–তার মানে?
পারমেস বলল,–আমি এতকাল গবেষণা করে তোমার ওষুধের একটা প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছি। সেই প্রতিষেধক এখন আমার শরীরে। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমার মৃত্যু নিশ্চিত এবং তারপর আমি পরলোকে আত্মার কাছে পৌঁছে যাব।
–তাহলে আমাকেও তোমার ওই প্রতিষেধকটা দাও। আমিও মরতে চাই!
–তোমাকে প্রতিষেধক দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তুমি এই নিঃসঙ্গ জীবনের বোঝা বহু শতাব্দী ধরে বয়ে বেড়াবে।
–ঠিক আছে। তাহলে আমি নিজেই গবেষণা করে ওই প্রতিষেধক আবিষ্কার করে নেব। আমি বললাম।
পারমেস উত্তর দিল,মুখ! তোমার পক্ষে এই প্রতিষেধক তৈরি করা অসম্ভব, কেন না তার জন্যে এমন একটা দ্রব্য লাগবে যা তুমি কোথাও পাবে না। এই ওষুধ তৈরি করা আর সম্ভব নয়। কেবল দেবতা থোতের একটা আংটির মধ্যে আমার তৈরি এই ওষুধ একটু আছে।
–তাহলে আমায় বলল, দেবতা থোতের ওই আংটি কোথায় আছে?
–সেটাও তোমায় বলব না। আত্মা তোমাকে পছন্দ করলেও শেষ পর্যন্ত ওকে কে পাবে? আমি! আমি পরলোকের দিকে চললাম, তুমি থাকো তোমার অভিশপ্ত জীবন নিয়ে। এই বলে পারমেস চলে গেল। পরের দিন খবর পেলাম ওর মৃত্যু হয়েছে।
তারপর মাসের পর মাস আমি ডুবে গেলাম রাসায়নিক গবেষণায়–আমার ওষুধের প্রতিষেধকের খোঁজে। কিন্তু কোনও সফলতা পাওয়া গেল না। খুব হতাশ হয়ে পড়লে কখনও কখনও আত্মার সমাধির কাছে গিয়ে বসে থাকতাম আর ভাবতাম কবে পরলোকে ওর সঙ্গে দেখা হবে।
পারমেস বলেছিল, ওর ওষুধের খানিকটা আছে দেবতা থোতের আংটির মধ্যে। এই আংটি সম্বন্ধে আমি জানতাম। প্ল্যাটিনামের আংটি–তার সঙ্গে একটা ফাপা ক্রিস্টাল। হয়তো সেই ফাঁপা অংশে পারমেসের প্রতিষেধকটা আছে। কিন্তু কোথায় পাব সেই আংটি? পারমেসের আঙুলে ওই আংটি দেখতে পাইনি। ওর ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও, এমনকী, পারমেসের চলা রাস্তাগুলো দেখেও, ওই আংটির কোনও হদিস পেলাম না।
এদিকে আমাদের দেশে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাশের দেশের এক বর্বর উপজাতি আমাদের আক্রমণ করে বহু লোকের প্রাণনাশ করল। আমরা যুদ্ধে প্রায় হেরেই গেলাম। আমি বন্দি হলাম শত্রুদের হাতে।
তারপর বহু বছর সেই শত্রুর দেশে বন্দি অবস্থায় ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেষপালকের কাজ করে আমার দিন কাটতে থাকল। আমার মালিক মারা গেল, তার ছেলেও বুড়ো হয়ে গেল কিন্তু আমার মরণ নেই।
এরপর হঠাৎ একবার সুযোগ পেয়ে পালিয়ে চলে এলাম আমাদের দেশে–মিশরে। সবকিছু পালটে গেছে। সিংহাসনে বিদেশি রাজা। আমার চেনা শহরকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের জায়গায় একটা কুৎসিত টিপি। সমাধিকক্ষগুলো সব তছনছ করা হয়েছে। আত্মার সমাধির কোনও চিহ্ন নেই। পারমেসের কাগজপত্র বা জিনিসের কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না।
এরপর আমি প্রতিষেধকের বা দেবতা থোতের আংটি খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে জীবন কাটাতে লাগলাম। অসীম ধৈর্যের সঙ্গে মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। কত কিছুই আমার সামনে ঘটে গেল। ইলিয়মের পতন, মেমফিস-এ হেরোডোটাসের আগমন, খ্রিস্টধর্মের সূচনা। আমার বয়স কয়েকশো বছর হয়ে গেল কিন্তু দেখে কেউ বুঝবে না। আমারই আবিষ্কৃত সেই অভিশপ্ত ওষুধ আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাঁচিয়ে রেখেছে। যাক, এতদিনে আমি মৃত্যুর দোরগোড়ার কাছে এসে পৌঁছেছি।
বহু দেশ ঘুরেছি। বহু ভাষা জানি। সভ্যতার এই বিবর্তন আমার চোখের সামনে ঘটেছে। কিন্তু আত্মার প্রতি আমার আকর্ষণ এখনও অবিচল। প্রাচীন মিশরের ওপর গবেষক ও পণ্ডিতরা যা লেখেন, তা গোগ্রাসে গিলি।
প্রায় মাস আগে সানফ্রান্সিসকো গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে হঠাৎ একটা লেখা থেকে জানতে পারলাম যে আমার জন্মস্থান আবারিস-এর কাছে প্রাচীন মিশরের বেশ কিছু পুরোনো জিনিস পাওয়া গেছে। তার মধ্যে আছে একটি মেয়ের মমি-সুন্দরভাবে রাখা, আগে কখনও খোলা হয়নি। মমির বাক্সের ওপর খোদাই করা লেখা থেকে জানা যায়, দেহটি রাজা তুথমোসিস-এর সময়ে আবারিস শহরের প্রশাসকের কন্যার। এবং দেহের ওপর রাখা ক্রিস্টাল বসানো প্ল্যাটিনামের একটা আংটি। এতদিনে বুঝলাম, কীরকম চালাকি করে পারমেস আংটিটা লুকিয়ে রেখেছিল। কেন না কোনও মিশরীয় কখনও মৃতদেহের বাক্স খুলবে না পাপের ভয়ে।
সেই রাতেই সানফ্রান্সিসকো থেকে রওনা হয়ে মিশরে এলাম–আমার শহর আবারিস-এ। ওখানে যেসব ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদরা কাজ করছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে জানলাম, মমি এবং আংটি চলে গেছে কায়রোর একটা মিউজিয়ামে। কায়েরোয় গিয়ে জানলাম, জিনিসগুলো চলে গেছে প্যারিস এর সুর-এ। তারপর এলাম এখানে–প্রায় চার হাজার বছর পরে। আমার প্রিয় আত্মার মরদেহ ও দেবতা থোতের আংটির কাছে।
কিন্তু কীভাবে পৌঁছোব ওই মমির কাছে? মিউজিয়ামের অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে একটা চাকরি চাইলাম। মিশর সম্বন্ধে আমার জ্ঞান দেখে উনি বললেন যে, আমার উচিত মিশরতত্ত্বের অধ্যাপক হওয়া। যা হোক, পরে ইচ্ছে করে দু একটা ভুলভাল জবাব দিয়ে এই সাধারণ কর্মচারীর কাজটা পেলাম। আর পেলাম এই ছোট্ট ঘরটা–আমার থাকার জায়গা, আমার যৎসামান্য জিনিসপত্র নিয়ে। এটাই আমার এখানে প্রথম ও শেষ রাত।
মিঃ স্মিথ, এই হল আমার কাহিনি। আপনি বুদ্ধিমান লোক, সব বোঝেন, সবই দেখলেন। আংটিটা খুঁজে পেয়েছি আর ক্রিস্টালের মধ্যে রাখা সেই ওষুধটা এখন আমার কাছে। আমি খুব শিগগির এই অভিশপ্ত সুস্থ জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে যাব। আমার আর কিছু বলার নেই। আমি আজ ভারমুক্ত হলাম। এই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান–সোজা বড় রাস্তায় পড়বেন। শুভ রাত্রি!
