এইসব ভাবতে ভাবতে স্মিথ তার গবেষণার নোটস লিখতে শুরু করলেন। কিন্তু শরীরটা কাহিল ছিল বলে খানিকক্ষণ পরে চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়লেন স্মিথ। এত গভীর সেই ঘুম যে তিনি জানতেও পারলেন না কখন মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে গেছে।
ধীরে-ধীরে রাত বাড়তে লাগল। নোতর দাম গির্জার ঘড়িতে মধ্যরাতের ঘণ্টা বাজল। রাত একটার পর ঘুম ভাঙল স্মিথের। শরীরটা এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। কাঁচের বাক্সে রাখা মমিগুলো এবং প্রাচীন মিশরের অন্য জিনিসপত্র দেখে তার মনে পড়ল যে তিনি এখন কোথায়। জানলার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। স্মিথ এমনিতে বেশ সাহসী। আড়মোড়া ভেঙে মনে মনে একটু হেসে নিলেন। পরিস্থিতিটা বেশ মজার–গার্ডরা ভেতরটা ভালোভাবে না দেখেই মিউজিয়ামের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
বাইরে আলো ঝলমলে প্যারিস। আর এই হলঘরের নৈঃশব্দ্যে ডুবে আছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। থিবস, লুকার, হেলিওপোলিস ও কত না প্রাচীন মন্দির ও স্মৃতিসৌধ থেকে আনা মানুষের দেহ আর তাদের ব্যবহৃত জিনিস। যেন মহাকালের সমুদ্রে জলে ভেসে আসা অতীতের স্মৃতিচিহ্ন। চাঁদের আলোয় লম্বা হলঘরে সারি দিয়ে রাখা মূর্তি ও বিভিন্ন বস্তুর দিকে তাকিয়ে প্রায় দার্শনিক চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলেন স্মিথ। হঠাৎ দেখতে পেলেন দূরে এক কোণায় একটু হলদে আলোর আভা।
আলোটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। একটু ভয় লাগলেও তীব্র কৌতূহলে স্মিথ চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। যার হাতে আলো তার পায়ের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। আলোটা আরও কাছে আসতে স্মিথ দেখলেন আলোর পিছনে হাওয়ায় প্রায় ভাসমান একটা মুখ। ছায়া সত্ত্বেও মুখটা চিনতে স্মিথের একটুও সময় লাগল না–সেই কাঁচের মতো চোখ, সেই মৃত মানুষের মতো চামড়া। হ্যাঁ, মিউজিয়ামের সেই কর্মী।
স্মিথ প্রথমে ঠিক করলেন লোকটির সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু ওর ভাবভঙ্গি, বিশেষত চোরের মতো পা টিপে চলা, ডানদিকে বাঁ-দিকে তাকানো ইত্যাদি দেখে স্মিথ লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে লক্ষ করাই সমীচীন মনে করলেন।
লোকটা যেন জানে ওকে কোথায় যেতে হবে। ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিত প্রত্যয়ের সঙ্গে ও পোঁছোল একটা বড় কাঁচের বাক্সের কাছে। বাক্সর মধ্যে কয়েকটা মমি রাখা। পকেট থেকে একটা চাবি বের করে বাক্সের ওপরের ডালা খুলে একটা মমি নামিয়ে খুব সাবধানে সেটিকে কোলে করে নিয়ে একটু দূরে–মেঝের ওপর শুইয়ে দিল। তারপরে মমিটার পাশে বসে মমির ওপর জড়ানো ব্যান্ডেজের মতো কাপড়টা আস্তে আস্তে খুলতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে নানারকম ভেষজদ্রব্যের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
বোঝাই যাচ্ছে এই মমিটার ব্যান্ডেজ এর আগে কখনও খোলা হয়নি। তাই অদম্য কৌতূহলের সঙ্গে স্মিথ রুদ্ধশ্বাসে পুরো ব্যাপারটা দেখতে থাকলেন। মাথার ওপর থেকে ব্যান্ডেজের শেষ অংশটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল চার হাজার বছরের পুরোনো দেহের মাথার ওপরের লম্বা, কালো, চকচকে চুলের রাশি। ব্যান্ডেজটা আরেকটু খুলতেই দেখা গেল ফরসা ছোট কপাল আর সুন্দর বাঁকানো ভু। এর পরে চোখে পড়ল এক জোড়া উজ্জ্বল চোখ ও একটা টিকোলো নাক। সবশেষে বেরোল ঠোঁট ও সুন্দর থুতনি। পুরো মুখটা নিখুঁত সুন্দর, শুধু কপালে কফি রঙের একটা দাগ।
লোকটা এবার মমির মুখ দেখে যেন আত্মহারা হয়ে পড়ল। দু-হাত শূন্যে ছুঁড়ে, দুর্বোধ্য ভাষায় অনেক কিছু বলে সে মমিটাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল। প্রচণ্ড আবেগে লোকটার গলার স্বর জড়িয়ে যাচ্ছে, মুখের ওপরে বলিরেখা কেঁপে কেঁপে উঠছে, কিন্তু স্মিথ অবাক হয়ে দেখলেন ওর কাঁচের মতো চোখে কোনও আর্দ্রতা নেই। বেশ কিছুক্ষণ ওই সুন্দরীর মৃতদেহের কাছে বসে, কথা বলে লোকটা হঠাৎ উঠে পড়ল।
হলঘরের মাঝখানে কাঁচের একটা গোল বাক্সে প্রাচীন মিশরের অনেক আংটি ও দামি পাথর রাখা আছে। লোকটা প্যাকেট থেকে একটা শিশি বার করল। এবার বেশ কিছু আংটি ওই বাক্স থেকে বের করে শিশিতে রাখা জলীয় পদার্থ লাগিয়ে আংটিগুলো একটা একটা করে পরীক্ষা করতে লাগল। বেশ কয়েকটা আংটি এভাবে দেখার পর একটা ক্রিস্টাল বসানো বড় আংটিতে জলীয় পদার্থ লাগিয়েই আনন্দে দু-হাত তুলে নোকটা লাফিয়ে উঠল। আর তখনই শিশিটা কাত হয়ে জলীয় পদার্থটা মেঝের ওপর পড়ে গেল। সেটা রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে ঘরের কোণের দিকে যেতেই লোকটার একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেলেন ভ্যানসিটার্ট স্মিথ।
চোখে একরাশ বিদ্বেষ নিয়ে লোকটা স্মিথকে জিগ্যেস করল,আপনি এতক্ষণ আমাকে দেখছিলেন? দশ মিনিট আগে যদি আপনাকে দেখতে পেতাম, তাহলে আমার এই ছুরি আপনার বুকে বিঁধিয়ে দিতাম। এবার বলুন, আপনি কে?
স্মিথ নিজের পরিচয় দিতেই লোকটা অবজ্ঞার সঙ্গে বলল,–ও! পুরোনো মিশরের ওপর আপনার একটা লেখা আমি পড়েছি। মিশর সম্বন্ধে আপনার জ্ঞান তো প্রায় নেই বললেই চলে। আমাদের জীবন দর্শন সম্বন্ধে আপনারা তো কিছুই জানেন না!
স্মিথ-এর প্রতিবাদ করার আগেই হঠাৎ তার চোখ পড়ে গেল মমিটার দিকে। লোকটাও সঙ্গে সঙ্গে হাতের আলোটা মমির দিকে ফেরাল। এই দশ মিনিটে হাওয়ার সংস্পর্শে এসে মৃতদেহটির অবস্থার অবনতি হয়েছে খসে পড়েছে চামড়া, চোখ হয়ে গেছে কোটারাগত এবং ঠোঁটের মাংস কুঁচকে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে হলদে দাঁতের সারি। গভীর দুঃখে ও হতাশায় লোকটা তখন মুহ্যমান। কাঁপা গলায় সে স্মিথকে বলল, আজ রাতে যা করব ভেবেছিলাম, তা করেছি। এখন আর কিছু যায় আসে না। ওর আত্মার সঙ্গে গিয়ে মিলতে পারলেই হল। ওর এই নিষ্প্রাণ দেহের কী-ই বা মূল্য আছে?
