স্মিথ বাইরে এসে ফিরে তাকালেন দরজার দিকে। চার হাজার বছর বয়সি মিশরীয় সসাসরার চেহারা দরজার ফ্রেমে এক মুহূর্তের জন্যে দেখা গেল। তারপর বন্ধ হয়ে গেল দরজা। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শোনা গেল দরজায় খিল দেওয়ার আওয়াজ।
লন্ডনে ফিরে আসার পরের দিন স্মিথ টাইমস কাগজে প্যারিসের প্রতিবেদকের পাঠানো একটা ছোট খবর দেখতে পেলেন। খবরটা এইরকম :
লুভর মিউজিয়ামে রহস্যময় ঘটনা
গতকাল সকালে মিউজিয়ামের সাফাই কর্মচারীরা পূর্বদিকের একটা হলঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে দ্যাখে, মিউজিয়ামের একজন কর্মচারী একটা মমির গলা জড়িয়ে ধরে মরে পড়ে আছে। মৃত ব্যক্তি মমিটাকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল যে সেই বজ্ৰবন্ধন ছাড়াতে বেশ অসুবিধা হয়। যে বাক্সে অমূল্য কয়েকটি আংটি রাখা ছিল, সেই বাক্সটা কেউ খুলেছিল এবং তন্নতন্ন করে তার ভেতরটা খুঁজেছিল। কর্তৃপক্ষের অনুমান, লোকটি মমিটা চুরি করে পুরাতত্ত্বের কোনও সংগ্রহকারীকে বিক্রি করে দেওয়ার মতলবে ছিল। কিন্তু হৃদযন্ত্রের পুরোনো কোনও অসুস্থতার কারণে হঠাৎ তার মৃত্যু হয়। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় যে, লোকটির বয়স অনিশ্চিত এবং তার ধরন-ধারণ ছিল অস্বাভাবিক। তার এই নাটকীয় এবং আকস্মিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করার জন্য তার কোনও জীবিত আত্মীয় বা বন্ধুর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
The Ring of Thoth গল্পের অনুবাদ
নিরুদ্দেশ ট্রেন
ফ্রান্সের মাসাই শহরের জেল থেকে ফাঁসির আসামি হারবাট দ্য লেরনক-এর সম্প্রতি একটি স্বীকারোক্তি পাওয়া গেছে। আট বছর আগের এক চাঞ্চল্যকর ও আগাগোড়া রহস্য মোড়া অপরাধের একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা এই স্বীকারোক্তি থেকে দাঁড় করানো যায়। পুলিশ ও প্রশাসন এই অপরাধের সমাধান করতে না পারায় ব্যাপারটা প্রায় ধামাচাপাই ছিল এতদিন।
আগে বলি, ঘটনাটি কী। মোটামুটি তিনটি সূত্রের ভিত্তিতে ঘটনাটির একটা বিবরণ তৈরি করা যায় লিভারপুল শহরের ওই সময়ের খবরের কাগজ, রেল কোম্পানির নথিপত্র এবং ইঞ্জিন ড্রাইভার জন স্লেটার-এর মৃত্যুতদন্ত সম্পর্কিত পুলিশ-আদালতের কাগজপত্র।
তারিখ : ৩রা জুন, ১৮৯০। স্থান : লিভারপুলের ওয়েস্ট কোস্ট সেন্ট্রাল স্টেশন। সঁসিয়ে লুই কারাতাল নামের এক ব্যক্তি স্টেশনমাস্টার জেমস ব্ল্যান্ডের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন।
কারাতাল লোকটি মাঝবয়সি ও ছোটখাটো চেহারার। তার গায়ের রং একটু চাপা। একটু ঝুঁকে চলেন। তার একটি সঙ্গী ছিল, তার আকৃতি বিশাল। কিন্তু সেই সঙ্গীটির বশংবদ হাবভাবে বোঝা যাচ্ছিল সে কারাতালের আজ্ঞাধীন। সঙ্গীর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল সে স্পেন বা দক্ষিণ আমেরিকার লোক। তার কবজির সঙ্গে স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা একটা চামড়ার ব্রিফকেস অনেকের নজরে পড়েছিল।
কারাল স্টেশনমাস্টারের অফিসে ঢুকলেন আর তার সঙ্গী বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল। কারাল স্টেশনমাস্টার মিঃ ব্ল্যান্ডকে জানালেন যে তিনি আজ দুপুরেই আমেরিকা থেকে এসেছেন লিভারপুলে। আজই আবার বিশেষ দরকারে তাকে প্যারিসে যেতে হবে। প্যারিস যেতে গেলে আগে লিভারপুল থেকে লন্ডনে পৌঁছতে হবে। কিন্তু লন্ডন এক্সপ্রেস ইতিমধ্যেই লিভারপুল থেকে রওনা হয়ে গেছে। তাই তার একটা স্পেশাল ট্রেন দরকার, খরচা যতই হোক না কেন। মিঃ ব্ল্যান্ড পাঁচ মিনিটের মধ্যেই স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করে দিলেন। তবে ট্রেনটি ছাড়বে পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে। লাইন ক্লিয়ার করার জন্য এই সময়টুকু লাগবে। একটা বেশ শক্তিশালী ইঞ্জিন, দুটো বগি আর গার্ডের কামরা–এই হল ট্রেন। প্রথম বগিটি খালিই থাকবে–ঝাঁকুনি কম করার জন্য এই বগিটি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় বগিতে আছে চারটে কামরা। এর মধ্যে ইঞ্জিনের দিকে প্রথম কামরাটিতে থাকবেন যাত্রী দুজন। বাকি তিনটি কামরা খালি থাকবে। ইঞ্জিন ড্রাইভার জন স্লেটার। গার্ড জেমস ম্যাকফারসন–রেল কোম্পানির পুরোনো কর্মচারী। ইঞ্জিনে কয়লা দেওয়ার লোকটি অবশ্য নতুন চাকুরে, নাম উইলিয়ম স্মিথ।
কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে রেল কোম্পানির টাকাকড়ি মিটিয়ে দিলেন সঁসিয়ে কারাতাল। যদিও ট্রেন ছাড়তে তখনও আধঘণ্টার বেশি দেরি আছে, কারাতাল ও তার সঙ্গী ট্রেনে বসার জন্য অধের্য হয়ে পড়লেন। অগত্যা তাদের ট্রেনে বসিয়ে দেওয়া হল।
ইতিমধ্যে স্টেশন মাস্টারের অফিসে একটা ঘটনা ঘটল।
তখনকার দিনে বড় শহরে স্পেশাল ট্রেনের চাহিদা থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু মঁসিয়ে কারাতাল মিঃ ব্ল্যান্ডের অফিস থেকে বেরনোর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মিঃ হোরেস মূর নামের এক ভদ্রলোক স্টেশন মাস্টারকে জানালেন যে, লন্ডনে অসুস্থ স্ত্রীর কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর জন্য তারও একটি স্পেশাল ট্রেন চাই। কিন্তু মিঃ ব্ল্যান্ডের কাছে অতিরিক্ত ট্রেন না থাকায় তিনি মিঃ মূরকে বললেন মঁসিয়ে কারাতালের ট্রেনে যেতে। তাতে দুজনেরই খরচা কম হবে। খালি কামরা তো আছেই।
এই প্রস্তাব সময়োপযোগী ও কম খরচসাপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও মঁসিয়ে কারাতাল কিন্তু প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে অন্য কারোর সঙ্গে ট্রেন ভাগাভাগি করার ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র উৎসাহী নন। কারাতালের এই ব্যবহারে ব্যথিত হয়ে মিঃ মূর অগত্যা সন্ধে ছটার প্যাসেঞ্জার ট্রেনে যাওয়াই ঠিক করলেন।
