–বিচিত্র কি?
এই সময় দেখা গেল, এমি বাগানের দরজা দিয়ে আসছে।
–না, আমি যাই, অনেক কাজ পড়ে আছে।
লুসি সবজি বাগানের ভেতর দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
–কেড্রিক, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। ভাইয়ের দিকে এগিয়ে এসে বলল এমা।
–মেয়েটাকে একটু বাজিয়ে দেখছিলাম। ওর আসল পরিচয়টা কি?
–মিস আইলেসব্যারোর প্রসঙ্গ এখন থাক কেড্রিক, অন্য বিষয় নিয়ে আমি ভয়ানক। চিন্তিত।
-তোমার চিন্তার কারণটা কি জানতে পারি?
–দেখ, মৃত স্ত্রীলোকটির পরিচয় পুলিস এখনো জানতে পারেনি। তবে তারা তাকে ফরাসি বলে সন্দেহ করছে। আচ্ছা কেড্রিক, মেয়েটি কি মার্টিন হতে পারে?
–সেই মার্টিন? স্থির দৃষ্টিতে এমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল কেড্রিক, মৃত মেয়েটি মার্টিন হতে যাবে কেন?
-তার টেলিগ্রামটা তো আমরা ঘটনার সময়েই পেয়েছিলাম। এর পর সে এখানে এসেছিল বলে তোমার মনে হয়?
-ওই গুদামঘরে মরে পড়ে থাকতে? একদম অসম্ভব কল্পনা।
–মার্টিন একটা চিঠিও তো আমাকে লিখেছিল, এসব কথা পুলিসকে জানানো ঠিক হবে মনে কর?
-ওসব চিঠির কোনো ভিত্তি নেই। বাবা তো মনে করেন আমাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ফন্দি। যাইহোক, আগ বাড়িয়ে পুলিসকে এসব বলতে যাওয়া কেন? তারা তাদের কাজ করুক না। তুমি চুপচাপ বসে থাক।
-তুমি ঠিক বলছ কিনা বুঝতে পারছি না। চিন্তিত ভাবে মাথা নেড়ে এমা বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
রাস্তায় উঠে ডাঃ এম্পার সঙ্গে দেখা হল। •
-তোমার বাবাকে দেখে এলাম। চমৎকার আছেন। কি ব্যাপার, মনে হচ্ছে তুমি কোনো বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত?
ডাঃ এম্পার কেবল এই পরিবারের চিকিৎসকই নন, একজন পারিবারিক বন্ধুও। বিপদআপদে নির্ভরশীল সঙ্গী।
এমা ইতস্ততঃ করলেও তাকে তার ভাবনার বিষয়টা খুলে জানাবে ভাবল।
–আমার ভাই যুদ্ধে মারা গিয়েছে, আপনি তো জানেন–
–হ্যাঁ, শুনেছিলাম সে একটা ফরাসি মেয়েকে বিয়ে করে থাকবে। তা এখন কি
বিয়ের মনোভাবের কথা জানিয়ে আমাকে লেখা চিঠিটা পাবার কদিন পরেই সে যুদ্ধে নিহত হয়। মেয়েটি সম্পর্কে কেবল তার ধর্মীয় নামটা ছাড়া আমরা আর কিছুই জানতাম না। তবে তার একটা চিঠি অন্ততঃ আমরা আশা করেছিলাম। ঠিক মাসখানেক আগে, ক্রিসমাসের সময় আমরা এতদিন পরে মেয়েটির একটা চিঠি পাই।
–হ্যাঁ আমি শুনেছি।
–সে লিখেছিল, ইংলন্ডে এসেছে, আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমরা প্রস্তুত হলাম, এমনি সময়ে সে একটা তারবার্তা পাঠিয়ে জানায়, অনিবার্য কারণে তাকে ফ্রান্সে ফিরে যেতে হচ্ছে।
-বুঝতে পেরেছি, পুলিস মৃত স্ত্রীলোকটিকে ফরাসি বলে ধারণা করছে–আর তোমার আশঙ্কা হচ্ছে নিহত স্ত্রীলোকটি তোমার ভাইয়ের
–হ্যাঁ। পুলিসকে ব্যাপারটা জানানো উচিত কিনা তাই আমি ভাবছি।
-বুঝতে পেরেছি। তোমার ভাইদের সমর্থন তুমি পাবে না, আমি জানি। আমার পরামর্শ যদি চাও, আমি বলব, পরিবারের যে যা খুশি ভাবুক, যা উচিত বলে মনে হচ্ছে, তা অবশ্যই করবে।
আমি হলে অনেক আগেই একথা ওদের জানাতাম। তুমি নিশ্চিন্ত থেকো, যে কোনো অবস্থায় তোমার বিচারবুদ্ধিকে আমি সবার আগে সমর্থন জানাব।
.
–আমাকে ডাকছেন মিঃ ক্রাকেনথপ?
–আস্তে কথা বল মেয়ে, একটা জিনিস দেখাব তোমাকে, এসো।
বৃদ্ধ এগিয়ে এসে দরজা বন্ধ করলেন।
লুসি দেখল ঘরটার চারপাশে কাগজপত্রের স্তূপ জমে আছে। দেয়ালের কোণায় কোণায় ঝুল। তার ধারণা হল, বৃদ্ধ ঘরটা পরিষ্কার করার কথা বলবে নিশ্চয়ই।
কিন্তু সেসব কোনো প্রসঙ্গে না গিয়ে মিঃ ক্রাকেনথর্প, কিছু মসৃণ অমসৃণ ডেলারমত পাথরের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, এসব আমি সকলকে দেখাই না। ভূ-বিদ্যা বিষয়ের নমুনা। আরো দেখাব এসো।
দেয়ালে ঝোলানো পূর্বপুরুষদের কিছু ছবি ও বংশপরিচয়ের তালিকা দেখিয়ে তিনি বললেন, আমার মায়ের দিকের সকলেই ছিলেন রাজা। আমি মায়ের ধারাটা পেয়েছিলাম। শিল্পকলা, প্রাচীন ভাস্কর্য, এসব বিষয়ে ঝোঁক ছিল। অথচ আমার বাবা ছিলেন নিতান্তই স্কুল রুচির মানুষ। দুর্ভাগ্য আমার দুবছর বয়সে আমি মাকে হারাই। মায়ের পূর্বপুরুষদের পরিচয় থেকেই বুঝতে পারবে আমাদের বংশধারা কত প্রাচীন।
লুসি হতভম্ব হলেও বুঝতে পারছিল, বৃদ্ধ তার কোনো আপত্তি বা কাজের কথা এখন কানে তুলবার অবস্থায় নেই।
লুসিকে শক্ত হাতে টেনে একটা বিরাট আকারের কাঠের আলমারির সামনে নিয়ে এলেন বৃদ্ধ। তার হাতের আঙ্গুলের চাপে অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল লুসির। তার শারীরিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল।
–এটা হল এলিজাবেথের যুগের নিদর্শন। তারপর দেখ—
চাবি দিয়ে আলমারি খুলে একটা কাঠের বাক্স বার করে নিয়ে এলেন তিনি। তার ভেতর থেকে কাগজে মোড়ানো একরাশ সোনার মুদ্রা সামনে ঢেলে দিয়ে বললেন, এ হলো মহামূল্য জিনিস, সোভোরেন বলে এগুলোকে। ইংলন্ডেশ্বরের নামাঙ্কিত। এমনি আরো অনেক জিনিস আছে যা এমা জানে, অন্য কেউ জানে না। এসবই হল আমার আর তোমার
এসব তোমাকে কেন দেখিয়ে রাখছি জান মেয়ে। আমি চাই না তুমি আমাকে অসুস্থ আর বুড়ো বলে ভাবো। ওরা আমাকে বুড়ো সাজিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু এখনো অনেক বছর বহাল তবিয়তে টিকে থাকব আমি। ওদের অনুগ্রহ করার জন্য অত সহজে মরছি না।
তোমার বুদ্ধি আছে, তেজ আছে, সেজন্য তোমাকে একটা উপদেশ দিতে চাই–কোনো অল্পবয়সী যুবকের পাল্লায় পড়ে নিজের ভবিষ্যতটা লোপাট করো না। নিজের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নিতে হলে সবুর করো
