তার মনটা তখনো যেন একটা কাল্পনিক জগতে ভেসে বেড়াচ্ছিল–অশান্ত সমুদ্র ফেনিল নীল জলরাশি, বাতাসে শীতের তীক্ষ্মতা, ঝড়ের দাপটে ঢেউগুলো তীরে এসে জলের স্রোতে ঢুকে পড়েছে বাথরুমে। জলের সেই কলকল শব্দ ছাপিয়ে তার কানে ভেসে আসছে কার যেন পায়ের শব্দটা, ঠিক তার পিছনে এসে থামলোকে হ্যাঁগো তুমি? কিন্তু তুমি তুমি এখানে এলে কি করে হুগো? আমি যে তোমাকে
কিন্তু কে কোথায়? এবারেও আমার দেখার ভুল, শোনার ভুল। হুগো কি করেই বা আসবে এখানে। সে তো এখন আমার কাছে অতীতের স্মৃতি বই আর কিছু নয়। অতীত কি কখনো জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে?
তবু, তবু কেন আমি তোমার হাতের স্পর্শ অনুভব করছি হুগো? আমার পিঠে তোমরা হাত বিলি কাটছে, যেন তুমি আমাকে আদর করছো, তোমার হাতের স্পর্শটা আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। কিন্তু তোমার হাত তো কখনো লোমশ ছিল না।
হঠাৎ কথাটা মনে হতেই প্রচণ্ড ভয়ে, আতঙ্কে জোরে চিৎকার করে উঠল ভেরা।
তার অতি চিৎকার শুনে ওঁরা তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলেন। লম্বাৰ্ডই প্রথমে লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে ফেললো। অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়ে না। বাথরুমে ঢুকে ভেরার উদ্দেশ্যে ডেকে উঠলো সে, আপনি কোথায় মিস্ ভেরা? ভয় নেই, এই তো আমরা এসে গেছি। কি হয়েছে আপনার?
ভেরার হাত থেকে মোমবাতিটা পড়ে গিয়ে নিভে গেছে। অন্ধকারে ডুবে আছে বাথরুম। টর্চের আলো ফেললো লম্বার্ড। মেঝের ওপর থেকে মোমবাতিটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার জ্বালালো। লম্বার্ডের ডাকাডাকিতে এক সময় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো ভেরা। প্রথমেই তার চোখ পড়লো ছাদের ওপর। আর সঙ্গে সঙ্গে আবার সে আর্তনাদ করে উঠলো, ওটা, ওটা কি?
ভেরার দেখা দেখি তারাও তাকালেন ছাঁদের দিকে–ছাদ থেকে সাপের মতো ঝুলছে একটা সামুদ্রিক শেওলা। আর সেটাই খানিক আগে ভেরার পিঠ স্পর্শ করলে তার মনে হয়ে থাকবে কারোর নোমশ হাত বুঝি।
সেটা বুঝতে পেরেই সহসা উন্মাদিনীর মতো শব্দ করে হাসতে শুরু করে দিলো ভেরা, সমুদ্র ঢুকে পড়েছে বাথরুমে, ঘর ভর্তি নীল জল–
ভেরার অমন অবস্থা দেখে ছুটে গিয়ে নিচ থেকে ব্র্যান্ডির একটা ভোলা বোতল নিয়ে এলেন ব্লোর। এগিয়ে গিয়ে ভেরার মুখের কাছে বোতলের মুখটা তুলে ধরতেই ঝাঁপিয়ে পড়লো লম্বার্ড র ওপর, হ্যাঁচকা টান দিয়ে তার হাত থেকে বোতলটা কেড়ে নিলো সে। কিছুতেই খেতে দেবো না। না, কিছুতেই না।
অনুযোগ করলেন ব্লোর, ব্র্যান্ডিটা সন্দেহ করার কিছু ছিলো না।
কি করে বুঝলেন? প্রশ্ন চোখে তাকালেন আর্মস্ট্রং হয়তো আপনি নন, অন্য কেউ তো বোতলে বিষ মিশিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। ওপর থেকে দেখে সেটা বোঝার কি উপায় আছে বলুন?
সেই সময় লম্বার্ড এসে ঢুকলো হাতে তার নতুন একটা ব্র্যান্ডির বোতল। ভেরার চোখের সামনে বোতলটি দেখিয়ে হাসলো সে, দেখে রাখুন, একেবারে ব্র্যান্ড নিউ।
সীলমোহর করা ছিপি খোলা হলো, ঢালা হলো ব্র্যান্ডি একটা গ্লাসে। তারপর গ্লাসটা তুলে ধরা হলো। ভেরার মুখের সামনে। এর চুমুক খেয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। তৃষ্ণা মিটে গেছে তার। মুখ থেকে সরে গেছে সেই ভয়ার্ত ভাবটা।
আত্ম বিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠলো লম্বার্ডের ঠোঁটে, ভাগ্য ভাল মিস্ ক্লেথর্নের, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলেন তিনি।
আমার আনা ব্র্যান্ডিটাও কিন্তু ভালো ছিলো বিষমুক্ত, আবার বললেন ব্লোর।
সুস্থ হয়ে ওঠার পরেই কি খেয়াল হলো ভেরার, এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে উঠলো সেও, মিঃ ওয়ারগ্রেভ কোথায়, তাকে তো দেখছি না–কেন?
সত্যিই তো, আমরা সবাই এলাম, কিন্তু তিনি, তিনি এলেন না তো।
বড় ভাবনায় ফেললেন তিনি। চলুন, তাড়াতাড়ি নিচে গিয়ে দেখি, উনি কোথায়, কি করছেন।
এরকম ছুটেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন সবাই। তারপর সোজা হলঘরে, আর্মস্ট্রং প্রথমে তার নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ নেই। আবার ডাকলেন, শুনছেন মিঃ ওয়ারগ্রেভ, কোথায় আপনি? সাড়া দিন। এবারেও কোনো উত্তর নেই।
সবাই তখন ছুটলেন বসবার ঘরে। ঢোকার মুখেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন আর্মস্ট্রং, তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন।
কাছে গিয়ে তার দেখতে হলো না। দূর থেকেই সবাই দেখলেন, চেয়ারে বসা ওয়ারগ্রেভের মাথাটা ঝুলে পড়েছে ডান দিকে। পরনে বিচারকের পোষাক, মাথায় পরচুলা, কপালে ক্ষতচিহ্ন, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝড়ে পড়ছিলো তখনো সেখান থেকে। নিষ্প্রাণ দেহ। পরীক্ষা না করেই বোঝা গেলো, বৃদ্ধ আর জীবিত নেই।
নিয়ম রক্ষার জন্য এগিয়ে গেল ডঃ আর্মস্ট্রং। নিচু হয়ে নাড়ি টিপলেন স্পন্দনহীন। উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন তিনি সব শেষ। গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন তিনি।
গুলি, চমকে উঠে লম্বার্ডের দিকে তাকালেন ব্লোর, তাহলে শেষ পর্যন্ত পিস্তলটার হদিস পাওয়া গেলো।
এবার গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে ওয়ারগ্রেভের মাথা থেকে পরচুলা তুলে নিতে গিয়ে অবাক হলো ভেরা, এ যে দেখছি মিস্ ব্লেন্টের হারানো উল কেটে তৈরী পরচুলা।
আর বুকের ঐ যে আলখাল্লায় আঁটা ফিতেটা দেখতে পাচ্ছেন আপনারা, বললেন ব্লোর, ওটা বাথরুম থেকে উধাও হওয়া পর্দা দিয়ে তৈরী।
মৃত ওয়ারগ্রেভের দিকে তাকিয়ে আপন মনে সেই কবিতাটা থেকে আবৃত্তি করে উঠলো লম্বার্ড, পাঁচটি কালোমানিক গেলো আদালতে দিতে বিচারে মন, একটি গেলো কারাগারে ফিরলো বাকী চারজন।
