মিঃ লম্বার্ড দয়া করে বলুন, কোথায় গেলে আমি পাবো মৌচাক। আমি ঢিল ছুঁড়বো আমি মধু খাবো, আ-আমি
হা-হা-হা-যেন সে উন্মাদিনীর মতো হেসে চলেছে একটানা। অসহ্য। আর থাকতে পারলেন না আর্মস্ট্রং। এক পা এক পা করে তার সামনে এগিয়ে গিয়ে একটা অদ্ভুত কাজ করে বসলেন, ভেরার ফর্সা গালের ওপর সজোরে চড় মেরে বসলেন। এ যেন কল্পনার বাইরে,চমকে উঠলো ভেরা। গালে হাত বোলাতে বোলাতে এবার সে স্বাভাবিক গলায় বললো, আমার ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
মুহূর্তে একেবারে বদলে গেলো ভেরা। শান্ত সহজ মেয়ে ভেরা, চোখে নেই চাঞ্চল্য কিংবা বিস্ময়বোধ। পিছু হটে গিয়ে নিজের থেকেই আবার বললো ভেরা দুঃখিত। এখুনি আমি আর মিস্ ব্লেন্ট আপনাদের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করছি। তারপর রান্নাঘরের খালি উনুনের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে বললো সে, কয়েক টুকরো কাঠ পেলে উনুন ধরিয়ে আপনাদের চায়ের ব্যবস্থা করতে পারতাম।
এমিলিকে সঙ্গে নিয়ে ভেরা রান্নাঘরে চলে যেতেই আর্মস্ট্রং এর দিকে তাকালেন ব্লোর, কি ডাক্তার এটাও কি আপনাদের চিকিৎসা শাস্ত্রের একটা ওষুধ নাকি? বড়! ডোজ! এক চড়েই একেবারে চুপ।
তা চুপ না করালে মেয়েটি যে হিস্ট্রিয়া রোগগ্রস্ত হয়ে পড়তো। তখন আর এক ঝামেলা প্রসঙ্গটাকে চাপা দিয়ে আর্মস্ট্রং সকলকে মনে করিয়ে দিলেন, মেয়েটি জ্বালানি কাঠ চেয়ে গেছে। চলুন যাওয়া যাক। রগার্সের কেটে রাখা কয়েক টুকরো কাঠ বয়ে আনা যাক।
সবাই দুহাতে করে রান্নার কাঠ বয়ে নিয়ে এলেন রান্নাঘরে। চোখ তুলে তাদের একবার দেখে নিয়ে বললেন এমিলি আপনারা ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসুন সবাই। আধ ঘণ্টার মধ্যেই আপনাদের ব্রেকফাস্ট তৈরি হয়ে যাবে।
লম্বার্ডকে একা পেতেই ফিসফিসিয়ে তাকে বললেন ব্লোর রগার্সের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা যখন সবাই বিচলিত, কেবল একজন কেমন অবিচল থেকে দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন? উনি আবার আমাদের জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরী করছেন এখন। বা চমৎকার। আপনার কি মনে হয়?
ঠিক এখনি কিছু বলা মুশকিল।
দেখুন মিঃ লম্বার্ড ওঁর সম্পর্কে আপনি কি ভাবছেন আমি জানি না। তবে এই সব চিরকুমারী মধ্যবয়স্কদের ওপর আমার বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। বাইরে থেকে ধর্মের দোহাই দিয়ে সতোর যতো পরিচয়ই ওরা দিক না কেন, ভেতরে ভেতরে ওরা মহা শয়তান। হেন অসৎ কাজ নেই যে করতে পারে না।
কিন্তু আপনি বোধ হয় একটা ভুল করেছেন মিঃ ব্লোর সৎ অসৎ যাই হোক না কেন ধর্মের নামে বজ্জাতি আর উন্মত্ততা এক নয়।
লম্বার্ডের কথাটা যেন কানেই ঢেকে নি, এমনি ভাব দেখিয়ে বলতে থাকেন ব্লোর, আবার দেখুন আমরা যখন একা একা বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছি উনি তখন কেমন নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে বাইরে এক চক্কর দিয়ে এলেন। এর কারণটা বোঝা তো খুবই সহজ মশাই, প্রকৃত খুনীর আবার কিসের ভয়?
হ্যাঁ, ঠিক, ঠিক, মাথা নেড়ে সায় দিলো লম্বার্ড, আশ্চর্য, আপনার মতো এতো গভীর ভাবে আমি কেন চিন্তা করলাম না। তারপর এক গাল হেসে বললো লম্বার্ড, তবে এখন আমি একেবারে নিশ্চিন্ত, সেবারের মতো আবার যে আমাকে সন্দেহ করে বসেন নি, তাতেই আমি খুশি।
আরে মশাই, আমি কি শুধু শুধু সন্দেহ করেছিলাম? আপনার সেই রিভলবারটাই তো-কার না সন্দেহ হয় বলুন। তবে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে আর লাভ নেই। আপনার সম্পর্কে এখন আর আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আশা করি আমার সম্বন্ধেও আপনার ধারণা এখন পাল্টেছে নিশ্চয়ই।
না পাল্টাবার কোনো প্রয়োজনই মনে করি না। কেন জানেন? বললো লম্বার্ড, আমি আপনাকে কোনোদিনই সন্দেহ করিনি। অপরাধ নেবেন না, হয়তো ছোট মুখ বড় কথা হয়ে যাচ্ছে, আপনার মগজে বুদ্ধি সুদ্ধি আছে বলে তো আমি মনে করি না। আর খুন করতে হলে যথেষ্ট বুদ্ধি থাকার প্রয়োজন। আপনার মতো একজন নিরেট বোকা লোক কি করে ল্যান্ডরকে কাবু করলেন, আপনি জানেন আর ঈশ্বর জানেন?
প্রসঙ্গটা তুলে ভালই করেছেন। খুলেই বলি তাহলে ল্যান্ডরের সত্যিই কোনো দোষ ছিলো না। কিন্তু ডাকাত দলের সংশ্রবে পড়ে শেষ পর্যন্ত তাকে ফাসাতে বাধ্য হয়েছি। তবে জেনে রাখুন তার মৃত্যুর ব্যাপারে বিশ্বাস করুন আমার কোনো হাত ছিলো না। তার ভাগ্য খারাপ, তাই
ভাগ্য তো আপনারও খারাপ মিঃ ব্লোর তা না হলে দীর্ঘ দিন পরে অতীতের সেই সত্য না মিথ্যে ঘটনার জেরই বা টানতে হবে কেন, আর তার জন্য আজ আপনার প্রাণনাশের আশঙ্কাই বা দেখা দেবে কেন বলুন।
আমার প্রাণনাশের আশঙ্কা? আরে ছাড়ুন। আমি এখন খুবই সতর্ক, আমাকে মারার মতো খুনীর জনম এখনো হয়নি।
না জন্মালেই ভাল, আর যদি জন্মে থাকে, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আমার ভবিষ্যৎ বাণীটা মনে রাখবেন। বোকারা প্রাণ হারায় সবার আগে। তাই আবার আমি সতর্ক করে দিচ্ছি আপনাকে, আপনার বুদ্ধি বলতে কিছুই নেই, তাই আপনার মৃত্যু আসন্ন, আপনার বেঁচে থাকার দিন প্রায় সীমিত।
আর আপনি নিজেকে যত চালাকই ভাবুন না কেন, আপনিও বাঁচতে পারবেন না।
আমি যে অমর সে কথা আমি বলছি না, মৃদু হেসে লম্বার্ড বললো তবে তাই বলে আপনার মতো এখানে পড়ে থেকে বেঘোরে প্রাণ দেবো না। খুনী আমাকে স্পর্শ করার আগেই আমি এখান থেকে চম্পট দেবো।
