ভো ভো ভো–ও…………?
চোখ বুজেই এমিলি ভাবেন, শব্দটা যেন মৌমাছির বলে মনে হচ্ছে। ভেরার কথা মনে পড়ে গেলো তার। চাক ভাঙ্গা মধু খেতে চেয়েছিল সে। ফোঁটা ফোঁটা মধু গড়িয়ে পড়বে মৌচাক থেকে আমার মুখে, একটু একটু করে সে মধু খেতে কতোই না তৃপ্তি, ভেবেই কত না সুখ-তখন ভেরার কথাগুলো পাগলের প্রলাপের মতো শোনালেও এখন মনে হচ্ছে, অনুভূতি ভেরার আমার সবার। কিন্তু ও কার পায়ের শব্দ? চোখ না খুলেই আধো ঘুমের ঘোরে অনুমান করতে চেষ্টা করেন এমিলি, পা টিপে টিপে কে যেন এগিয়ে আসছে। কে, কে ও, তবে কি ও বেট্রিস?
তুমি যাও বেট্রিস। আমি তোমার দিকে মুখ ফেরাতে চাই না। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। কেন জান? আত্মহত্যা করে তুমি অপমান করছো ঈশ্বরকে। তোমার মতো পাপীর মুখ আমি দেখতে চাই না।
আবার সেই মৌমাছির গুণ গুন ভো, ভো, ভেও
আরে এ যে দেখছি, না ওগুলো শুনে মনে হচ্ছে মৌমাছিটা আমার খুব কাছে এসে গেছে। আমার মাথার ওপর একটা চক্কর দিয়ে সেটা এখন আমার পিঠ ছুঁয়ে যাবার মতো, উড়ছে–ভো, ভো–ও-ও হুল ফোঁটাবে যা হওয়ার হোক। তবু চোখ খুলে দেখতে চাই না ওই পাপিষ্ঠার মুখ। কিন্তু হুলের কি জ্বালা। শেষ পর্যন্ত মৌমাছিটা আমার দিকে ঘাড়ের ওপর হুল ফোঁটালো। উঃ তীব্র যন্ত্রণায় আমার প্রাণটা বুঝি বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো
ওদিকে বসবার ঘরে সবাই তখন অপেক্ষা করছিলেন এমিলির জন্য তাকে আসতে না দেখে অধৈর্য হয়ে ভেরা উঠে দাঁড়ালো। কই মিস্ ব্লেন্ট তো এখনো এলেন না, আমি, ওঁকে ডেকে আনতে চললাম।
গিয়ে কোনো লাভ নেই, বাধা দিয়ে বললেন ব্লোর, এতোগুলো খুনের আততায়ীকে খোঁজার আর প্রয়োজন নেই বলে মনে করি আমি। আততায়ী আর কেউ নয়, মিস এমিলি ব্লেন্ট নিজেই।
খুনের মোটিভ? তার দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকালেন আর্মস্ট্রং।
এ ধরনের খুনীর একটাই তো মোটিভ। বাতিক মশাই স্রেফ বাতিক। ধর্মের নামে বাতিক
আপনার কথা আমি অস্বীকার করবো না, জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললেন আর্মস্ট্রং, কিন্তু কেবল মাত্র অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী চিহ্নিত করা যায় না, তার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রমাণ।
আজ সকালে তার ভাবভঙ্গি আমাদের কারোর কাছেই তেমন স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি। ব্লোর, আরো বলেন, তাছাড়া আমরা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়েছি, নিজেদের নির্দেশিত ব্যাপারে কিছু না কিছু একটা বক্তব্য রেখেছি, কিন্তু উনি কোনো জবাব দেননি। এর থেকেই কি প্রমাণ হয় না, উনি প্রকৃতই খুনী, তাই বলার মতো কিছু ওঁর নেই।
না, এখানে আমি আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না মিঃ ব্লোর, তার কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলে উঠলো ভেরা, পরে উনি আমাকে ওঁর অতীত জীবনের সব কথাই বলেছেন। উনি নির্দোষ। এর পর এমিলি বর্ণিত বেট্রিস টেলরের কাহিনী সংক্ষেপে বললো ভেরা।
এ তো বেশ সহজ সরল কাহিনী দেখছি। এতে অবিশ্বাস করার কিছু নেই। পরোক্ষভাবে এমিলিকে সমর্থন করে বললেন ওয়ারগ্রেভ, তার এই কাহিনী নিঃসন্দেহে বিশ্বাসযোগ্য বলে আমার মনে হয়। তা আপনারা কি বলেন? তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন এগারোটা বাজতে পাঁচ এখন? না, আর তো অপেক্ষা করা যায় না। বরং খাবার ঘরে গিয়েই আমাদের আলোচনা শুরু করা যাক। আর সেখানে মিস ব্লেন্টকেও পাওয়া যাবে, কি বলেন?
হ্যাঁ, তাই চলুন প্রায় সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন। সবাই তখন উঠে খাবার ঘরে চলে এলেন।
তেমনি চেয়ারে হেলান দিয়ে ঠিক একই ভাবে দেহ এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন এমিলি। তিনি এমনি গভীর চিন্তামগ্ন যে অতগুলো লোকের পদশব্দে তাঁর চিন্তায় কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করলো না, কিংবা ফিরে তাকাতে বাধ্য হলেন না।
তৈরি হয়েই এসেছিলেন ব্লোর, তীব্র ভাষায় আক্রমণ করবেন। এমিলিকে, তাই তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে এলেন এমিলির কাছে। নিচু হয়ে তাকে ডাকতে গিয়েই দু পা পিছিয়ে একটা বিকট চিৎকার করে উঠলেন তিনি, হায় ঈশ্বর। এ তুমি কি করলে? এতো তাড়াতাড়ি ওঁকে আমার কাছে টেনে নিলে?
আরো একটি পুতুল, উধাও হলো, রইলো মোট পাঁচ।
ডঃ আর্মস্ট্রং এগিয়ে গিয়ে মৃত এমিলির মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লেন, নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করলেন, নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা। তারপর উঠে দাঁড়ালেন গম্ভীর মুখে।
ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো লম্বার্ড, কি ভাবে ওঁর মৃত্যু হলো ডাক্তার?
বিষ ক্রিয়ায়। ওঁর ঘাড়ের কাছে সিরিঞ্জের উঁচ। ফোঁটানোর দাগ দেখতে পেলাম।
ওদিকে জানালার শার্সিতে মৌমাছিটা আছড়ে পড়ছিলো বারবার ভোঁ-ভো, ভো–ও
ঐ তো সেই মৌমাছিটা চিৎকার করে উঠলো ভেরা বলেছিলাম না তুলের বিষে বড় জ্বালা বড় কষ্ট, তারপর পাগলের মতো শব্দ করে হাসতে শুরু করলো ভেরা।
হাতের ইশারায় তাকে থামতে বললেন ডঃ আর্মস্ট্রং আপনি খুব ভুল করছেন মিস্ ক্লেথন। মৌমাছি নয়, অন্য কোনো হিংস্র শ্বাপদ ও নয়। মানুষ, মানুষের হাতেই খুন হয়েছে মিঃ ব্লেন্ট। আমাদেরই কেউ একজন তার শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছেন ইনজেকশনের সিরিঞ্জ দিয়ে।
কি ধরনের বিষ হতে পারে বলে মনে হয়, আপনার?এই প্রথম কথা বললেন ওয়ারগ্রেভ।
মনে হয় পটাশিয়াম সায়ানাইড। মার্স্টানের পানীয়তেও ঠিক এই বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল এই খুনী।
