-কী নাম বললেন? জ্যাপ না? ডঃ কারোলি থামলেন, পরক্ষণে বললেন, চিনি মানে, একবার দেখেছি, তাও দুর থেকে।
-উনি নাকি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর, বাড়ির কাজের লোকগুলো বলাবলি করছিল, তাতেই শুনলাম। কাছে পিঠে কোথায় একটা তদন্তের কাজে এসেছিলেন। স্থানীয় থানা থেকে খবর পেয়ে এ মৃত্যুর কিনারা সন্ধানে ঢুকেছেন এখানে।
এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কথা থামিয়ে রেনর ঘরের একপাশে চলে গেলেন।
ডঃ কারোলি রিসিভার তুলে নিলেন। ফিসফিসিয়ে বললেন–হ্যালো, মিওয়েল নাকি?
…হ্যাঁ, ভাই, আমি ……..না না, শেষ রক্ষা হল কই, বুড়োটা যে কাল রাতেই পরলোকে যাত্রা করেছে……. না না, ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যায় নি। লাশ কাটাছেঁড়া হয়েছে, শুনছি তো পাকস্থলীতে বিষমেশানো কফি পাওয়া গেছে…….কী বলছ? পুলিশ? হ্যাঁ এসেছে। ওই লোকটা। জ্যাব। একটু আগেই ঢুকেছে। ইন্সপেক্টার জ্যাপকে ভুলে গেছো নাকি?……হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টার ……না না, আমার মুখ দেখবার সুযোগ পেল কই? যাক, ছাড়ো ওসব কথা, আমি খুব শিগগিরই পৌঁছে যাচ্ছি হ্যাঁ, মোহোর ওই পুরনো ঠেক–ওখানেই আমায় পাবে। আজ রাত সাড়ে নটা নাগাদ চলে এসো, বুঝেছ, ভুল করো না। রাখছি, ঠিক আছে।
ফোনে কথা বলা শেষ করে ডঃ কারোলি হাতে টুপি আর স্যুটকেস তুলে নিলেন। খোলা ফ্রেঞ্চ উইন্ডোই এখন তার লক্ষ্য। দু-পা এগিয়েছেন কী এগোননি, এমন সময় জানলা দিয়ে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইন্সপেক্টর জ্যাপ, পেছনে তার দোসর এরকুল পোয়ারো।
পোয়ারোর বুঝতে দেরি হল না, কারোলি পালাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তা তো হবার নয়। তিনি একেবারে ডঃ কারোলির সামনে এসে দাঁড়ালেন।
ডঃ কারোলি চটে গেলেন খেলা করছেন নাকি! পথ ছাড়ুন। সময় নেই হাতে। এক্ষুনি বেরোতে হবে।
-মাফ করবেন, পোয়ারো বললেন, এ বাড়ির কাউকেই এক পাও বাইরে বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না জানেন।
–ওসব বাজে কথা রাখুন। ভালো চান তো সরে দাঁড়ান। ডঃ কারোলি প্রায় ধমকে। উঠলেন।
–আমার ভালো-মন্দ আপনি বিচার করবেন?
তখন পোয়ারোকে খ্যাপা মোষের রোগ চেপে ধরেছে। তিনি সামান্য সরে এলেন, নিজের ডান পা ঢুকিয়ে দিলেন ডঃ কারোলির দুপায়ের ফাঁকের মাঝে, তারপর দিলেন এক ল্যাং। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে কুপোকাত। ডঃ কারোলি একেবারে গিয়ে পড়লেন একটা খালি চেয়ারে।
ইতিমধ্যে কনস্টেবল জনসনও সেখানে পৌঁছে গেছে। পোয়ারো তাকে ইশারা করলেন। সে ডঃ কারোলির হাত থেকে স্যুটকেসটা কেড়ে নিল।
-ও-হো-হো, কী করছেন, মশাই? ঠিক করে বসুন, পড়ে যাবেন যে, বলতে বলতে ইন্সপেক্টার জ্যাপ এগিয়ে এলেন, বয়সের কথা ভুলে গেলে চলবে! চেয়ার থেকে ডঃ কারোলিকে টেনে তুললেন, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলন জ্যাপ, অবাকও হলেন।
-আরে, এ কাকে দেখছি? চোখ পাকিয়ে জ্যাপ বললেন–এ কাকে দেখছি, তুই টোনিও না, হা, ঠিক ধরেছি। সেই পোড়খাওয়া শয়তান। তা হতচ্ছাড়া, বাইরে কি ভাগাড়ের আকাল পড়েছে। কোন ধান্দায় এখানে এসে সেধিয়েছিস শুনি।
পোয়ারোও হতবাক। ডঃ কারোলির দিকে আঙুল তুলে জানতে চাইলেন–একে চেনেন? আপনার পুরোনো লোক বুঝি।
–তা যা বলেছেন, পুরোনো লোকই বটে, জ্যাপ মুচকি হাসলেন। এরা হল চোর আর ব্ল্যাকমেলারের দল। ইটালি থেকে ধাওয়া খেয়েছে, ঘাঁটি গেড়েছে এই শহরে। এ হল ওই দলের নাটের গুরু। চাঁদু অত্যন্ত ধড়িবাজ, ভাগ্যিস আপনি সময় মত ওকে ল্যাং মেরে কাত করে দিয়েছিলেন, তাইতো হতভাগাকে ধরা গেল, না হলে আমার হাত পিছলে বেরিয়ে পগাড় পার হত। টোনিও, তোর কপালটা মোটেই ভালো নয়, দুঃখ হচ্ছে। কয়মাস আগের কথা মনে পড়ে তোর? মিলানের আর্ট মিউজিয়াম থেকে রেমরুনের আঁকা আসল ছবিটা চুরি করেছিলিস, তোরই এক সাগরেদ ওটা বেচতে গিয়ে হাতে-নাতে ধরা পড়েছে। কেসটা আমাদের হেপাজতেই এখনও পর্যন্ত রয়েছে। তোর মদতেই চুরিটা হয়েছিল, ও সেটা বলে দিয়েছে, বুঝেছিস। ট্যা-ফু না করে সঙ্গে কী কী আছে বের কর। তারপর কনস্টেবলকে লক্ষ্য করে জ্যাপ বললেন–জনি, দাঁড়িয়ে না থেকে ওর পকেট সার্চ করো।
জনসন তার ওপরওয়ালার হকুম তামিল করল। ডঃ কারোলির পকেটগুলি হাতড়ে বেড়াল। শেষ পর্যন্ত তার জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে বের করল একটা অটোমেটিক পিস্তল ছোট এবং নলটা থ্যাবড়া মুখো। এবার ট্রাউজারের হিপপকেট, পাওয়া গেল একটা চাকু, কয়েকটি ফলা সেটির, খুব শান বোঝা গেল। এবার স্যুটকেস ঘাঁটা হল–বিশেষ কিছুই নেই। পাওয়া গেল একটা স্টেথোস্কোপ ব্লাডপ্রেসার মনিটর, আর একটা পুঁচকে টর্চ।
–টোনিও, তোর জবাব নেই। ভণ্ড ডাক্তার সেজে টুক করে ঢুকে পড়েছিস। হাসতে হাসতে জানতে চাইলেন বলি কোন মতলবে এখানে ঢুকেছিলিস? অসুখ-বিসুখের সঙ্গে পিস্তল-চাকুর কী সম্পর্ক?
-নিজেকে রক্ষার কারণে। ডঃ কারোলি জ্বলন্ত দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালেন, বুঝি পারলে গিলে খায়, আমার কাছে এমন কোনো আপত্তিকর জিনিস নেই, যা আপনাদের আমাকে আটকে রাখতে সাহায্য করবে, ইন্সপেক্টার জ্যাপ। তাছাড়া আপনার সে ক্ষমতাও নেই। তাই বলছি, আমাকে ছেড়ে দিন।
দাঁড়া, দাঁড়া, কলে-পড়া ইঁদুরের মতো ছটফট করিস না। আগে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাজতে যা, একটু সেবাযত্ন নিয়ে শরীরের মস্তি করে নে, তারপর দেখবি, তোকে আটকে রাখার ক্ষমতা আমার আছে কিনা। মঁসিয়ে পোয়ারো, জ্যাপ তাকালেন পোয়ারোর দিকে, আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি এই হারামজাদাই ফর্মুলাটা সরিয়েছে, তারপর স্যার ক্লডকে খুন করেছে। ওর কাছে নিশ্চয়ই এখনও ওই ফর্মুলাটা আছে, নয়তো পালানোর জন্য এত ধানাই-পানাই করছে কেন?
