক ম্যানেজার মিঃ হুড।
–আমার যতদূর মনে পড়ে, ওই অঞ্চলে কোনও সাইডিং নেই। তাহলে কি ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে?
–তাহলে সেটা পরের ট্রেনের নজরে অবশ্যই পড়ত।
যাই হোক, ম্যানচেস্টার ও কেনিয়ন জংশনে আরও খবরের জন্য টেলিগ্রাফ পাঠিয়ে দিন। আর ওদের বলে দিন কেনিয়ন জংশন ও বার্টন মস-এর মধ্যে লাইনটা ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে।
ম্যানচেস্টার থেকে উত্তর এল : ট্রেনের এখনও কোনও খবর নেই। কোনও দুর্ঘটনা হয়নি। লাইন পরিষ্কার ও স্বাভাবিক।
কেনিয়ন জংশনের উত্তর : ট্রেনের কোনও চিহ্ন নেই। পুরো লাইন পরীক্ষা করা হয়েছে। কোনও দুর্ঘটনা হয়নি। লাইন পরিষ্কার। ট্রেন এখানে ঠিক সময়ে পৌঁছেছিল, তারপরে কী হয়েছে, কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
উত্তেজিত মিঃ ব্ল্যান্ড বললেন,–আমরা কি উন্মাদ হয়ে গেলাম? ফটফটে দিনের আলোয় একটা ট্রেন হাওয়ায় মিশে গেল? ইঞ্জিন, দুটো বগি, গার্ডের কামরা, পাঁচটা মানুষ–সব অদৃশ্য হয়ে গেল? একঘণ্টার মধ্যে কোনও খবর না পেলে আমি নিজে ইনস্পেকটর কলিন্স-কে নিয়ে তদন্ত করতে যাব।
এর খানিকক্ষণ পরে আর-একটা টেলিগ্রাফ এল কেনিয়ন জংশন থেকে : রেললাইনের পাশে নীচে ঝোঁপের মধ্যে ইঞ্জিন ড্রাইভার জন স্লেটারের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। জায়গাটা স্টেশন থেকে সওয়া দু-মাইল দূরে। যতদূর মনে হয় ইঞ্জিন থেকে পড়ে নীচে গড়িয়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গেছে। কিন্তু আশেপাশে কোথাও ট্রেনটির কোনও চিহ্ন নেই।
সেই সময় ফ্রান্সের কিছু রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে ইংল্যান্ডের খবরের কাগজগুলিতে এত লেখালেখি হচ্ছিল যে ট্রেন হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সেরকম কোনও গুরুত্ব পেল না। কিছু কাগজের অভিমত, পুরো ঘটনাটি একটা নতুন ধরনের ধাপ্পা। অবশ্য শেষে জন স্লেটারের মৃত্যু সংবাদে লোকে ঘটনাটির সত্যতা সম্বন্ধে খানিকটা নিশ্চিন্ত হল।
যাই হোক, ঘটনার দিন সন্ধেবেলায় মিঃ ব্ল্যান্ড ইনস্পেকটর কলিনস্কে নিয়ে কেনিয়ন জংশনে তদন্তে গেলেন। পরের দিন যখন তাদের তদন্ত শেষ হল, তখনও ট্রেনের তো কোনও হদিস পাওয়াই গেল না, ঘটনার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যাও মিলল না। তবে ইনস্পেকটর কলিন্স-এর রিপোর্ট থেকে কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পুলিশ রেকর্ড থেকে সংগ্রহ করা সেই রিপোর্টের সারমর্ম এইরকম?
এই দুটো স্টেশনের মাঝখানে অনেকগুলো লোহার কারখানা ও কোলিয়ারি আছে কিছু চালু, কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। এই কারখানা ও কোলিয়ারিগুলোর মালপত্র ট্রলিতে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য কমপক্ষে বারোটা ন্যারোগেজ লাইন আছে যেগুলো মেন লাইনের সঙ্গে যুক্ত। যেহেতু স্পেশাল ট্রেনটি ব্রডগেজের, এই ছোট লাইনগুলোকে তদন্তের আওতা থেকে বাদ দেওয়া যায়। কিন্তু এগুলো ছাড়াও সাতটা বড় লাইন আছে, যেগুলো মেন লাইনের সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। এর মধ্যে চারটে লাইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোলিয়ারিগুলো আপাতত পরিত্যক্ত। বাকি তিনটে লাইনের মধ্যে প্রথমটা মাত্র সিকি মাইল লম্বা এবং এর আশেপাশে স্পেশাল ট্রেনটির দেখা যায়নি। দ্বিতীয় লাইনটি সিঙ্গল লাইন এবং ঘটনার দিন (৩রা জুন) ষোলোটা মালভরতি বগি পুরো লাইনটাকে আটকে রেখেছিল। তৃতীয় লাইনটি ডবল লাইন এবং এই লাইনে সারাদিন ধরে প্রচুর খনিজ পদার্থ নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ৩রা জুন কয়েকশো লোক খনিশ্রমিক ও রেলওয়ে কর্মী-এই সওয়া দু-মাইল লম্বা রেলপথের আশেপাশে কাজ করছিল এবং স্পেশাল ট্রেনটি এই লাইনে এলে সেটি অবশ্যই তাদের নজরে পড়ত। তা ছাড়া ইঞ্জিন ড্রাইভারের লাশ এই লাইনের কাছাকাছি পাওয়া যায়নি। সুতরাং, এই অঞ্চলটা পেরোনোর পরেই ট্রেনটি নিখোঁজ হয়।
আর ইঞ্জিন ড্রাইভার জন স্লেটারের সম্বন্ধে এইটুকুই বলতে পারি যে, ট্রেন থেকে পড়ে গিয়েই তার মৃত্যু হয়, যদিও কেন বা কীভাবে সে পড়ে গেল কিংবা তারপর ইঞ্জিনটার কী হল, এ সম্বন্ধে কোনও সূত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
