হ্যাঁ, এই পৃথিবীটাই তো ঈশ্বরের আদালত। বিচারক স্বয়ং ওয়ারগ্রেভই। নিজের এজলাসে তিনি নিজেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন। ভবিষ্যতে আদালতে তার মুখ থেকে আর কোনো খুনী আসামীর ফাঁসির দণ্ডাদেশ শোনা যাবে না। আজই তার শেষ বিচার, শেষ রায় দেওয়া, যে রায়ে নিজের মৃত্যুবরণ করলেন বিচারক ওয়ারগ্রেভ।
লম্বার্ডের চোখে স্থির দৃষ্টি রাখল ভেরা, অবিশ্বাসের চাহনি, কথায় বিদ্রুপের সুর আজ সকালে আপনি আপনার সন্দেহের কথা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ঐ ওয়ারগ্রেভই নাকি খুনী, উন্মাদ, আগের পাঁচটি খুনের জন্য দায়ী। এর পরেও কি আপনার সেই সন্দেহটা বলবৎ থাকবে মিঃ লম্বার্ড?
.
১৪.
তারা চারজন ধরাধরি করে ওয়ারগ্রেভের মৃতদেহ দোতলায় তুলে নিয়ে এসে তার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিলো যত্ন সহকারে। সেখান থেকে ফিরে সবাই হলঘরে। আবার সেই আলোচনা–অতঃ কিম–
ওদিকে খিদেও খুব পেয়েছিল সকলের। মুখ-আঁটা চারটে টিনের খাবার আনা হলো রান্নাঘরে থেকে। টিনের মুখ কেটে খেতে শুরু করলেন সবাই। খেতে গিয়ে মন্তব্য করলো ভেরা অদ্যই শেষ রজনী! হয়তো এটাই আমাদের শেষ খাওয়া।
তার মুখের কথাটা লুফে নিয়ে বললেন ব্লোর, কিন্তু আমি, ভাবছি এবার কার পালা?
অনিচ্ছা সত্বেও হাসলেন ডঃ আর্মস্ট্রং, ওসব অলুক্ষণে কথা না বলে আরো বেশী সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করুন আপনারা। সাবধান হলে
তার আসমাপ্ত কথার জের টের এবার ব্লোর তার বক্তব্য রাখলেন, যিনি ছিলেন আমাদের প্রধান পরামর্শদাতা, সব সময় সতর্ক থাকার কথা বলতেন আমাদের, তিনিই আজ অসাবধানতার শিকার হলেন।
কিন্তু কি ভাবে এই এমন একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটলো?
খুব সহজ পথেই। ব্যাখ্যা করলো লম্বার্ড, এ সব খুনীর চালাকী, আগে থেকে বৃদ্ধ ওয়ারগ্রেভের ওপর থেকে আমাদের নজর অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ফাঁদ পেতে ছিল সে মিস্ ক্লেথনের বাথরুমে সংলগ্ন ঘরে শেওলা ঝুলিয়ে রেখে। দু-এক দু-চোর এর মত শেওলাটা সাপ ভেবে চিৎকার করে উঠতেই আমরা তার ঘরে ছুটে যাই ওয়ারগ্রেভ ছাড়া, ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম ওয়ারগ্রেভের কথা। তার সুযোগ নেয় আততায়ী তার পূর্ব পরিকল্পিত কাজ হাসিল করে।
তা না হয় হলো, কিন্তু গুলির আওয়াজ? সেটা কেন আমাদের কানে এলো না?
আসবে কি করে? বাইরে তীব্র ঝড়ো বাতাসের আওয়াজের সঙ্গে মিস্ ক্লেথনের চিৎকারের শব্দে গুলির আওয়াজটা চাপা পড়ে যায়।
তা সেই খুনী শয়তানটা আমাদের চারজনের মধ্যে একজন না হয়ে যেতে পারে না, সকলের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে অন্যদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখলেন আর্মস্ট্রং কে, কে হতে পারে সে?
আমি বলতে পারি সবজান্তার হাসি ফুটে উঠতে দেখা গেলো ব্লোরের ঠোঁটে।
আপনি? ভেরার দিকে ফিরে তাকালেন আর্মস্ট্রং আপনি কিছু জানেন মিস্ ক্লেথর্ন?
না, জানি না। ঘাড় নাড়লেন মিস ক্লেথর্ন। এ প্রসঙ্গে আমিও একজনকে আন্দাজ করেছি। কারোর দিকে না তাকিয়েই বললেন আর্মস্ট্রং।
আরো একটু খোলসা করে বললো লম্বার্ড, আর আমি তো একজনকে প্রায় চিহ্নিতই করে ফেলেছি, এখন তাকে হাতে নাতে ধরার যা অপেক্ষা।
মন ভাল নেই ঘুমও পাচ্ছে, উঠে দাঁড়ালো ভেরা, আমি এখন শুতে চললাম।
তারপর একে একে সবাই উঠে পড়লেন। সবার শেষে উঠলেন ডঃ আর্মস্ট্রং, তার কণ্ঠস্বর কেমন যেন ভারী ভারী শোনালো, হ্যাঁ ঘুমের মধ্যেই নিহিত আছে এক অপার শান্তি, অনন্ত সুখের সম্ভাবনা
আর সেই সুখ, সেই শান্তির সন্ধানে নিঃশব্দে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন যে যার ঘরের দিকে।
ভাল করে দরজা বন্ধ করলো লম্বার্ড। ঘরের ভেতর থেকে দরজা ঘেঁষে লোহার চেয়ারটা রাখতে ভুললো না, দরজা ভাঙ্গতে গেলে লোহার চেয়ারে আওয়াজ হতে বাধ্য, আর তাহলেই তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবতে বসলো সে। এ এক উটকো ঝামেলায় পড়া গেলো। দুদিনে ভয়ে আতঙ্কে শরীরটা যেন একেবারে পঙ্গু হয়ে গেছে। এর শেষ কোথায় দেখা যাক।
পোষাক বদল করে বিছানায় শুতে যাবে, হঠাৎ পলঙ্ক সংলগ্ন টেবিলের ড্রয়ারের দিকে তার চোখ পড়তেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো লম্বার্ড অনেকক্ষণ, অবিশ্বাস্য। ড্রয়ারের বাঁদিকে পড়ে রয়েছে তার হারানো পিস্তলটা……..সেই মুহূর্তে তার চোখ থেকে উধাও হয়ে গেলো রাতের ঘুম।
ওদিকে ভেরার চোখে ঘুম নেই। মোমের আলোর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ভাবছে সে এখন, এখানে মৃত্যুর হাওয়া, নিঃশ্বাসে বিষ, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তবু এরই মধ্যে রাতটুকুই যা নিরাপদ। চার দেওয়ালের এই নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে একবার ঢুকে পড়তে পারলেই হলো, এখানে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা যাবে না, বিষ মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। এখন অন্ধকারই ভাল লাগে, বেশী নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে একবার ঢুকে পড়তে পারলেই হলো, এখানে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা যাবে না, বিষ বেশী নিরাপদ বলে মনে হয়। এখন আলো দেখলেই আতঙ্কে বুক কাঁপে, বাইরে বেরুলে আলোয় গায়ে কাঁটা দেয় এক অজানা ভয়ে।
মোমের এই সামান্য আলোটুকু এখন আমার চোখে যেন একটা নরম উয় স্পর্শে রাখে, ভাল লাগে সেই অনুভূতিটা, ভুলে থাকা যায় অতীতের সেই কলঙ্কময় স্মৃতি। স্বল্প হলেও মোমের আলোয় আলোকিত ঘরখানি, সে আলোয় স্পষ্ট ঘরের সব কিছু দেখা যাচ্ছে, দরজা জানালা, আসবাবপত্র, সব কিছুই। এক এক করে দৃষ্টি পরিক্রমা শেষে তার চোখ গিয়ে বিদ্ধ হয় ছালের ওপর। আর তখনি তার আর এক দফা চমকানোর পালা–আরে ওটা কি সত্যিই সাপ নাকি?
