এটাও কী সম্ভব? এক স্ত্রীলোক, আবার জাদা ক্রিস্টোর মতো সরল স্বভাবের একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে এমন অপরাধ করা কি সম্ভব? হঠাৎ করে ঈর্ষান্বিত হয়ে পতিদেবতাকে, যাকে সে সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালোবাসে, যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, যাকে নিয়ে সে মনে মনে গর্ব অনুভব করে, তাকে সে নিজের হাতে শাস্তি দিতে পারে?
আত্মরক্ষার প্রস্তুতিও তত থাকবে–অথবা সে কি অন্ধের মতোই এই কাজ করে ফেলেছে? ভালো-মন্দ, হিতাহিত কিছুই সে একবারের জন্যেও চিন্তা করে দেখেনি?
পৈরটের স্মৃতির পর্দায় এবার ভেসে ওঠে, জার্দার চোখের সেই উদাস দৃষ্টি এবং হতভম্ব বধির অবস্থা। সে জানত না–সহজভাবে কথা বলতে গেলে বলতে হয়–সে কিছুই জানত না। কিন্তু এবারে তার মনে হলো যে তার জানা হয়তো উচিত ছিল। কেন সে জানতে পারল না? বহুদিন ধরেই সে অপরাধ বিভাগের কাজের ব্যাপারে যুক্ত ছিল, কিন্তু জাদাকে দেখেও তার মনে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন জাগেনি কেন?
জার্দা কি তাহলে সত্যি-সত্যি খুনী? অথবা জার্দা কি জনকে হত্যা করেনি? তবে? আসলে হত্যাকারী কে? প্রকৃত খুনীর সন্ধান করাই কি তার একমাত্র কাজ নয়?
১৬. করুণ চোখের দৃষ্টি
১৬.
জাদা ক্রিস্টো পোষাকের পেছন দিকটা তুলে মাথার ওপর দিয়ে একটা চেয়ার এসে দখল করল। অনিশ্চয়তায় ভরা তার করুণ চোখের দৃষ্টি। সে বলে, আমি ঠিক জানি না, আমি জানি না, সত্যি আমার কাছে সবই অজানা। কিছুই যেন ঘটেনি।
মিসেস প্যাটারসন দয়ালু মনের, তবে স্বভাব বেশ দৃঢ়চেতা। তিনি বলেন, আমি জানি, আমি সব জানি বোন। তিনি জানতেন শোকের মুহূর্তে কীভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়। বিপদে-আপদে এলসি সহযোগীদের কথা তুলনা করে তার বাড়ির লোকজনদের এই অভিমত।
হার্লি স্ট্রিটে জার্দার শোবার ঘরে তিনি এখন বসে আছেন। সেখানে বসেই তিনি চমৎকার সান্ত্বনা দিতে পারেন। লম্বা গড়নের এলসি প্যাটারসন বেশ হাসিখুশি স্বভাবের এবং উদ্যমশীল। জাদার এই ব্যাপারটাকে তিনি বিরক্তি এবং সহযোগিতার দৃষ্টি দিয়েই দেখছিলেন।
বেচারা জার্দা–স্বামী এইভাবে হারানোয় তার পক্ষে কতটা ভয়ানক শোকাবহ। আসলে এখন তিনি ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণভাবে ঠিকঠাক ভাবে বুঝে উঠতে পারেননি! মিসেস প্যাটারসন অবশ্য জানতেন যে, জাদার সবকাজই বেশ ধীরস্থির। তাই এই শোকের সময়েও তার সবক্ষেত্রেই সময় একটু বেশি লাগাটাই স্বাভাবিক।
ব্যস্তকণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন, আমার মনে হয় যে, কালো রঙের পোষাকটা আমি বারো গিনিতেই কিনে নিতে পারব। জাদা নীরব এবং নির্বিকার চিত্তেই দাঁড়িয়ে রইল, শুধু তার যুগল আন্দোলিত হল মাত্র। সে বলে ওঠে, আমি সত্যি এই সত্য জানি না যে, শোক এই ব্যাপারটা জনের পছন্দের তালিকায় পড়ত কিনা, আমার যতদূর মনে আছে, তিনি একবার নিজের মুখে বলেছিলেন যে, শোকের সময় কালো পোষাক ব্যবহার করা মোটেই তিনি পছন্দ করতেন না। জন বেঁচে থাকলে একমাত্র সেই আমাকে বলে দিতে পারত আমার এখন কী করণীয়।
কিন্তু জন আর কোনোদিনের জন্যই এখানে আসতে পারবে না…কখনও না-কোনোদিন না …ভেড়ার মাংস টেবিলের ওপর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে–রোগী দেখার ঘরের দরজার শব্দ…জন ছুটে ছুটে উপরে আসছে…সর্বদাই ব্যস্ত পদক্ষেপ…এত জীবন্ত, এত স্বাভাবিক…
জীবন্ত…চিৎ হয়ে সুইমিং পুলের পাশে শায়িত বুকের থেকে ঝরা রক্ত পুলের কিনারা থেকে জলে এসে পড়ছে…হাতে রিভলবারের স্পর্শ..
একটা দুঃস্বপ্ন একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে গেছে। কিন্তু কেউ তার স্বপ্নের কথা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত নয়। তার দিদির কর্কশ কণ্ঠস্বর কানে আসতেই জাদার চিন্তাজাল মাঝপথেই ছিন্ন হয়ে যায়…।
তিনি বলে ওঠেন, কিন্তু বিচারের মাধ্যমে অনুসন্ধান করতে গেলে কালো পোষাকের প্রয়োজন হতে পারে, তুমি যদি উজ্জ্বল পোষাক গায়ে চড়িয়ে সেখানে হাজির হও তবে খুব দৃষ্টিকটু দেখাবে।
জাদা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ভীতিপ্রদ গোছের এই বিচার! জার্দা চোখ বন্ধ করে। এলসি প্যাটারসন তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, তোমার পক্ষে এককথায় সাংঘাতিক বটে! তবে আমার মনে হয়, তুমি স্বমহিমায় আবার আমাদের কাছে ফিরে আসবে এবং আবার আমরা তোমাকে আগের মতো আতিথেয়তা করতে পারব।
জার্দা ক্রিস্টোর নীহারিকার মতো চিন্তার রেখা ক্রমেই কঠিন হতে থাকে। সে শুধু বলতে পারে, তার স্বর সত্যি খুব ভয়ার্ত এবং শুনে মনে হয় প্রায় ভীতসন্ত্রস্তও বটে–আমি কী করার জন্য ক্ষেপে উঠেছি, জনকে ছাড়া আমার পক্ষে কী বা করা সম্ভব?
এলসি প্যাটারসনের কাছে এ কথার জবাব তৈরিই ছিল। তিনি বলে ওঠেন, তোমার সন্তান আছে, তাদের মুখ চেয়েই তোমাকে জীবনের বাকি ক’টা দিন বেঁচে থাকতে হবে।
বিছানায় মুখ গুঁজে জেনা চিৎকার করে চোখের জল ফেলছে, আমার বাবা মারা গেছেন, আমার বাবা আর বেঁচে নেই।
পাণ্ডুর মুখে জিজ্ঞাসু নেত্রে বধিরের মতো বসে আছে টেরি। রিভলবার নিয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। এই কথা বলেই তাদের শুধু সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে, তারা এইটুকু সত্যই জানতে পেরেছে যে, এক দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা গেছে।
বেরিল কলিন্স সকালের কাগজটা লুকিয়ে ফেলেছিল, তাই ছেলেমেয়েদের দৃষ্টি পড়েনি। চাকরদের সে বারংবার সাবধান করে দিয়েছে, বেরিল যেমন দয়াবতী তেমনি চিন্তা করেই কাজ করেন।
