ওদিকে বেলা বেড়ে চলে যতো, ততোই যেন চল হয়ে ওঠেন আর্মস্ট্রং। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বলে উঠলেন, আসন্ন মৃত্যু ভয়ে এভাবে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না, শুধুই চলে যাচ্ছে সময়। তাই বলি কি সময়টাকে আরো রেখে যদি কিছু একটা করা যায়
কি করা যায়? কিই বা করা যেতে পারে। শুরু হল আর এক প্ৰথ আলোচনা। এক একবার এক একজন বক্তা, বাকী চারজন তখন নীরব শ্রোতা। দীর্ঘ আলোচনার পর একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছলেন তারা। বাইরে কেউ বেরুবে না একান্ত প্রয়োজন ছাড়া। যদি বা কেউ বেরোয়, বাকী চারজন অপেক্ষা করবে, তার ফিরে না আসা পর্যন্ত।
তোফা! তোফা! হাততালি দিয়ে উঠলো লম্বার্ড, এমন ভাল প্রস্তাব, বুঝি আর হয় না। এ ভাবেই আমরা কাটিয়ে দিতে পারবো কয়েক ঘন্টা। তারপর নিশ্চয় বৃষ্টি থামবে। তখন না হয় নতুন উদ্যম নিয়ে এ দ্বীপ থেকে আমাদের উদ্ধার করার জন্য এখান থেকে সংকেত পাঠাবার ব্যবস্থা করা যাবে। আর কেউ যদি লঞ সমতে উদ্ধার করতে না আসে, তখন নিজেরাই না হয় একটা ডিঙি নৌকা তৈরী করে তাতে চেপে বসবো সকলে, তারপর ভেসে চলবো নিশ্চিত জীবনের আশায়।
কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তবে তো? আর্মস্ট্রং এর মনে গভীর সংশয়।
আলবাৎ থাকবো। দৃঢ়স্বরে বললেন ওয়ারগ্রেভ, চোখ কান খুলে রাখলে মৃত্যু আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।
তারপর আবার সবাই নীরবে তলিয়ে গেলেন চিন্তার অতলে। সবার সেই একটাই চিন্তা কি করে জয় করা যায় মৃত্যুকে। মৃত্যু ভয়কে। তবে এঁদের মধ্যে একজন ব্যতিক্রম, মৃত্যু ভয় তার নেই, মৃত্যুর উর্ধ্বে সে, তার ভয় চারজোড়া চোখ কি করে ফাঁকি দিয়ে কাজ হাসিল করা যায়, সন্দেহ এড়ানো যায়……।
…আমার সন্দেহ আর্মস্ট্রংকেই। ঐ লোকটা আগের চার চারটে খুনের জন্য দায়ী, তবে ব্যাটা অভিনয় ভালই জানে দেখছি। কেমন একটার পর একটা খুন করে, এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন তার কতোই না চিন্তা আমাদের আসন্ন মৃত্যু ভয়ে। কি অদ্ভুত তার চাহনি। ঘোলাটে, উদভ্রান্ত ভাব। এতোগুলো খুন করার পর লোকটা পাগল হয়ে গেলো নাতো। না, না হয়তো এটাও তার একটা অভিনয়। হ্যাঁ, অভিনয় নয় তো কি? ব্যাটা একটা মিট মিটে শয়তান, দাগী খুনী……।
…..খুনী, তুমি যতো চালাকই হও না কেন, আমাকে তুমি বোকা বানিয়ে তোমার কাজ হাসিল করতে পারবে না। হয়তো এখন একটু বেকায়দায় পড়েছি, তবে এর থেকেও আরো বেশি কঠিন বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে এর আগে। সে বিপদ যখন ঠিক কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, তখন কেন অহেতুক ভয় করতে যাবো তোমাকে?, কিন্তু ঐ পিস্তলটা? গেলোই বা কোথায়? নিয়েছে আমাদেরই মধ্যে কেউ একজন, তার ঠিকানা কি, কে বলতে পারে…।
….ওরা সবাই অহেতুক ভয় পাচ্ছে, মৃত্যু ভয় দেখাচ্ছে আমাকে। কিন্তু আমি যে আরো কিছুদিন বাঁচতে চাই, এতো তাড়াতাড়ি মরলে আমরা অনেক কাজই যে অসমাপ্ত থেকে যাবে……..
…..মৃত্যু ভাসে বাতাসে। এখানকার বাতাসে ছড়িয়ে আছে মৃত্যুর বীজ। যে কোনো মুহূর্তে সেই বীজ বপন হতে পারে আমরা শরীরে….
……সহজে কি মৃত্যুকে এড়ানো যাবে? যত সতর্কই হই না কেন, হয়তো মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবো না। ঐ শুনি মৃত্যুর পদধ্বনি…….
……এখনো পাঁচটা বাজতে কুড়ি মিনিট। সময় যেন আর কাটতে চায় না। ঘড়িটা কি বন্ধ হয়ে গেছে? না ঐ তো কাঁটাগুলো ঠিকই তো চলছে টিক, টিক, টিক। মৃত্যুর পরোয়ানা জাহির করতে হবে। মাথায় এক সর্বনাশা আগুন জ্বলছে, বুকের ধুকধুকানি। শেষ বিচারের দিন আসন্ন। কেউ সন্দেহ করেনি তো? এ ব্যাপারে নিশ্চিত বলা যায়। তা সত্বেও আরো বেশী সতর্ক হতে হবে। কিন্তু, এর পর কাকে যেতে হবে? বিচারের রায় কার কার বিরুদ্ধে যাবে….
পাঁচটা বাজতেই উঠে দাঁড়ালো ভেরা, চা করতে চললাম।
দাঁড়ান। হাত নেড়ে বললেন ওয়ারগ্রেভ, আমরাও যাবো আপনার সঙ্গে। দেখবো কেমন করে আপনারা চা তৈরী করেন।তারপর নিজের মনেই বললেন তিনি, একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না, সাবধানের মার নেই।
চায়ের আয়োজন হলেও তা না খেয়ে গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন ওয়ারগ্রেভ, ডঃ আর্মস্ট্রং এবং ব্লোর।
ততধিক অন্ধকারের ছায়া নামলো লম্বার্ডের মুখে, রগার্স নেই, জেনারেটার চালানো হয়নি, তার মৃত্যুর পর কারোর খেয়ালও হয়নি।
বসবার ঘরে কয়েকটা মোমবাতি দেখে এসেছি, বললেন ওয়ারগ্রেভ, নিয়ে আসি, ওগুলো দিয়ে কাজ চালানো যাবে আপাতত।
দেখতে দেখতে ছটা কুড়ি বেজে গেলো।
ভেরার কপালে তীব্র যন্ত্রণা। তার মাথায় কেউ যেন একরাশ বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে, বাথরুমে গিয়ে খুব করে মাথায় জল ঢেলে বোঝাটা হাল্কা করার জন্য উঠে দাঁড়ালো ভেরা। সঙ্গে একটা মোমবাতি নিতেও ভুলল না সে।
বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে তার নাকে ভেসে এলো একটা গন্ধ, সমুদ্রের লোনা জলের গন্ধ। তবে কি গোটা সমুদ্রটাই উঠে এলো বাথরুমে, ভেরা ভাবে
তার সেই ভাবনা ছাপিয়ে যেন ভেসে এলো তার কানের কাছে একটি শিশুর কণ্ঠস্বর–আন্টি, আমি সাঁতার কাটবো আমাকে সমুদ্রে নিয়ে চলো। নিয়ে চলো না আমাকে।
পরমুহূর্তেই অনুভব করলো সে, কার যেন নিঃশ্বাসের শব্দ ঠিক ঘাড়ের কাছে। চমকে পিছন ফিরে তাকালো সে, না, কেউ তো নেই। তাহলে তার মনেরই ভুল সমুদ্রের নোনা গন্ধে মনটা কেমন ওলট পালট হয়ে গেছে।
