একজন বলল,–পুরো গাড়িটার ওজন ওর ওপর পড়েছে। খুব আস্তে করে গাড়িটাকে তুলে ধরো।
–এটা আমার পা! কে যেন বলে উঠল। গলাটা চিনতে পারলাম–পার্কিনস্ কথা বলছে।
–স্যর কোথায়? বলে চেঁচিয়ে উঠল পার্কিনস্।
–এই তো আমি এখানে। আমি উত্তর দিলাম। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতে পেল না। সবাই গাড়ির সামনে ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছিল।
স্ট্যানলি আলতো করে আমার কাঁধে হাত রাখল। আঃ! কি আরাম ওর স্পর্শে। আমার ভারী ভালো লাগল।
–ব্যথা-ট্যথা নিশ্চয়ই নেই, কী বল? স্ট্যানলি জিগ্যেস করল।
–না, না। একদম ব্যথা নেই। আমি বললাম।
–হ্যাঁ, সেটাই তো স্বাভাবিক। ব্যথা একদম থাকে না। বলল স্ট্যানলি।।
এবং তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আমার মনে পড়ে গেল–স্ট্যানলি! স্ট্যানলি! ও তো অনেকদিন আগে আন্ত্রিক রোগে মারা গেছে, সেই বুয়র যুদ্ধের সময়।
কান্নায় অবরুদ্ধ গলায় ওকে আমি বললাম,–ভাই স্ট্যানলি! তুমি তো বেঁচে নেই!
স্ট্যানলি ওর সেই সহজ সুন্দর হালকা হাসি হেসে বলল,তুমিও।
How it happened গল্পের অনুবাদ
দেবতার আংটি
লন্ডনের ১৪৭এ, গাওয়ার স্ট্রিটের বাসিন্দা জন ভ্যানসিটার্ট স্মিথ সহজেই বৈজ্ঞানিক হিসেবে নাম করতে পারতেন। কিন্তু তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও তীক্ষ্ণ চিন্তাশক্তি তাকে কোনও একটি বিষয়ে স্থির থাকতে দেয়নি। অতএব প্রাণীবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যায় বিশারদ হতে হতে তিনি হঠাৎ রসায়ন শাস্ত্রে উৎসাহী হয়ে পড়লেন। কিন্তু তার বছরখানেক পরেই প্রাচ্যতত্ত্ব তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করল। প্রাচীন মিশরের বর্ণমালা এবং লৌকিক দেবতার সম্বন্ধে তার একটা গবেষণাপত্র প্রাচ্যতত্ত্বে উৎসাহীদের কাছে বিশেষ খ্যাতি পেল।
এরপরে স্মিথ প্রাচীন মিশরের ব্যাপারে, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও কলায় মিশরের অবদান সম্বন্ধে এতটাই উৎসাহী হয়ে পড়লেন যে, তিনি মিশর-বিশেষজ্ঞ এক মহিলাকে বিয়ে করে ফেললেন। স্মিথের স্ত্রী মিশরের ষষ্ঠ রাজবংশের ওপর গবেষণা করেছেন। এবার স্মিথও শুরু করলেন প্রাচীন মিশরের ওপর বেশ বড়সড় গবেষণার কাজ। ঘনঘন যেতে লাগলেন প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামে তাঁর গবেষণার কাজে। সম্প্রতি এইরকমই একবার লুভর-এ গিয়ে তিনি এক অত্যাশ্চর্য ঘটনায় জড়িয়ে পড়লেন।
স্মিথের সেদিন একটু জ্বর জ্বর ভাব। লন্ডন থেকে প্যারিস পৌঁছে হোটেলে উঠেই শুয়ে পড়লেন। কিন্তু ঘুম এল না– ঘণ্টাদুয়েক বিছানায় এপাশ ওপাশ করার পর উঠে পড়লেন। বর্ষাতি পরে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে লুভর-এ চলে গেলেন। মিউজিয়ামের যে ঘরে প্যাপিরাস সংক্রান্ত সংগ্রহ, সেই ঘরে গিয়ে তাঁর অসমাপ্ত গবেষণার কাজ শুরু করে দিলেন।
স্মিথকে কোনওভাবেই সুদর্শন বলা যাবে না। তার খাড়ার মতো নাক আর থুতনির বিচিত্র গড়ন, এবং কথা বলার সময়ে পাখির মতো মাথার নড়াচড়া-সব মিলিয়ে তার চেহারাটা অদ্ভুত। মিউজিয়ামের ঘরের আয়নায় বর্ষাতির কলার কান পর্যন্ত তুলে দেওয়া নিজের প্রতিবিম্ব দেখে স্মিথ নিজেই বুঝতে পারছিলেন তার চেহারার বিচিত্রতা। কিন্তু ইংল্যান্ডের দুটি ছাত্র তাকে অন্য দেশের লোক ভেবে তার সম্বন্ধে ইংরেজিতে বেশ কয়েকটা বাছা বাছা বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করছিল, যেমন, লোকটার চেহারা কীরকম কিম্ভুত! মিশরের মমি নিয়ে কাজ করতে করতে লোকটার চেহারাই মমি-র মতো হয়ে গেছে, লোকটাকে দেখে মিশরীয় বলেই মনে হয়! ইত্যাদি।
স্মিথ চটে গিয়ে ছেলে দুটোকে ইংরেজিতে একটু কড়কে দেবেন বলে ঘুরে দাঁড়ালেন। এবং তখনই বুঝতে পারলেন যে, ছেলে দুটোর মন্তব্যের লক্ষ তিনি নন, বরং মিউজিয়ামের যে কয়েকজন কর্মচারী তখন পিতলের জিনিসগুলো পরিষ্কার করছিল, তাদের একজন।
ছাত্র দুটি একটু পরেই সেখান থেকে চলে গেল। তখন স্মিথ বিশেষ মনোযোগ দিয়ে ওই কর্মচারীকে লক্ষ করলেন। তাঁর দেখা অনেক মমি ও ছবিতে প্রাচীন মিশরীয়দের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এই লোকটার চেহারার অদ্ভুত মিলকাটা কাটা মুখের গড়ন, একটু চওড়া কপাল, গোল থুতনি এবং গায়ের কালচে রং। লোকটি অবশ্যই মিশরের স্মিথ নিঃসন্দেহ হলেন।
আলাপ করবেন ভেবে লোকটির দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে স্মিথ প্রায় শিউরে উঠলেন ওকে দেখে-মুখটা যেন সাধারণ মানুষের নয়, প্রায় অতিপ্রাকৃতিক। ওর কপাল ও চোয়াল এত মসৃণ যে, সেগুলো যেন চামড়ার নয়, যেন পার্চমেন্ট কাগজে তৈরি, পালিশ করা। চামড়ার ওপর রোমকূপের কোনও চিহ্ন নেই। চামড়াতে নেই কোনও স্বাভাবিক আর্দ্রতাও। কপাল থেকে থুতনি পর্যন্ত অজস্র বলিরেখা।
–এই পিতলের জিনিসগুলো কি মেমফিস থেকে পাওয়া? কোনওরকমে আলাপ শুরু করার জন্য লোকটিকে জিগ্যেস করলেন স্মিথ।
–হ্যাঁ, অন্যদিকে তাকিয়ে জবাব দিল লোকটা।
–আপনি কি মিশরের লোক? স্মিথের প্রশ্ন।
লোকটা এবার পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল স্মিথের দিকে। তার চোখদুটো যেন কাঁচ দিয়ে তৈরি, সেইসঙ্গে একটা শুকনো চকচকে ভাব। মানুষের চোখ যে এইরকম হতে পারে তা স্মিথের ধারণার বাইরে। দৃষ্টির গভীরে যেন ভয় ও ঘৃণার যুগপৎ ছাপ।
–না, আমি ফ্রান্সেরই। বলে লোকটা নিজের কাজে মন দিল। খানিকটা বিস্ময়বিহ্বল হয়েই স্মিথ পাশের ঘরে গিয়ে একটা নিভৃত কোণে চেয়ারে বসে তার গবেষণার কাজ শুরু করলেন। কিন্তু কাজ করবেন কী? মন পড়ে আছে স্ফিংক এর মতো অদ্ভুত মুখের অধিকারী সেই লোকটার ওপর। চোখ দুটো যেন কুমির বা সাপের চোখের মতো–এমন একটা চকচকে ভাব। কিন্তু সেই চোখে শক্তি ও প্রজ্ঞার ছাপও আছে। আর যেন আছে অপরিসীম ক্লান্তি ও হতাশার অভিব্যক্তি।
