এলি নিজে থেকে বলেছেন আমাদের জন্যে কিছু ফলমূল যোগাড় করে আনবেন। প্রায় পানির দাম–প্রেপফল কিলোপ্রতি ৫.০০ ফে, গুজুবেরি পাউণ্ড প্রতি ০.৭০ ফে, একটি পিচফল ০.৫০ ফে, এক কিলো ফুটি ১.৬০ ফে। (ডলারে যথাক্রমে আনুমানিক ১.৪০ ড, একুশ সেন্ট, চৌদ্দ সেন্ট এবং বিয়াল্লিশ সেন্টের সমতুল্য)। তবে খবরের কাগজগুলোতে প্রতি সন্ধ্যাতেই দেখবে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে ও ন্যায্য পথে চলো এবং দাম কমের মধ্যে রাখো।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ২৬ জুলাই, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
গতকাল গেছে শুধু হট্টগোল আর হৈচৈ-এ; আমরা এখনও গোটা ব্যাপারটা নিয়ে বেশ তেতে আছি। তুমি অবশ্য বলতেই পারো, কিছু না কিছু উত্তেজনা ছাড়া কোন্ দিনই বা তোমাদের যায়? আমরা যখন প্রাতরাশে বসেছি সেই সময় প্রথম হুঁশিয়ারী সাইরেন বেজে ওঠে, তবে আমরা আদৌ ওর কোনো মুল্য দিই না; প্লেনগুলো উপকূল ভাগ পার হয়ে এল ওতে শুধু এইটুকুই বোঝায়।
মাথাটা খুব ধরেছিল বলে প্রাতরাশের পর আমি গিয়ে ঘন্টাখানেক বিছানায় গড়াই। তারপর নিচের তলায় আসি। ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো। মারগট তার অফিসের কাজ শেষ করে আড়াইটের সময়; জিনিসপত্র সে এক সঙ্গে মুড়ে রাখতে না রাখতে সাইরেন বাজতে শুরু করে দেয়, সুতরাং আমি আবার ওর সঙ্গে ওপরে উঠে আসি। ওপর তলায় আমরা এসেছি আর তার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওরা তুমুল গোলাগুলি ছোঁড়া শুরু করে দেয়। এত বেশি মাত্রায় শুরু হয়ে যায় যে, আমাদের সরে গিয়ে যাতায়াতের গলিতে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। আর হ্যাঁ, বাড়িটা তখন গুড়গুড় শব্দে কাঁপছে আর সেই সঙ্গে নেমে আসছে বৃষ্টির মত বোমা।
একটা ধরবার কিছু চাই বলে আমি আমার সকান-দেওয়ার ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে বসে আছি, পালাবার কথা ভেবে নয়, কেননা যাবার তো আর কোনো জায়গাই নেই। অবস্থা চরমে উঠলে আমাদের যদি এখান থেকে কখনও পালাতেই হয়, রাস্তা হবে ঠিক বিমান হানার মতই বিপজ্জনক। এবারেরটা থিতিয়ে গেল আধ ঘণ্টা বাদে, কিন্তু বাড়ির মধ্যেকার ক্রিয়াকলাপ তাতে বেড়ে গেল। চিলেকোঠায় তার চৌকি দেওয়ার জায়গাটা থেকে পেটার নিচে নেমে এল।
ডুসেল ছিলেন সদর দপ্তরে; মিসেস ফান ডান নিজেকে নিরাপদ বোধ করেছিলেন খাসকামরায়। মিস্টার ফান ডান নজর রাখছিলেন ঘুলঘুলি থেকে। আমরা যারা ছোট দালানে ছিলাম, আমরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম। বন্দরের মাথায় যে সব ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওঠার কথা মিস্টার ফান ডান আমাদের বলেছিলেন, তা দেখবার জন্যে আমি ওপরে উঠলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই পোড়ার গন্ধ পাওয়া গেল; বাইরেটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কুয়াশার একটা মোটা পর্দা সমস্ত জায়গাটা জুড়ে ঝুলছে।
ঐ ধরনের বিরাট অগ্নিকুণ্ডের দৃশ্য খুব সুখকর নয়, তবে সৌভাগ্যক্রমে আমাদের দিক থেকে ব্যাপারটার ঐখানেই ইতি ঘটে, এবং তারপর আমরা যে যার কাজে লেগে যাই। ঐদিন সন্ধ্যেবেলায় নৈশ আহারে বসতেই আবার বিমান-হানার হুঁশিয়ারি। খাবারটা বেশ ভালো ছিল, কিন্তু সাইরেনের শব্দ কানে যেতেই ক্ষিধে আমার মাথায় উঠল। কিছুই ঘটল না এবং তিন কোয়ার্টার পরেই বিপদ কেটে যাওয়ার সঙ্কেত হল। বাসনকোসন মাজার জন্যে সবে উঁই করা হয়েছে, অমনি বিমান-হানার হুঁশিয়ারি, বিমান-বিধ্বংসী কামানের গোলা, আসছে তো আসছেই গাদাগুচ্ছের প্লেন। আমরা সবাই মনে মনে বলছি, রক্ষে করো, দিনে। দুবার, বডড বেশি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বলে কোনই ফল হল না।
এবারও বোমা পড়ল মুষলধারে, এবারে অন্য দিকে। ব্রিটিশদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিপল এর (আমস্টার্ডামের বিমানবন্দর) ওপর। প্লেনগুলো গোত্তা মেরে নেমে তারপর আকাশে চড়াও হচ্ছিল, আমরা ইঞ্জিনের গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছিলাম, শব্দটা কী বিকট! প্রতি মুহূর্তে আমি ভাবছিলাম–’এইবার একটা বই পড়ল। ঐ আসছে।’
জেনে রাখো, নটার সময় যখন আমি শুতে গেলাম আমার পা দুটোকে কিছুতেই আমি বশে রাখতে পারছি না। আমার ঘুম ভেঙে গেল তখন কাটায় কাঁটায় বারোটা–ঝাকে ঝাকে প্লেন।
ডুসেল কাপড় ছাড়ছিলেন। আমি সেসব না মেনে, গোলাগুলির প্রথম শব্দেই, বিছানা থেকে তড়াক করে লাফ দিলাম। আমার তখন ঘুমের দফারফা। বাপির কাছে দুই ঘণ্টা ছিলাম, তবু প্লেন আসছে তো আসছেই। তারপর গোলাগুলি বন্ধ হতে তখন আমি শুতে যেতে পরলাম। আমার ঘুম এল আড়ইটেয়।
ঘড়িতে সাতটা। আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। মিস্টার ফান ডান আর বাপির মধ্যে কী কথা হচ্ছে। আমার প্রথমেই মনে হল সিঁদেল-চোর। মিস্টার ফান ডানকে বলতে শুনলাম ‘সব কিছু। আমি ভাবলাম সর্বস্ব চুরি হয়ে গেছে। কিন্তু তা নয়, এবার দারুণ খবর; মাসের পর মাস কেন, বোধ হয় সারা যুদ্ধের বছরগুলোতেই এত ভালো খবর আমরা শুনিনি। মুসোলিনি ইস্তফা দিয়েছে, ইতালির রাজা সরকার হাতে নিয়েছে। আমরা আনন্দে লাফাতে লাগলাম। কাল ঐ ভয়ঙ্কর রকমের দিন যাবার পর, শেষ অবধি আবার ভালো কিছু এবং আশী। এর শেষ হবে, এই আশী। যুদ্ধ মিটে গিয়ে শান্তি আসবে, এই আশা।
ক্রালার এসেছিলেন। উনি আমাদের বললেন ফোক্কার কারখানার সাংঘাতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে প্লেন উড়ে যাওয়ায় আরেকটি বিমান হামলার হুশিয়ারি হয়েছে এবং আরও একবার সাইরেন বেজেছে। হুঁশিয়ারিতে হুশিয়ারিতে আমাদের যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে, বেজায় ক্লান্ত লাগছে এবং হাত পা নাড়তে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এখন ইতালির বুকে অনিশ্চয়তা এই আশা জাগিয়ে তুলবে যে, অচিরে এর অবসান। হবে, হয়ত এমন কি এই বছরের মধ্যেই।
