নিচে নেমে এলেন সকলে অতঃপর। আর ঠিক তখনি প্রাসাদের খোলা ফটকে পথ দিয়ে এমিলিকে ঢুকতে দেখলেন তাঁরা, আপাদমস্তক তার ঢাকা গরম পোষাকে।
হলঘরের সামনে এসে ওঁদের দেখে মৃদু উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন এমিলি এই মাত্র সমুদ্র দেখে আসছি। উঃ কি ভয়ঙ্কর রুদ্র মূর্তি সমুদ্রের। এই দুর্যোগে লঞ না আসার সম্ভাবনাই বেশী।
অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন ব্লোর। তার কথা শেষ হতে না হতেই রাগত স্বরে বললেন তিনি, একা প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে কাজটা আপনি ভাল করেননি মিস্ ব্লেন্ট, বিশেষ করে আমাদের সকলের নামই যখন খুনের তালিকায় ঝুলছে।
ওটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার মিঃ ব্লোর। একটু রুষ্ট হয়েই জবাব দিলেন এমিলি, আপনার মাথা না থামালেও চলবে। আর এও জেনে রাখবেন চারদিক দেখে শুনেই আমি পা ফেলে থাকি।
বেশ তা না হয় মানলাম, এখন বলুন পথে রগার্সকে দেখতে পেলেন?
রগার্সকে। অবাক বিস্ময়ে ব্লোরের দিকে তাকালেন এমিলি, কেন বলুন তো?
কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন ব্লোর বলা হলো না ওয়ারগ্রেভের উৎসাহসব্যঞ্জক কথা শুনে। খাবার ঘরের দরজা ঠেলে একবার উঁকি মেরে মৃদু হেসে তিনি বলে উঠলেন, ঐ তো ব্রেকফাস্ট কেমন সাজানো রয়েছে।
দরজা ঠেলে প্রথমে খাবার ঘরে প্রবেশ করলেন ওয়ারগ্রেভ, তাকে অনুসরণ করলেন বাকী সকলে। সকলেই দেখলেন, টেবিলের ওপর ছটি প্লেটে সাজানো খাবার। দেখে মনে হলো টেবিলে খাবারের প্লেটগুলো রেখে খাবার জল আনতে গেছে রগার্স।
হঠাৎ ভয়ে আতঙ্কে কান্নার মতো চিৎকার করে উঠলো ভেরা। তারপর ওয়ারগ্রেভের কাঁধে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।
স্তব্ধ, হতবাক সকলে, তার হঠাৎ সেই কান্নার মানে খুঁজে পেলেন না কেউ। ভেরার মুখের দিকে প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন সকলে, তার কান্নার হেতুটা কি জানার জন্য।
সেটা উপলদ্ধি করে ভেরা নিজের থেকেই আবার চিৎকার করে আঙ্গুল দেখিয়ে কান্না স্বরে বললো, ঐ আলমারিটার দিকে তাকালেন? দেখতে গিয়ে ভেরার মতো তারাও শিউরে উঠলেন প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন সকলে একি। সাতটার জায়গায় এখন মোট ছটা পুতুল রয়েছে
বেশী খুঁজতে হলো না। প্রাসাদের পিছনে জ্বালানী কাঠ রাখার গুদামের সামনে রগার্সকে পড়ে থাকতে দেখল সকলে। রক্তাক্ত দেহ, গলাটা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন, বাঁ হাতের মুঠোয় ধরে রাখা এক টুকরো কাঠ। রক্তরঙে রঞ্জিত কুড়ুলটা পড়েছিল তার মস্তকহীন ধড়ের পাশেই। সামনে জড়ো করা কাটা কাঠ। উনুন ধরাবার কাঠ কাটতে গিয়ে বুঝি কখন ভুল করে নিজের গলাতেই কুড়ুলে কোপ দিয়ে ফেলেছে সে। আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হয়। কিন্তু
আমাদের চতুর খুনীর আর একবার তার খুনের নেশা চরিতার্থ করতে একটুও অসুবিধে হয় নি, রগার্সের দ্বিখণ্ডিত মৃতদেহের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বললেন আর্মস্ট্রং দৃশ্যটা ছিলো ঠিক এই রকম, নিচু হয়ে কাঠ কাটছিল রগার্স উনুন ধরাবার জন্য আপন মনে, খুনী যে কখন পা টিপে টিপে নিঃশব্দে তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। খেয়াল করতে পারেনি সে। তারপর খুনী অতর্কিতে হাত ধরে তার হাত থেকে কুড়ুলটা ছিনিয়ে নিয়ে তারই কুড়ুলের এক কোপে তার ধড় থেকে গলাটা নামিয়ে দিয়েছে।
দূর থেকে চকিতে একবার এমিলির মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে আর্মস্ট্রং এর উদ্দেশ্যে বললেন ডঃ ওয়ারগ্রেভ, ডঃ আর্মস্ট্রং আপনার কি মনে হয়, একাজ কোনো মহিলার পক্ষে করা সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব বৈকি। উপস্থিত সকলকে চকিতে একবার দেখে নিলের আর্মস্ট্রং। ভাগ্যিস এমিলি ও ভেরা বসেছিলেন দূরে রান্নাঘরে মেঝের ওপর। আর্মস্ট্রং নিজের কথায় জের টেনে আবার বললেন, চোখে লাগার মতো এমিলির দেহের গঠন, ভাল স্বাস্থ্য দেখেই আমি বলছি, এ কাজ তার অসাধ্য নয়। যদিও তাঁর বয়স হয়েছে কিন্তু তিনি যে ভাবে দ্রুত পা ফেলে ফেলে প্রাসাদে এসে ঢুকলেন, তাতে আমার এ কথাই মনে হয়। তাছাড়া মনটা শক্ত থাকলে শারীরিক ক্ষমতার অভাব হয় না।
নিচু হয়ে কুড়ুলটা পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়ালেন ব্লোর, আগেই জেনেছি অত্যন্ত চতুর এই খুনী হাতের কোনো ছাপ রাখে নি, কাজ শেষে রুমাল দিয়ে মুছে দিয়েছে।
হঠাৎ মৌমাছির আগমন হতে দেখে সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন, এখানে মৌমাছি এলো কোথা থেকে। এ নিয়ে পুরুষরা যখন আলোচনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনি আচমকা রান্নাঘর থেকে গলা ফাটানো হাসির শব্দ শুনে চমকে ফিরে তাকালেন তারা রান্নাঘরের দিকে। সেই পাগল করা হাসি হাসতে হাসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো ভেরা। হাসির উচ্ছ্বাসে তার সারা শরীর ফুলে ফুলে ফেঁপে উঠছিল।
পুরুষদের দেখে হুঁশ হলো ভেরার। হাসি থামিয়ে মায়াবিনীর মতো স্বপ্নালু চোখে লম্বার্ডের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো সে লক্ষ্মীটি মিঃ লম্বার্ড, এই মৌমাছিগুলো কোথা থেকে আসছে, দেখুন আপনি। নিশ্চয়ই এই দ্বীপে কোথাও মৌচাক আছে। আমি সেই মৌচাকে ঢিল মেরে মদু আহরণ করে আনবো। আঃ চাক ভাঙা মধু খেতে কতোই না মিষ্টি হা-হা-হা-।
তার সেই পাগলামি দেখে সকলেই স্তম্ভিত, কারোর মুখে কথা ফোটে না পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকায়–মেয়েটি কি তাহলে
চুপ করে রইলেন কেন? আমার কথার জবাব দিন? লম্বার্ডের কাছে কৈফিয়ত চাইল ভেরা, আপনারা ভেবেছেন, আমি বুঝি পাগল হয়ে গেছি। না, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক। আ-আমি মৌচাকে ঢিল ছুঁড়বো, আমি মধু খাবো, চাক ভাঙা মধু। কেন মনে নেই সেই কবিতাটার কথা
