তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
মিসেস ফান ডান, ডুসেল আর আমি বাসনপত্র ধুচ্ছিলাম। আমি ছিলাম অসাধারণ রকমের চুপচাপ, সচরাচর হয় না। কাজেই ওঁরা নিশ্চয় সেটা লক্ষ্য করে থাকবেন।
গোলমাল এড়াবার জন্যে আমি তাড়াতাড়ি চাইলাম বেশ একটা নিরীহ গোছের প্রসঙ্গ তুলতে। ভাবলাম, ‘অপর দিক থেকে হেনরী’ বইটা আর উপযোগী হবে। কিন্তু আমার ভুল হল। মিসেস ফান ডানের হাত থেকে যদি বা ছাড়ান পাওয়া যায়, তো ডুসেল নাছোড়। ফলে, এই হল ব্যাপার–মিস্টার ডুসেল আমাদের বলেছিলেন, পড়ে দেখ, চমৎকার বই। মারগটের আর আমার আদৌ চমকার বলে মনে হয়নি। ছেলেটির চরিত্র সুন্দর ভাবে আঁকা হয়েছে, সন্দেহ নেই; কিন্তু বাকি সব আমার উচিত ছিল সে সম্বন্ধে কিছু না বলা। বাসন ধুতে ধুতে ঐ প্রসঙ্গে কী যে বলে ফেলেছিলাম। আর যাবে কোথায়!
মানুষের মনস্তত্ব তুমি কী বুঝবে! বাচ্চারটা বোঝা শক্ত নয়(!)। ও-বই পড়বার এখনও তোমার বয়স হয়নি; কুড়ি বছরের একজন ধাড়িরও ও-বই মাথায় ঢুকবে না।’ (তবে যে উনি মারগটকে আর আমাকে বিশেষ ভাবে সুপারিশ করে বলেছিলেন ও-বই পড়তে?) এবার ডুসেল আর মিসেস ফান ডান একজোট হয়ে শুরু করলেন–’যা তোমার যোগ্য নয়, সেসব জিনিস সম্পর্কে তুমি অতিরিক্ত বেশি রকম জেনে বুঝে ফেলেছ। তোমাকে বেয়াড়া ভাবে মানুষ করা হয়েছে। পরে যখন তোমার বয়স বাড়বে, তখন কিছুতেই কোনো রস পাবে না, তুমি তখন বলবে, ‘বিশ বছর আগেই ও আমি বইতে পড়েছি।’ যদি তুমি বর চাও কিংবা প্রেমে পড়তে চাও বরং সেটা তাড়াতাড়ি করে ফেলো–নইলে পরে সব কিছুতেই তোমার আশা ভঙ্গ হবে। তত্ত্বের দিক থেকে ইতিমধ্যেই তুমি পেকে উঠেছ, এখন তোমার শুধু দরকার হাতে-কলমে সেটা ফলানো!
আমার সঙ্গে আমার মা-বাবাকে লড়িয়ে দেওয়ার ওঁদের সব সময় যে চেষ্টা, বোধকরি সেটাই ওঁদের ভালোভাবে মানুষ হওয়ার ধারণা, কেননা প্রায়ই তারা সেটা করে থাকেন। আর আমার বয়সী কোনো মেয়েকে ‘সাবালক’ বিষয় সম্পর্কে কিছু না বলা, তেমনি এও এক সুন্দর পদ্ধতি! এই জাতের মানুষ করার ফল তো হামেশাই চোখের ওপর দেখতে পাচ্ছি।
ওঁরা যখন ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে অপদস্থ করছিলেন, সেই মুহূর্তে আমি ঠাস করে ওঁদের গালে চড় লাগিয়ে দিতে পারতাম। রাগে তখন আমার মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল। আমি এখন দিন গুনছি কবে ওই সব লোকের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাব।
মিসেস ফান ডান খাসা লোক! সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন উনি…করেন বৈকি। একেবারেই বদ দৃষ্টান্ত। ওঁকে সবাই জানে–উনি ঝালে-ঝোলে-অম্বলে, উনি স্বার্থপর, ধূর্ত, হিসেবী এবং কিছুতেই উনি তুষ্ট নন। ঠেকার আর ছেনালি–তালিকায় এ দুটোও যোগ করতে পারি। উনি যে অকথ্য রকমের বিচ্ছিরি মানুষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মহাশয়ার বিষয়ে আমি সাতকাণ্ড রামায়ণ লিখে ফেলতে পারি; কে জানে, হয়ত একদিন লিখেও ফেলব। যে কেউ তার বাইরেটাতে সুন্দর একপোচ রং লাগিয়ে নিতে পারে। বাইরের উটকো লোক এলে বিশেষ করে পুরুষ মানুষ, মিসেস ফান ডান ভারি অমায়িক ব্যবহার করেন; কাজেই ওঁকে কম সময়ের জন্যে দেখলে ওঁর সম্পর্কে সহজেই লোকে ভুল করে বসেন। মা মণি মনে করেন ভদ্রমহিলা এতই নির্বোধ যে, ওঁর সম্পর্কে বাক্যব্যয় করা বৃথা, মারগট ওঁকে এলেবেলে লোক বলে মনে করে, পিম্ ওঁকে বলেন হতকুচ্ছিত (অভিধা ও ব্যঞ্জনা, দুই অর্থেই), এবং ওঁকে দীর্ঘকাল ধরে দেখে কেননা একেবারে গোড়ায় ওঁর সম্পর্কে আমার কখনও কোনো জাতক্রোধ ছিল না। আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, একাধারে উনি ঐ তিনটি তো বটেই, তদুপরি উনি আরও কিছু! ওর মধ্যে এত রকমের বদ্ গুণ যে, কোনটা ছেড়ে কোটা দিয়ে শুরু করব?
তোমার আনা।
পুনশ্চ : পাঠক কি এটা বিবেচনায় আনবেন যে, এই কাহিনী যখন লেখা হচ্ছিল তখনও লেখিকা রেগে টং হয়ে ছিলেন।
.
মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
রাজনীতির খবর চমৎকার। ইতালিতে ফ্যাশিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বহু জায়গায় লোকে ফ্যাশিস্টদের বিরুদ্ধে লড়ছে–এমন কি সৈন্যবাহিনীও এই লড়াইতে কার্যত যোগ দিয়েছে। এ রকম একটা দেশ কি ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে পারে?
এইমাত্র হাওয়াই হামলা হয়ে গেল, এই নিয়ে তিনবার; মনে সাহস আনার জন্যে আমি দাঁতে দাঁত দিয়ে ছিলাম। মিসেস ফান ডান, যিনি সবসময় বলে এসেছেন, একেবারেই শেষ
হওয়ার চেয়ে বরং ভয়ঙ্কর ভাবে শেষ হওয়া ভালো’–এখন দেখা যাচ্ছে, উনিই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কাপুরুষ। আজ সকালে উনি বাঁশপাতার মত তিরতির করে কাঁপছিলেন, এমন কি উনি ভ্যা করে কেঁদেও ফেলেছিলেন। এক সপ্তাহ ধরে স্বামীর সঙ্গে চুলোচুলি ঝগড়া করার পর সদ্য উনি সেটা মিটিয়ে নিয়েছিলেন। ওঁর স্বামী যখন ওঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তখন একমাত্র ওর মুখের অবস্থা দেখে আমার মনটা প্রায় গলে গিয়েছিল।
মুশ্চি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বেড়াল পোষার সুফল আর কুফল দুই-ই আছে। সারা বাড়ি উঁশ মাছিতে ভরে গেছে। আর দিনকে দিন তার উৎপাত বাড়ছে। মিস্টার কুপহুইস হলুদ রঙের গুড়ো প্রত্যেক আনাচেকানাচে ছড়িয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু উঁশমাছিগুলো সেসব আদৌ গায়ে মাখছে না। এতে আমরা খুবই ঘাবড়ে যাচ্ছি, মনে করা হচ্ছে হাতে পায়ে এবং শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যেন বীজকুঁড়ি বীজকুঁড়ি বেরিয়েছে; তার ফলে, আমরা অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নানা রকম কসরত করছি যাতে ঘাড় বেঁকিয়ে বা পা উল্টে পেছন দিকটা দেখা যায়। সে রকম নমনীয় নই বলে এখন আমাদের তার দরুণ মাশুল গুনতে হচ্ছে–ঠিক ভাবে এমন কি এদিক ওদিক ফিরতে গেলেও ঘাড়টা শক্ত হয়ে থাকছে। প্রকৃত শরীরচর্চা ঢের আগেই ছেড়ে দিয়েছি।
