কিন্তু ভালো করে তাকাতে গিয়ে দেখা গেলো ওটা সাপ নয়, লোহার হুক। ঐ হুকে পাখা ঝুলানো হয়। কিন্তু কি ব্যাপার, এর আগে ওটা তো চোখে পড়েনি একবারও, আর আজই বা হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হলো কেন।
আর হুকটাই বা এলো কোথা থেকে? হুকের তো মানুষের মতো হাত পা নেই। নিশ্চয়ই আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ ওটা লাগিয়ে থাকবে। কিন্তু কি উদ্দেশেই বা…
শত চেষ্টা সত্বেও ঘুমের সঙ্গে আর বোঝাপড়া হলো না ব্লোরেরও, তবে চার দেওয়ালের বন্ধ ঘরে অনেক বেশী নিরাপদ বলে মনে করলেন তিনি।
নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি এবার ভাবতে বসলেন ওয়ারগ্রেভের কথা। লোকটার ওপর অনেক অভিশাপ ছিলো, তার মৃত্যুতে কারোর কোনো দুঃখ থাকার কথা নয়, আপদ গেছে। অনেক লোককে বিচারের নামে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়েছে সে, মরে সে তার পাপের পায়শ্চিত্ত করেছে।
পিস্তলটাই বা গেলো কোথায়? সেই পিস্তলই দিয়েই কি ওয়ারগ্রেভের কপাল ফুটা করা হয়েছে। যাই হোক ওয়ারগ্রেভের আততায়ীই যে পিস্তল চুরি করেছিলো, তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই।
তাঁর ভাবনায় বাধা পড়লো ঢং ঢং করে পেটা ঘড়িতে বারোটার আওয়াজ হতে। তার মানে সকাল হতে এখনো ছ ঘণ্টা বাকী। এই ছ ঘণ্টা নিশ্চিন্তে কাটানো যাবে। সকাল হলেই তো আবার মৃত্যু ভয়।
অযথা মোমাবতিটা পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাল যদি বেঁচে থাকি, যদি মৃত্যু আমাকে স্পর্শ না করে, কিংবা আমার প্রতি করুণা করে আর একটা দিন বেঁচে থাকার অনুমতি দেয়, তাহলে কাল রাতে আবার মোমবাতির প্রয়োজন হবে। কথাটা ভাবা মাত্র ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিলেন ব্লোর। ঘরের মধ্যে এক বুক অন্ধকার নেমে এলো। ছায়া ঘন অন্ধকার।
সেই আলো আঁধারিতে মনে হলো কারা যেন ঘরের মধ্যে চলা ফেরা করছে। ওরা কারা? এসে দেখছি মিসেস রগার্স আর মাস্টার্ন। বাঃ কি ভাবে দুজনে কেমন হাত ধরাধরি করে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেলো দেওয়ালের সঙ্গে। আচ্ছা, ওরা কি বুঝতে পেরেছে, আমি জেগে আছি, ওদের অমন সহজ সাবলীল ভঙ্গিমা দেখে আমি অবাক হয়েছি? আর সেই জন্যই কি লজ্জা পেয়ে মুখ লুকালো ওরা। কি জানে–
কিন্তু তুমি আবার কে এসে হাজির হলে বাপু? আমার দিকে একবার মুখ ফেরাও দেখি, দেখি তোমার মুখখানি, আমার নয়ন সার্থক করি।
আমার কথা শুনলো সে, সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফেরালো আমার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলাম। ল্যান্ডার তুমি? কিন্তু তুমি এখানে এলে কি করে। তুমি তো আমার কাছে অতীত এখন, অতীতের পুরনো ইতিহাস। তুমি কি সেই ইতিহাসের পাঠ শেখাতে এসেছে আমাকে? বলো, তাড়াতাড়ি বল কি বলতে চাও। আমার সময় বড় অল্প। এখানে এখন মৃত্যুর হাওয়া বইছে, সে কোনো মুহূর্তে খুন হয়ে যেতে পারি আমি। অতএব
কি বললে? তোমার স্ত্রী পুত্রের খবর নিতে ছুটে এসেছে আমার কাছে। তুমি আর লোক পেলে না। ওদের খবর আমি রাখতে যাবো কেন? দেখ গিয়ে এতদিনে হয়তো তাদের ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে।
কিন্তু পিস্তলটা গেলো কোথায়? কে কে নিতে পারে সেটা?
ছেদ পড়ল তার ভাবনায়। হঠাৎ কান খাড়া হয়ে উঠলো তার। এক জোড়া পায়ের শব্দ হেঁটে বেড়াচ্ছে বারান্দায়, অতি সন্তপণে পা ফেলছে। কিন্তু এতো রাত্রে কার এমন দুঃসাহস হলো ঘরের বাইরে বেরুবার? তবে কি সেই খুনীটা হা, খুনীই নিশ্চয়। তার আবার মৃত্যুভয় কিসের।
একসময় সেই ভুতুড়ে শব্দটা থামলো। তবু কান পেতে রইলেন ব্লোর। না আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না, শুধু বাতাসের দাপাদাপি, সেই ঝড়ো বাতাসের হাওয়া লেগে থাকবে প্রাসাদের কোনো ঘরে। দরজার পাল্লা, পালা করে একবার খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে।
তারপরেই আবার শোনা গেল একটা শব্দ। এবার যেন আগের চেয়ে অনেক ধীরে, পায়ের আওয়াজ অনেক মৃদু। শব্দটা যেন আর্মস্ট্রং এর ঘরে, লম্বার্ডের ঘর পেরিয়ে থামলো আমার ঘরের সামনে এসে। তাহলে
নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে দ্রুত হাতে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন ব্লোর। চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টি বোলালেন, কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়লো না। তবে এবার মনে হলো, শব্দটা নিচের হলঘর পেরিয়ে প্রাসাদের প্রধান গেটের দিকে এগুচ্ছো। নিচে নামতে গিয়েও নামলেন না তিনি। কে জানে, তাকে ঘর থেকে টেনে বার করে আনার জন্য খুনীর এটা একটা চাল কিনা। যাই হোক। তার দৃষ্টি এখন ঘাটের দিকে। হঠাৎ তিনি যেন দেখতে পেলেন, গেট পেরিয়ে কে যেন ছুটে প্রাসাদের বাইরে পালিয়ে গেলো। হুঁশ হলো ক্লোরের। এখন আর চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই সব অদ্ভুত কাণ্ডখারখানা একা একা দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এখন একটা কিছু করা দরকার। হয়তো এখুনি ছুটে গেলে আগন্তুক তথা আততায়ীকে খুঁজে বার করা যেতে পারে। খুব বেশী দূরে যেতে পারেনি বলেই মনে হয়।
ছুটে গেলেন তিনি আর্মস্ট্রং-এর ঘরের সামনে। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা মারলেন তিনি, তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর রাত্রির নিস্তদ্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়লো–শুনছেন মিঃ আর্মস্ট্রং। আপনি যদি ঘরে থাকেন তো একেবারের জন্য বাইরে বেরিয়ে আসুন।
উত্তর নেই আর্মস্ট্রং এর।
দ্বিতীয়বার ডাকলেন, তৃতীয় বারেও কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। আর নয়, এবার তিনি ছুটে চললেন লম্বার্ডের ঘরে। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিলেন। দরজা খুলে গেলো। লম্বার্ডকে দরজার ওপারে দেখতে পেয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলেন ব্লোর, অনেক ডাকলুম, কিন্তু আর্মস্ট্রংকে ঘরে পেলাম না। একটা ব্যবস্থা নিতে হয়, বাইরে আসুন আলোচনা করা যাক।
