নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ভেরা। তারপর বাকী সকলে মিলে ভেরার ঘরে তল্লাসী চালালেন, কিন্তু তার ঘরেও লম্বার্ডের পিস্তলের কোনো পাত্তা নেই। ব্যর্থ মন নিয়ে ভেরার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওঁরা সবাই আবার এসে ঢুকলেন বসবার ঘরে। কিছু পরে ভেরা আসতেই আলোচনা শুরু হলো।
শুরু করলেন ওয়ারগ্রেভ প্রথমে। আমাদের কারোর কাছেই কোনো মারাত্মক অস্ত্র কিংবা বিষ লুকোনো নেই। বাঁচা গেলো, এখন আমাদের কাছে যা ওষুধপত্র আছে সেগুলো একটা বাক্সে পুরে তালা লাগিয়ে বাক্সটা আলমারির ভেতরে তুলে রাখছি। তারপর বাক্স ও আলমারির চাবি দুটো ব্লোর ও লম্বার্ডের হাতে তুলে দেবো। এই কার্যকরী ব্যাপারে আপনাদের কারোর আপত্তি নেই তো?
মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। কাজে নেমে পড়লেন ওয়ারগ্রেভ চটপটু। চাবি লাগানো হলো বাক্সে, আলমারিতে। দুজনের হাতে চাবি তুলে দিয়ে তিনি বললেন, তবে এতেই যে সমস্যার সমাধান হলো তা নয়। পিস্তল এখনো বেপাত্তা। কোথায় সেটা, কে বলবে?
একমাত্র মিঃ লম্বার্ডই বোধ হয় বলতে পারবেন। লম্বার্ডের চোখের ওপর স্থির দৃষ্টি রেখে বললেন ব্লোর।
সেই থেকে চিনে জোঁকের মতো আমার পিছনে লেগে আছেন আপনি। রাগে ফুঁসে উঠলো লম্বার্ড, বারবার বলছি, ওটা নিশ্চয়ই কেউ সরিয়ে থাকবে, কথাটা কি কানে যায় নি?
বেশ তো এখন বলুন, শেষ কখন পিস্তলটা দেখেছিলেন আপনি? প্রশ্ন করলেন ওয়ারগ্রেভ।
গতকাল রাতে উত্তরে বলল লম্বার্ড শোকের আগে পকেট থেকে বার করে টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছিলাম।
তাহলে এই দাঁড়াচ্ছে আজ সকালেই খোয়া গিয়ে থাকবে ওটা।
চুরি গেলেও প্রাসাদের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে ওটা, মন্তব্য করলেন ব্লোর।
নাও থাকতে পারে। প্রাসাদরে বাইরে কোনো গোপন জায়গায় পিস্তল সহ অন্য সব জিনিসপত্র দেখুন গিয়ে লুকিয়ে রেখেছে নিশ্চয়ই।
পিস্তলের খবর দিতে পারবো না। যেন নিজের মনে বললেন ব্লোর তবে সিরিঞ্জের হদিস দিতে পারি। আমার সঙ্গে চলুন আপনারা কোথায় সেটা আছে দেখাচ্ছি।
সিরিঞ্জটা পড়েছিল খাবার ঘরের জানালা বরাবর ফাঁকা উদ্যানে, আর পাশে পড়ে আছে একটা চীনে মাটির পুতুল, কালো মাণিক। পুতুলের মাথাটা থেঁতলে খুঁড়িয়ে গেছে কোনো কিছু ভারী জিনিসের চাপে।
এ সব হলো অনুমান মশাই, স্রেফ অনুমানের ওপর নির্ভর করে সিরিঞ্জটা আবিষ্কার করা, সাফল্যের হাসি ফুটে উঠলো ব্লোরের ঠোঁটে, এই খাবার ঘরেই মিস ব্লেন্ট খুন, হয়েছে একটু আগে অতএব অনুমান করে নিলাম, তাড়াতাড়ি খুনের চিহ্ন লোপার্ট করার জন্য ঐ জানালাটাই বেছে নিতে পারে আততায়ী, কার্যত আমার অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলে যে গেলো, সে তো আপনারা নিজের চোখেই দেখতে পেলেন, কি বলেন?
হ্যাঁ, সিরিঞ্জ তো পাওয়া গেলো, তা আপনার কি ধারণা পিস্তলটা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে তাই না? উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজের থেকেই ভেরা আবার বললো, একটু খুঁজে দেখি যদি সেটা পাওয়া যায়।
দাঁড়ান। হাতের ইশারায় তাকে থামাতে বাধ্য করলেন ওয়ারগ্রেভ, আপনি একা একা যাওয়ার মতো এমন মারাত্মক একটা ভুল যেন কখনোই করবেন না। চলুন, আজ আর আপনি একা নন। আমরাও আপনার সাথে আছি, ছিলাম এবং ভবিষ্যতেও থাকবো, দেখি কি করতে পারি আপনাদের জন্য।
তল্লাসীর কাজ চললো প্রায় আধঘণ্টা ধরে। তবে সুবই পণ্ডশ্রমে পরিণত হলো। কোনো হদিশ পাওয়া গেলো না সেই রিভলবারের।
.
১৩.
প্রাসাদের বাকী পাঁচজন অতিথি এখন কেউ আর কাউকে যেন বিশ্বাস করে না। পরস্পরের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের দানা বাঁধতে শুরু করলো তারপর থেকে। সবাই সবার চোখে খুনী হিসেবে প্রতিপন্ন হতে চলেছে। কেউ কারোর প্রাণ খুলে কথা বলতে চায় না, সবাই সবার কাছে কি যেন হারানোর কথা সাহস করে কেউ বলতেও চায় না, যদি তাদের মধ্যে যেই খুনী হোক না কেন, আচমকা আক্রমণ করে বসে, সেই ভয়ে। সেই নিগার দ্বীপের পাঁচজন অতিথি কার্যতঃ এখন দীপান্তরিত যেন। মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কিত। এমন সময় আসে নি বোধ হয় কোনো দিন এর আগে তাদের জীবনে।
ওয়ারগ্রেভ এমনিতেই বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছিলেন, তার ওপর আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায় চব্বিশ ঘণ্টায় তার বয়স যেন আরো বেড়ে গেছে। সব সময় চোখ বন্ধ করে থাকেন তিনি। তাঁর ভয়, চোখ খুললেই যদি আবার কারোর মৃতদেহ দেখতে হয়। কান খাড়া করে রাখতে সাহস পান না যদি আবার কোনো দুঃসংবাদ শুনতে হয়।
সব থেকে করুণ অবস্থা হলো ব্লোরের, মৃত্যু ভয়ে সিটিয়ে আছে সে সব সময়ে। রাতে ঘুম নেই, কোটরাগত চোখ।
ভেরাও যেন কেমন গুম মেরে বসে থাকে সব সময়। কথা বলার সাহস সেও কেমন হারিয়ে ফেলেছে। মৃত্যুর প্রহর গুণতে চায় সে নীরবে নিভৃতে। গোপনে সংগোপনে চলে তার অন্বেষণ, খুনীকে খুঁজে বার করার।
আর আর্মস্ট্রংকে তো মনের দিক থেকে ভয়ঙ্কর ক্লান্ত অবসন্ন দেখাচ্ছিল। ঠায় বসে আছেন চেয়ারে, টেনে যাচ্ছেন একটার পর একটা সিগারেট! ওঁদের মধ্যে কেবল লম্বার্ডকে একটু ভিন্ন প্রকৃতির বলে মনে হলো। ভয় যে সেও কম পায় নি ঠিক তা নয়, তবে এ অবস্থায় তার বুদ্ধি বিভ্রম এখনো হয়নি। চোখ কান খুলে রেখেছে। কোথাও সামান্য শব্দ হলেই ছুটে যাচ্ছে। তারই মাঝে জনে জনে খোঁজ খবর নিচ্ছে, ভরসা দিচ্ছে ভয়ের কিছু নেই, আপনাদের পাশেই আছি আমি।
