ব্রেকফাস্টের খাবার তৈরী করতে গিয়ে ভেরা তখন আপন মনে নিজেকে দুষছিলো। ছিঃ ছিঃ কাজটা আমি মোটেও ভাল করিনি। ওঁরা আমাকে পাগল ঠাওড়ালেন। আমি কি সত্যি পাগল হয়ে গেছি? নিজের একটু বোকামির জন্য সবাই আমাকে পাগল ভাবলেন। না, এখন থেকে মাথা গরম করলে চলবে না, ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে, একেবারে ঠাণ্ডা জলের মতো
জলের প্রসঙ্গ উঠতেই মনে পড়ে গেলো সিরিলের কথা। তখন সবাই বলাবলি করেছিল, আমার মাথা নাকি খুব পরিষ্কার তা না হলে সিরিলকে জলে ডুবতে দেখেও মেয়েটি একটু ঘাবড়ায়নি। সবাই আমার প্রশংসা করেছে, আমার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিরিলকে বাঁচানোর প্রচেষ্টার মধ্যে।
কিন্তু হুগো, হুগো আমাকে ভুল বুঝলো, কোনো কথা না বলে এমন ভাবে তাকিয়েছিল ওর সেই জ্বলন্ত চাহনি আমি সহ্য করতে পারিনি। অথচ আমি ওর জন্যই, না, ফেলে আসা দিনগুলির কথা আর ভাববো না। অতীতের কথা আর ভাববো না। অতীতের স্মৃতি বড় বেদনাময়।
কি ভাবছে ভেরা? এমিলির কথায় ভেরা ফিরে এলো বর্তমানে, রুটিগুলো যে সব পুড়ে গেলো।
ছিঃ ছিঃ অমন অন্যমনস্ক হওয়া উচিত হয়নি। নিজের ত্রুটি স্বীকার করে নিয়ে কাজে মন দিলো ভেরা এবার। চটপট রুটির চাটুটা উনুন থেকে নামিয়ে রাখলো সে। তৈরি হয়েই ছিলেন এমিলি, এস্ত হাতে চায়ের কেতলীটা চাপিয়ে দিলেন উনুনের ওপর।
এমিলিকে সহজ ভঙ্গিমায় কাজ করতে দেখে কেমন হিংসে হলো ভেরার। আপনাকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে মিস্ ব্লেন্ট। এতো সব ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেলো একের পর এক, তবু আপনি কেমন মাথা ঠাণ্ডা রেখে সামনে কাজ করে যাচ্ছেন। কি করে মন মেজাজ ঠাণ্ডা রাখেন বলুন তো? আপনার মরতে ভয় করে না?
ভয় কেন করবে না? আলবাৎ করে। মরার ভয় কার না পায় বলুন? দৃঢ়স্বরে এমিলি বলে, কিন্তু আমি কেন মরতে যাব? আমি কোনো পাপ করিনি। আমি সহজে মরবো না। মরতে হয় আপনারা সবাই মরবেন। আমি শেষ দেখতে চাই। শেষটা না দেখা পর্যন্ত কোনো খুনীই আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না দেখবেন।
ওরা সবাই নিজেকে খুব চালাক বলে মনে করে, কিন্তু ওদের মতো বোকা বোধ হয় কেউ নেই। তা না হলে মরণকে ভয় করে হাত পা গুটিয়ে সবাই বসে থাকে। আরে ভয়কে জয় করতে হয় চোখে চোখ রেখে। মূল্যবান জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তো মানুষের নিজেরই। বোকা ম্যাকআর্থার সেই দায়িত্বটা পালন করলো না বলেই তাকে আজ অসময়ে প্রাণ হারাতে হলো। আর সেই নচ্ছার বেট্রিস টেবল ছিঃ ছিঃ ঐ জঘন্য বর্বরের কথা আমি আবার ভাবছি কেন? আপদ গেছে, ভালই হয়েছে? একটা অমানুষ? তা না হলে কেউ কি আত্মহত্যা করে?
নতুন রাধুনীদের তৈরী ব্রেকফাস্ট সবাই বেশ তৃপ্তি সহকারে খেলেও একটা দুশ্চিন্তায় তার ছজন যেন ক্রমশঃ কাবু হয়ে পড়েছিলেন এখন তাদের কেবল একটাই চিন্তা, এবার কার পালা? কে বধ হবে।
সমাধানের মার নেই। একটু চালাক চতুর হতে হবে। কিন্তু কথায় আছে, অতি চালাকের গলায় দড়ি। তাছাড়া এখানকার রকম সকম আলাদা, কখন কার ভাগ্যে কি যে ঘটবে আগে ভাগে কেউ টেরও পাবে না। যেমন পায়নি মার্স্টান, মিসেস রগার্স, ম্যাকআর্থার।
এখানে আসা অবধি যা যা অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, এর পরেও যে নিরাপদে থাকতে পিরবো, তার কি নিশ্চয়তা আছে। এই ধরাই যাক না কেন উলের গোলাদুটোর কথা ঘরে রেখে গেলাম। ফিরে এসে দেখি নেই। ভাবতে কেমন লাগে, আমার উলের গোলাদুটোর কি প্রয়োজন হলো খুনীর। উল দিয়ে গলায় ফাঁস। যততো সব আজগুলি চিন্তা। যাই হোক, এখন থেকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে, আগের, চেয়ে একটু বেশী।
এদের বোকা না বলে বলবো গাভি। গাভি না হলে, আমার বানানো গল্প তারা কেমন বিশ্বাস করে নেয়? এতো সহজে কাজগুলো যে হাসিল করতে পারবো, করার আগেও ভাবতে পারিনি।
খাবার ঘরের আলমারিতে ছটা পুতুল দেখে এসেছি, কে জানে কাল সকালে আর একটা যেতে দেখবো কি না।
.
১২.
ব্রেকফাস্টের পর সকলকে ডেকে জানিয়ে দিলেন ওয়ারগ্রেভ একটা জরুরী আলোচনা আছে আপনাদের সঙ্গে। আধ ঘণ্টার মধ্যে আপনারা সবাই চলে আসুন বসবার ঘরে, ওখানেই–
তার প্রস্তাবটা সবারই বেশ মনে ধরলো, তাই সবাই মাথা নেড়ে সায় দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।
ভেরাকে বাসন মাজার কাজে সাহায্য করতে গেলো লম্বার্ড।
এমিলিও উঠতে যাচ্ছিল তাদের সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু পারলো না বসে পড়লো চেয়ারে কপালে হাত দিয়ে এলিয়ে দিলেন মাথাটা চেয়ারে একটা যন্ত্রণা কাতর শব্দ বেরিয়ে এলো তার মুখ দিয়ে অস্ফুটে।
ছুটে এলেন ওয়ারগ্রেভ, কি হলো মিস ব্লেন্ট।
মাথাটা হঠাৎ কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠলো।
তা তো করবেই। উঠে দাঁড়ালেন আর্মস্ট্রং এক মিনিট, আমি আপনার জন্য একটা ওষুধ
খবরদ্দার। তাঁকে বাধা দিয়ে উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন এমিলি, আপনার ওষুধে আমার কোনো প্রয়োজন নেই, আপনি এখন যেতে পারেন।
এ যে বিনা মেঘে বজ্রপাত। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ডঃ আর্মস্ট্রং। ফ্যাকাসে মুখ, চোখের চাহনিতে পরাজয়ের গ্লানি, এমিলির দিকে না তাকিয়েই ক্ষোভের সঙ্গে বললেন তিনি, আমার সম্পর্কে আপনার যদি সে রকমই ধারণা হয়ে থাকে, তাহলে আমি চললাম। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর্মস্ট্রং ক্লান্ত পায়ে।
তারপর একে একে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। শুধু একা এমিলি বসে রইলেন চেয়ারে দেহটা এলিয়ে দিয়ে। বাথরুমের দিক থেকে ভেসে আসে মৃদু আলাপন এমিলির কানে ভালই হয়েছে, এখন ওঁর একটু বিশ্রাম দরকার……..।
