বাইরের পোষাক গায়ে চাপিয়ে একটু পরেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো লম্বার্ড।
পাশের ঘরটা ভেরার। দরজায় একবার মাত্র ধাক্কা দিতেই সাড়া মিললো। নিচু গলায় তাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য বললেন ব্লোর, ঘর থেকে একদম বেরুবেন না মিস্ ক্লেথর্ন। সাবধান। সাবধান। যে কোনো মুহূর্তে খুনী আমাদের খতম করে দিতে পারে।
চলুন, এবার আর্মস্ট্রং এর ঘরের দিকে যাওয়া যাক, বলেই ছুটলেন ব্লোর, তার পিছু পিছু লম্বার্ড।
চলতি পথেই ব্লোরের মুখ থেকে সংক্ষেপে আর্মস্ট্রং এর সম্পর্কে সব শুনে লম্বার্ড বলে, তাহলে এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আর্মস্ট্রংই এই খুনের নাটকের নায়ক, না ভিলেন বলা উচিৎ।
হ্যাঁ না কিছুই বললেন না ব্লোর। চুপ রইলেন।
আর্মস্ট্রং-এর ঘরের সামনে এসে থামলেন তারা। ঘর তখনো বন্ধ। তালায় চাবি ঝুলছে না দেখে তারা ধরে নিলেন, চাবি তিনি সঙ্গে নিয়ে গেছেন। এখন তাকে খুঁজে বার করতে হবে। প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার আগে ক্লোরের উদ্দেশ্যে বললল লম্বার্ড, একটু অপেক্ষা করুন, আমি ততক্ষণে মিস ক্লেথনকে সাবধান করে দিয়ে আসি আর একবার।
ভেরার ঘরের সামনে এসে গলা চড়ালো লম্বার্ড, শুনুন মিস ক্লেথর্ন, আমরা এখন বেরুচ্ছি আর্মস্ট্রং এর খোঁজে। তাই আপনাকে সাবধান করে দিয়ে যাচ্ছি, কেউ ডাকলে দরজা খুলবেন না যেন। এমন কি আমাদের দুজনের মধ্যে একটা আলাদা করে কেউ ডাকলেও নয়। তবে আমরা যখন দুজেন এক সঙ্গে ডাকবো, তখনি কেবল খুলবেন। মনে থাকবে তো?
হুঁ।
চলুন এবার যাওয়া যাক, ক্লোরের উদ্দেশ্যে বললল লম্বার্ড।
যাবো বললেই হলো, একটু ইতস্ততঃ করলেন ব্লোর, পিস্তলটা তো ওঁর কাছেই আছে।
পিস্তলের জন্য চিন্তা করবেন না। ওটা এখন আমার কাছেই আছে। শুতে যাওয়ার সময় ওটা টেবিলের ড্রয়ারের সামনে আবিষ্কার করি।
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ালেন ব্লোর, আমি আপনার সাথী হবো না।
সাথী হবেন না কেন? মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো লম্বার্ড ভেবেছেন আমি আপনাকে গুলি করে মারবো? মোটেই না। জেনে রাখুন আপনার মতো একটা মাথা মোটা লোককে মারবার জন্য পিস্তলের প্রয়োজন হয় না। আর ন্যাকামো না করে চলুন এবার। বেশী দেরী হয়ে গেলে তাকে আর ধরা যাবে না।
দ্বিধা ভাব কেটে গেলো ব্লোরের। অনুগতের মতো লম্বার্ডের পিছু পিছু প্রাসাদের গেট পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন ঘোর অন্ধকার।
অনেকক্ষণ হলো ওঁরা বাইরে গেছেন অথচ এখনো ফেরার নাম নেই। দোটানায় পড়ে অধৈর্য হয়ে উঠলো ভেরা। অহেতুক ঘরের মধ্যে পায়চারি করলো বার কয়েক। জানালার পাল্লা সামান্য একটু টেনে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো সে একবার, না কেউ কোথাও নেই। নিশ্চিন্ত হলো, শক্ত কাঠের দরজা। আর্মস্ট্রং এর মধ্যে সেই দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢোকে।
কিন্তু ওঁরাই বা এখনো ফিরছেন না কেন। রাতের অন্ধকারে গেলেনই বা কোথায়?
ঝন ঝন করে নিচে কাঁচ ভাগার শব্দে ভেরার চিন্তায় বাধা পড়লো। এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠলো সে। তার একটু আগের সব সাহস যেন নিমেষে হারিয়ে গেলো। এতো বড় প্রাসাদে সে এখন একা। যদি খুনী এসে এখন তাকে……
হ্যাঁ, ঐ তো কে যেন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে, মৃদু পায়ের শব্দ। ঐ আসছে, কে ও …..। শব্দটা বন্ধ হয়ে গেলো। তাহলে আমার শোনার ভুল
না, ঠিকই শুনেছি। ঐ তো আবার সেই পায়ের শব্দ। এবার আগের থেকে একটু জোরালো সেই সঙ্গে দুজনের কথোপকথনও ভেসে এলো। তার মানে একজন নয় দুজন আসছে। দরজার কাছে এসে থামলো দুজোড়া পায়ের শব্দ।
শুনছেন মিস ক্লেথর্ন? ঐ তো লম্বার্ডের কণ্ঠস্বর, আমরা ফিরে এসেছি।
তাড়াতাড়ি দরজা খুলুন। এবার বললেন ব্লোর, সাংঘাতিক ব্যাপার।
চটজলদি দরজা খুলে পালা করে দুজনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো ভেরা, কি দেখলেন বলুন।
আর্মস্ট্রং বেপাত্তা, জবাব দিলো লম্বার্ড হাওয়ার মিলিয়ে গেছেন তিনি।
অসম্ভব। প্রতিবাদ করে উঠলো ভেরা, দেখুন গিয়ে কোথাও না কোথাও তিনি ঠিক লুকিয়ে আছেন।
সারা দ্বীপ আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছি, কোথাও তার চিহ্নটি আমরা দেখতে পাই নি।
এমনো তো হতে পারে ভেরা বলে আপনারা বেরিয়ে যাবার পরেই ফিরে এসেছেন এই প্রাসাদে। এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছেন।
না, সে সম্ভাবনার কথাও বাতিল করে দিতে হচ্ছে। এ প্রাসাদের সব জায়গাই আমাদের দেখা হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও নেই তিনি।
জানি না বাপু, ভুতুড়ে প্রাসাদ, এখানকার কোনো ব্যাপারেই আমার বিশ্বাস হয় না।
বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে শুনুন, খাবার ঘরের একটা শার্সি ভেঙ্গে চুরমার। আর
কি?
আর কি?
খাবার ঘরের আলমারির ভেতরে রাখা চারটের বদলে এখন পুতুল রয়েছে মোট তিনটে।
সেই কবিতাটির কথা যেন মনে পড়িয়ে দেয়—
চারটি কালো মানিক সাগর জলে
নাচে ধিন্ ধিন,
একটি গেলো সিন্ধু পাখির পেটে
ফিরলো বাকী তিন।
১৫. সঙ্কটময় রাত্রির অবসান
১৫.
আর একটি সঙ্কটময় রাত্রির অবসান হলো।
প্রাতঃরাশ সারা হলো রান্নাঘরে। লোক তো মোটে তিনজন, কে আবার খাবার ঘরে কষ্ট করে খাবার টেনে নিয়ে যায়।
বাইরের আবহাওয়াটা এখন গতকালের ঠিক বিপরীত। ভোরের নরম রোদে আকাশ ঝলমল করছে। মেঘমুক্ত আকাশ। সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসছে হাল্কা বাতাস। কে বলবে কালকের আকাশ ছিলো মেঘে ঢাকা, বাতাসে ছিল ঝড়ের দাপট।
