ক্যারোলিন ধীর পায়ে ভাই স্যার ক্লডের আরাম কেদারার পাশে এসে দাঁড়ালেন হায় রে, হতভাগা ভাই আমার! তার চোখ দুটি জলে ভরে উঠল–বেচারা ক্লড।
-মাদাম, শান্ত হোন, এভাবে ভেঙে পড়বেন না, পোয়ারোর কণ্ঠে সান্ত্বনা ঝরে পড়ল–এ অপূরণীয় ক্ষতি, জানি না কিভাবে সব ঠিক হবে। মনে সাহস রাখুন।
-ফ্রাইসোল ছিল আমার ভাইয়ের প্রিয় খাবার। ক্যারোলিনের কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর। অনেক দিন পর ওটা আজ বেঁধে ওকে খাইয়েছিলাম।
-ভাইয়ের শোককে ভুলে থাকার এটাই আপনার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা, পোয়ারোর ঠোঁটে হাসি। পৃথিবীতে এমন কটা বোন আছে, যে তার ভাইকে তার প্রিয়পদ খাইয়ে জীবনের মতো বিদায় জানায় আপনি তো সৌভাগ্যবতী, মাদাম।
ক্যারোলিন আর দাঁড়ালেন না। রুমালে চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরোবার উদ্যোগ নিলেন। রিচার্ড তাকে সাহায্য করল। তাদের পেছন পেছন লুসিয়াও চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওপারে চলে গেল।
এই মুহূর্তে বসার ঘরে উপস্থিত আছেন মাত্র তিন জন একটি মৃত, দুটি জীবন্ত।
সদ্যমৃত স্যার ক্লডকে কেন্দ্র করে পোয়ারো তার সহকারী ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর সঙ্গে আলোচনায় মেতে উঠলেন।
০৭. ক্যাপ্টেন হেস্টিংস জানতে চাইলেন
০৭.
–কি মনে হচ্ছে, পোয়ারো, ক্যাপ্টেন হেস্টিংস জানতে চাইলেন।
–আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এস।
বন্ধুকে এই নির্দেশ দিয়ে পোয়ারো ঘরটি তীক্ষ্ণচোখে জরিপ করলেন। হঠাৎ এক জায়গায় এসে তার চোখ আটকে গেল। তিনি এগিয়ে এলেন ওল্টানো চেয়ারটার কাছে, যেটা মৃত স্যার ক্লড থেকে সামান্য দূরে। ওই চেয়ারটিতেই বসেছিলেন স্যার ক্লড অ্যামরির সেক্রেটারি এডওয়ার্ড রেনর।
ওটা কি? পোয়ারো নীচু হয়ে কি যেন একটা তুলে নিলেন।
ক্যাপ্টেন বন্ধু জানতে চাইলেন–কি পেলে?
–চাবি, পোয়ারো, জবাব, নিখুঁত একটা চাবি। শশব্যস্ত হয়ে বললেন, বন্ধু, চট করে স্টাডিতে যাও তো। ওঘরে একটা সিন্দুক আছে দেখেছি এই চাবিটা লাগিয়ে দেখ খোলে কিনা। কেউ আসার আগেই কাজটা সেরে ফেলা দরকার।
চাবি নিয়ে ক্যাপ্টেন হেস্টিংস এসে ঢুকলেন স্টাডিতে। পোয়ারো ইতিমধ্যে মৃত স্যার ক্লডের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। চারপাশে একবার সতর্ক চোখে তাকালেন, কান খাড়া করলেন। না, প্রশস্ত সময়। তিনি চট করে স্যার ক্লডের ট্রাউজার্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। টেনে বের করলেন একটা চাবির গোছা। সন্ধানী চোখে প্রত্যেকটা চাবি পরখ করলেন।
ইতিমধ্যে স্টাডি থেকে বেরিয়ে এসেছেন ক্যাপ্টেন হেস্টিংস ঠোঁটে খুশির ঝিলিক তুমি ঠিকই ধরেছ, বন্ধু, এই চাবি ওই সিন্দুকেরই, গর্তে ঢোকাতেই কেমন টুক করে ঘুলে গেল, আবার বন্ধ হল। এবার আমি এই ঘটনার গলদ কোথায়, ধরতে পেরেছি।
-বন্ধু, অত সহজ ভেবো না, কেসটা যেমন জটিল, তেমন রহস্যঘন, সময় লাগবে জট খুলতে, পোয়ারো হাত বাড়িয়ে বললেন, দাও, চাবিটা দাও দেখি।
বন্ধু-তথা সহকারীর কাছ থেকে চাবি পোয়ারো এক হাতে নিলেন, অন্য হাতে স্যার ক্লডের পোশাকের পকেট থেকে পাওয়া চাবির গোছর নির্দিষ্ট একটি চাবি তুলে ধরলেন। দুটো চাবি মিলিয়ে দেখলেন। একই তালার চাবি নিখুঁত ভাবে তৈরি কোনটা নকল আর কোনটা আসল, বোঝা মুশকিল।
চাবির গোছাটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে পোয়ারো হাতের চাবিটা দেখিয়ে বললেন–খুব তাড়াহুড়ো করে তৈরি হলেও নিখুঁত, এর সাহায্যেই কাজ হাসিল হয়েছে নিঃসন্দেহে।
তাহলে তো এর মানে হল………. ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর।
হঠাৎ শোনা গেল দরজায় লাগানো তালা খোলার মৃদুশব্দ। পোয়ারো সচকিত হলেন এবং ক্যাপ্টেন হেস্টিংসকে চুপ থাকতে বললেন। এগিয়ে গেলেন দরজার কাছে। কপাট দুটো ভেতর থেকে টেনে দিলেন, দরজা খুলে গেল। ট্রেডওয়েলকে দেখা গেল।
-মাফ করবেন, স্যার, পোয়ারোকে লক্ষ্য করে ট্রেডওয়েল বলল–উনি, আমার মনিব, ইশারায় আরামকেদারায় আধ শোওয়া স্যার ক্লডকে দেখিয়ে বলতে থাকল, তার হুকুমেই আমি এ ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালা এঁটে দিয়েছিলাম। আপনি এখানে না আসা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বজায় থাকবে–তাও বলেছিলেন।
–আমার ধারণা, তোমার মনিবের মৃত্যু হয়েছে। তোমার নাম কি, ছোকরা।
–আজ্ঞে, ট্রেডওয়েল। বলতে বলতে সে স্যার ক্লডের মৃত দেহের কাছে এসে দাঁড়াল। আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল–ওঃ ভগবান! তোয়ালে দিয়ে চোখ মুছল। শোক সংবরণ করে জানতে চাইল–ওর মৃত্যুর কারণ কি স্বাভাবিক, নাকি ইচ্ছে করে মারা হয়েছে?
-তার মানে? কি বলতে চাইছ তুমি?
ট্রেডওয়েলের চোখে চোখ রেখে পোয়ারো জিজ্ঞাসা করলেন।
-আজ সন্ধ্যার পর থেকে এ বাড়িতে এমন কিছু ঘটেছে, যা আমার মনে… ট্রেডওয়েল থামল।
-তাই বুঝি। পোয়ারো ট্রেডওয়েলের কথায় সায় দিলেন। তারপর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ইশারায় ট্রেডওয়েলের বক্তব্য বোঝাবার চেষ্টা করলেন।
ট্রেডওয়েল, তোমার এমন কিছু ঘটনার কথা আমার জানা খুব জরুরি। পোয়ারো বললেন–বল, এমন কি ঘটেছে, যা তোমার মনে খটকা জাগিয়েছে।
–ভেবে পাচ্ছি না স্যার, কোথা থেকে এই ঘটনার শুরু, ট্রেডওয়েল সহজ ভঙ্গিতে বলে চলল–তবে এখন আমার, পরিষ্কার মনে হচ্ছে, যেদিন ওই ইটালিয়ান ভদ্রলোক এ বাড়ির সকলের সঙ্গে বিকেলে চায়ের আসরে যোগ দিয়েছিলেন, তখনই প্রথম মনে হয়েছিল, কোথাও কোন গোলমাল হয়েছে।
