স্মিথ, এবার প্রায় নিশ্চিত যে লোকটা বদ্ধ উন্মাদ। কিন্তু লোকটা হঠাৎ খুবই স্বাভাবিকভাবে স্মিথকে বলল,–আসুন, আপনাকে যাওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দিই।
অনেকগুলো হলঘর পেরিয়ে একটা ছোট দরজা খুলে লোকটা স্মিথকে নিয়ে একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। একটা আধখোলা দরজার কাছে গিয়ে লোকটা স্মিথকে বলল,–এই ঘরে আসুন।
স্মিথ এই রহস্যের শেষ দেখতে চান। তাই ভয়ের চেয়ে তার তখন কৌতূহলের মাত্রা অনেক বেশি। ঘরে ঢুকে দেখলেন, প্রাচীন আমলের আসবাবপত্র ও টুকিটাকি জিনিস দিয়ে ঘরটা সাজানো।
লোকটা এবার শুরু করল তার কাহিনিঃ
–আমি এখন পরলোকের চৌকাটে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাই এখন আপনাকে বলে যেতে চাই প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়ার পরিণামের এই কাহিনি।
বুঝতেই পারছেন আমি একজন মিশরীয়। আমার জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টের জন্মের ষোলোশশা বছর আগে রাজা তুথমোসিসের আমলে এক সম্পন্ন পরিবারে। আমার নাম সোসরা। আমার বাবা ছিলেন নীলনদের তীরে বিখ্যাত আবারিস মন্দিরে দেবতা ওসাইরিস-এর পূজারি। ষোলো বছর বয়সেই বাবার কাছ থেকে যা কিছু শেখার সব শিখে নিয়েছিলাম। তারপর প্রকৃতির নানাবিধ রহস্য, বিশেষত জীবনের স্বরূপ নিয়ে নিজে নিজে পড়াশোনা শুরু করলাম। শরীরে রোগবালাই হলে মানুষ ওষুধের সাহায্যে তা সারায়। আমার কিন্তু মনে হল, শরীরটাকে এমনভাবে রাখতে হবে যে তাকে কোনও রোগ বা দুর্বলতা যেন ছুঁতেই না পারে। শুরু হল আমার দীর্ঘ গবেষণা। পরীক্ষা চালালাম প্রথমে জন্তুজানোয়ার, তারপর ক্রীতদাসদের শরীরের ওপর। সবশেষে আমার নিজের ওপর।
এই গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে কোনও লাভ নেই, কেন না আপনি তার কিছুই বুঝতে পারবেন না। শুধু এটুকু বললেই হবে যে, শেষে আমি এমন একটা ওষুধ আবিষ্কার করলাম যা ইঞ্জেকশন দিয়ে একবার শরীরে রক্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে মানুষ অমর না হলেও কয়েক হাজার বছর নীরোগ হয়ে বেঁচে থাকতে পারে। একটা বেড়ালকে ওই ওষুধের ইঞ্জেকশন দিয়েছিলাম। তারপর মারাত্মক সব বিষ দেওয়ার পরেও বেড়ালটা মরেনি। আজও ওই বেড়ালটা মিশরে আছে–জ্যান্ত।
অতি দীর্ঘকাল সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আশায় এবং যৌবনের উৎসাহে সেই অভিশপ্ত ওষুধ আমার শরীরে ঢোকালাম। তারপর ইচ্ছে হল আরও কারও উপকার করার। দেবতা থোত-এর মন্দিরে এক অল্পবয়স্ক পূজারি ছিল নাম পারমেস। আমার ওষুধের কথা ওকে বুঝিয়ে বললাম এবং ওর শরীরেও ঢোকালাম সেই ওষুধ। এখন বুঝি, আমার সমবয়স্ক কাউকে এই ওষুধটা দেওয়া ঠিক হয়নি।
এর পরে আমার পড়াশোনা ও গবেষণার কাজ অনেক কমিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পারমেস রসায়নের যন্ত্রপাতি নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকত। যদিও ওর গবেষণার বিষয়বস্তু বা তার প্রগতি নিয়ে আমায় কখনও কিছু বলত না।
একদিন পারমেসের সঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ একটি পরমাসুন্দরী মেয়েকে দেখতে পেলাম। কয়েকজন ক্রীতদাস মেয়েটিকে একটা ভুলিতে করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছিল। খোঁজ নিয়ে জানলাম, মেয়েটি আমাদের স্থানীয় প্রশাসকের কন্যা। মেয়েটিকে দেখেই আমার এত ভালো লেগে গেল যে মনে হল এর সঙ্গে আমার বিয়ে না হলে আমার জীবনই বৃথা। আমার মনের এই কথা পারমেসকে বলতেই দেখলাম ওর মুখটা কেমন কালো হয়ে গেল।
মেয়েটির নাম আত্মা। ওর সঙ্গে ধীরে ধীরে আমার পরিচয় হল। আত্মাও আমাকে বেশ পছন্দ করে দেখলাম। পারমেসও আত্মাকে ভালোবাসত। কিন্তু আত্মার আকর্ষণ ছিল আমারই ওপর। হঠাৎ এই সময় আমাদের শহরে প্লেগের মহামারী শুরু হল। আমার তো কোনও রোগের ভয় নেই–তাই নির্দ্বিধায় প্লেগের রোগীদের সেবাশুশ্রূষা করতে লাগলাম। আত্মা ব্যাপারটা দেখে একটু অবাক হল। তখন একদিন ওকে আমার আবিষ্কৃত আশ্চর্য ওষুধের কথাটা বলে ফেললাম। আত্মাকে আমি অনুরোধও করলাম ওষুধটা ব্যবহার করতে যাতে আমরা দুজনে একসঙ্গে অসংখ্য যুগ বেঁচে থাকতে পারি। আত্মা কিন্তু আপত্তি করল,–এ তো ঈশ্বর ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া। পরম করুণাময় দেবতা ওসাইরিস যদি চাইতেন, তাহলে তিনিই আমাদের দীর্ঘ জীবন দিতেন।
যাই হোক, আত্মাকে বললাম ব্যাপারটা একদিন ভেবে দেখে পরের দিন সকালে আমাকে ওর সিদ্ধান্ত জানাতে।
পরের দিন সকালে মন্দিরের পুজো শেষ হওয়ার পরেই আমি আত্মাদের বাড়ি গেলাম অধীর ঔৎসুক্যে–আত্মা আমার প্রস্তাবে রাজি কি না জানতে। কিন্তু ওদের বাড়িতে যেতেই একজন দাসী আমায় জানাল, আত্মা অসুস্থ। ওর ঘরে ঢুকে দেখলাম–আত্মা বিছানায় শুয়ে! মুখ পাণ্ডুর, চোখ ছলছলে। কপালের একটা অংশে বেগুনি রঙের ছাপ। এক মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম–আত্মা প্লেগের শিকার হয়েছে, কপালে নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা।
আত্মার এই অবস্থা দেখে আমি দুঃখে হতাশায় প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। ওকে ছাড়া আমার এই সুদীর্ঘ যুগ-যুগ ব্যাপী জীবন আমি কী করে কাটাব? আমার এই মানসিক অবস্থার মধ্যে একদিন পারমেস জিগ্যেস করল,–তুমি আত্মাকে মরতে দিলে কেন? ওকে তত তোমার ওষুধটা দিতে পারতে!
আমি বললাম,–আমি দেরি করে ফেলেছিলাম। এখন ভগবান জানেন কত শতাব্দীর পর আমার মৃত্যু হবে আর তারপর আত্মাকে দেখতে পাব। ভাই পারমেস, তুমি এখন কী করবে? তুমিও তো আত্মাকে ভালোবাসতে!
প্রায় অপ্রকৃতিস্থ লোকের মতো হেসে পারমেস বলল, আমার এতে কিছু যায় আসে না। আত্মার দেহটাকে নানা মশলা ও সুগন্ধি দ্রব্য মাখিয়ে এতক্ষণে মমি বানানো হয়ে গেছে। ওকে রাখা হয়েছে শহরের বাইরে সমাধিক্ষেত্রের একটা কক্ষে। আমি ওর কাছে চললাম–মরতে।
