বৃদ্ধ লুসির কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, বলছি সবুর কর–
এরপর লুসির বাহুতে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন, আমি কি বললাম বুঝতে পারলে তো? আমার এ প্রস্তাব নিশ্চয় পছন্দ হয়েছে–সত্যি কথা বল–
ঠিক এই সময় দরজার বাইরে থেকে এমার ডাক শুনতে পেয়ে লুসি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
–মিস ক্রাকেনথর্প আমাকে ডাকছেন।
লুসি যখন দ্রুতপায়ে হলঘরে প্রবেশ করল, সে উপলব্ধি করল, বৃদ্ধ ক্রাকেনথর্প তাকে একটি শর্ত সামনে ধরে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন।
.
০৯.
নিউ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অফিসঘরে বসেছিলেন ডারমট ক্রাডক। ইতিপূর্বেই তিনি প্যারিসের পুলিস হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন। মৃত মেয়েটির কিছু ফটোগ্রাফ আগেই তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এখন জেনে নিশ্চিন্ত হয়েছেন, সেখানকার পুলিস ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দলগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান কাজ চালিয়েছে।
এমনি সময়ে একজন কনস্টেবলের নিয়ে আসা একটা স্লিপ থেকে জানতে পারলেন এমা ক্রাকেনথর্প দর্শনপ্রার্থী। তার নির্দেশ পেয়ে কয়েক মুহূর্ত পরেই কনস্টেবল এমাকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেল।
যথারীতি সৌজন্য বিনিময়ের পর আসন গ্রহণ করে প্রাসঙ্গিক দু-চার কথার পরে এমা সরাসরি বলল, আমার তিন ভাইকে তো আপনি দেখেছেন। তাছাড়া আর এক ভাই এডমান্ড যুদ্ধে মারা যায়। মৃত্যুর আগে সে আমাকে একটা চিঠি লেখে।
ব্যাগ থেকে চিঠিটা বার করে এমা পড়ে শোনাল।
প্রিয় এমা,
তুমি মনে আঘাত পাবে না এই বিশ্বাস নিয়েই জানাচ্ছি, একটি ফরাসি মেয়েকে আমি বিয়ে করছি।হঠাই যোগাযোগ হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মার্টিনকে তোমার পছন্দ হবে। আমি সৈনিক মানুষ, আমার যদি কিছু হয়, মার্টিনকে দেখবে। আশা করছি পরের চিঠিতে আমাদের বিবাহের খবর বিস্তারিত তোমাকে জানাতে পারব। বৃদ্ধ পিতাকে এসব কথা জানিয়ে তার অশান্তি বাড়িয়ে কাজ নেই।
এডমান্ড
ইনসপেক্টর ক্রাডক হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিলেন।
-তারপর বলুন।
এমা বলে চলল, এ চিঠি পাওয়ার দুদিন পরেই একটা তারবার্তায় যুদ্ধে এডমান্ডের মৃত্যু সংবাদ পেলাম। আমি পরে জানতে পেরেছি, সামরিক বিভাগের রেকর্ডে এডমান্ডের বিবাহের উল্লেখ ছিল না।
এরপর মেয়েটির কাছ থেকেও কোনো চিঠিপত্র পাইনি। আমিও অবশ্য খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সম্পূর্ণ নাম জানা ছিল না বলে কোনো ফল হয়নি। তখন ধারণা করে নিই, শেষ পর্যন্ত হয়তো। আমার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়েটা হয়নি।
এতদিন পরে মাসখানেক আগে আমি একটা চিঠি পাই। চিঠির তলায় নাম ছিল মার্টিন ক্রাকেনথর্প।
–চিঠিটা আপনার কাছে আছে? আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলেন ক্রাডক।
এমা হাতব্যাগ থেকে চিঠিটা বার করে দিল। ফরাসি হরফে লেখা চিঠিটা পড়লেন ক্রাডক।
প্রিয় মাদমোয়াজেল,
আমার এ চিঠি হয়তো আপনার বেদনার কারণ হবে। আপনার ভাই, আমাদের বিয়ের সংবাদ আপনাকে জানিয়েছিল কিনা আমি জানি না। বলেছিল জানাবে। আমাদের বিয়ের মাত্র কদিন পরেই সে মারা যায়। আর সেই সময়েই আমাদের গ্রামও জার্মানদের অধিকারে চলে যায়।
যুদ্ধের পর এক নতুন ধরনের জীবনযাত্রায় জড়িয়ে যাবার ফলে ভেবেছিলাম, আপনাদের সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা করব না। অবশ্য আপনার ভাই আপনার সঙ্গে যোগাযোগের কথাই বলেছিলেন।
বর্তমানে আমার ছেলের কথা ভেবেই এই চিঠি লিখছি। আমার ছেলে মানে আপনার ভাইয়ের ছেলে। তার উপযুক্ত সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করা আমার সাধ্যে কুলিয়ে উঠছে না।
আগামী সপ্তাহে আমি ইংলন্ড যাচ্ছি। আপনার সম্মতিজ্ঞাপক চিঠি পেলে আপনার সঙ্গে গিয়ে দেখা করব। আমার ঠিকানা, ১২৬ এলাবার্স ক্রেসেন্ট, এন, ১০। আশা করব, আমার চিঠি পেয়ে আপনি মর্মাহত হবেন না। প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
আপনার
মার্টিন ক্রাকেনথর্প
ক্রাডক দুবার চিঠিটা পড়ে ফিরিয়ে দিলেন।
–চিঠিটা পাবার পর আপনার প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল মিস ক্রাকেনথর্প।
-বুঝতেই পারছেন, চিঠি পাবার পর আমি খুবই বিচলিত হয়ে পড়ি। আমার মনে হয়েছিল, যদি মহিলা সত্যিই মার্টিন হয়, তবে তাকে উপযুক্ত সম্বর্ধনা জানানো উচিত। অবশ্য এবিষয়ে আমি আমার ভাই হারল্ড আর ভগ্নীপতি ব্রায়ান ইস্টলির সঙ্গেও পরামর্শ করেছিলাম। কিন্তু তারা অবিশ্বাস করে আমাকে সতর্ক হবার পরামর্শ দিয়েছিল।
যাইহোক, আমি চিঠিতে উল্লিখিত ঠিকানায় চিঠি লিখে তাকে রাদারফোর্ড হলে আসার আমন্ত্রণ জানাই।
দিন কয়েক পরেই লন্ডন থেকে একটি তারবার্তা পাঠিয়ে মার্টিন আমাকে জানায় অপ্রত্যাশিত কারণে সে ফ্রান্সে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এর পর এখন পর্যন্ত আর কোনো খবর পাইনি।
–ক্রিসমাসের কত দিন আগে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে?
–ক্রিসমাসের অল্প কদিনই বাকি ছিল তখন তার তারবার্তা আমি পেয়েছিলাম। আমি জানিয়েছিলাম, ক্রিসমাসের পরের সপ্তাহে আসার জন্য। কেননা সেই সময় সকলেই বাড়িতে উপস্থিত থাকবে।
-তাহলে আপনার কি ধারণা, পাথরের কফিনে আবিষ্কার করা মৃতদেহটা মার্টিনের হতে পারে?
-না, একথা আমার কখনো মনে হয়নি। স্ত্রীলোকটি বিদেশিনী বলে আপনারা যখন অনুমান করলেন, তখন মার্টিনের কথা আমার খেয়াল হয়।
–ঠিক আছে মিস ক্রাকেনথর্প, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি। ব্যাপারটা আমাদের নজরে এনে উচিত কাজ করেছেন। পুলিস সার্জনের বক্তব্য হল, স্ত্রীলোকটির মৃত্যু হয়েছিল, মৃতদেহ আবিষ্কার হওয়ার দিন থেকে তিন-চার সপ্তাহ আগে। এখন আমাদের দেখতে হবে যে স্ত্রীলোকটি আপনাকে চিঠি লিখেছিল সে সত্যিই ফ্রান্সে গিয়েছিল কি না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এবারে যা করার আমরাই করছি।
