সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে বাকী তিনজন পুরুষকে সতর্ক করে দিতে ভুললেন না ওয়ারগ্রেভ, ঘরের ভেতর থেকে দরজায় তালা দিতে ভুলে যাবেন না যেন।
সেই সঙ্গে ব্লোর আবার যোগ করলেন, বন্ধুগণ, আপনাদের আরো একটা কথা বলে রাখি, আমাদের খুনী অত্যন্ত চতুর, বাইরে থেকে তালা খোলার উপায় নিশ্চয়ই তার জানা থাকতে পারে। তাই বাড়ির সাবধানতার জন্য দরজার সামনে একটা চেয়ার ও রেখে দেবেন। তালা খুলে অন্ধকারে ঘরে ঢুকতে গিয়ে চেয়ারে হোঁচট খেলেই শব্দ হবে, আপনাদের ঘুম ভেঙ্গে যাবে। তাহলেই খুনীর ইচ্ছাপূরণ আর হবে না কেমন।
একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠতে দেখা গেলো লম্বার্ডের ঠোঁটে। হ্যাঁ সবজান্তা উপদেষ্টার কথা আপনারা যেন কেউ ভুলবেন না কিংবা অবহেলা করবেন না।
খোঁচাটা হজম করতে হলো ব্লোরকে গম্ভীর হয়ে। অত বড় বড় চোখ করে লম্বার্ডের দিকে তাকালেন ওয়ারগ্রেভ। তারপর তিনি আর দাঁড়ালেন না সেখানে, সোজা গিয়ে ঢুকলেন নিজের ঘরে।
চারজন পুরুষের মধ্যে শেষ মানুষটি তার ঘরে প্রবেশ করা মাত্র খাবার ঘরের দরজার আড়াল থেকে অতি সন্তর্পণে বেরিয়ে এলো রগার্স। চারদিক দেখে নিয়ে সে আবার গিয়ে ঢুকলো নিজের ঘরে। নিজের মনে মাথা দুলিয়ে বললো সে কাল ভোর সকালে উঠতে হবে। তবে আজ রাতেই কালের প্রাতঃরাশের খাবার সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। ভোর সকালে উঠেই উনুন ধরাতে হবে। অতিথিরা ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই, খাবার তো প্রায় তৈরীই আছে শুধু চা তৈরি করতে হবে।
তারপর সে তার সেই ছোট্ট আলমারিটির দিকে তাকালো। তখনো সাতটা পুতুলই অবশিষ্ট রয়েছে। না, এবার আর একটি পুতুলও নিরুদ্দেশ হতে দেবো না। আজ আমি নিজে প্রয়োজন হলে সারা রাত জেগে থেকে পুতুলগুলোকে পাহারা দেবো। দেখি কে আমার চোখকে ফাঁকি দেয়। কার এতো দুঃসাহস আছে। আমাকে ডিঙ্গিয়ে উন্মাদটা তার খুশি মতো যখন তখন কাউকে না কাউকে খুন করবে, আর একটি করে পুতুল উধাও করে ফেলবে। আজ আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে সে
ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো সে অতঃপর।
.
১১.
ভোর হওয়ার ঠিক আগে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া লম্বার্ডের চিরদিনের অভ্যাস। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। ঘুম ভাঙ্গতেই অনুভব করলো সে, গতকাল রাতের তুলনায় আজ বাতাসের সেই দাপট আর নেই। কান পেতে শুনতে গিয়ে বুঝলো সে, বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দও আর শোনা যাচ্ছে না। তাহলে বৃষ্টি কি থেমেচে? কথাটা ভাবতে ভাবতেই ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লো লম্বার্ড।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতি আবার বাড়লো, কিন্তু লম্বার্ডের ঘুম আর যেন ভাঙ্গে না, ঘুম ভাঙলো সেই সাড়ে নটায়। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো সে। ঘড়ির টিক টিক টিক … না, আর দেরী করা ঠিক হবে না। কিছু একটা করা দরকার। আর এখনি, এখন নটা পঁয়তিরিশ।……..
ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমেই সে গেলো ব্লোরের ঘরের সামনে, ন করলো। একটু পরেই দরজা খুলে গেল, দরজার ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্লোর ঘুম জড়ানো চোখে।
আচ্ছা লোক তো মশাই আপনি। কতো বেলা হয়েছে, সে খেয়াল আছে?
দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন ব্লোর। চোখ থেকে ঘুম তখন তার নিরুদ্দেশ, তার বদলে একরাশ বিস্ময়। কি আশ্চর্য। বেলা এতো গড়িয়ে গেছে? এত বেলা পর্যন্ত ঘুম আমার, কখনো হয়নি। কিন্তু রগার্সই বা কি রকম লোক বলুন তো মশাই? সে ও তো ডেকে দিতে পারতো।
রগার্স আপনার ঘুম ভাঙাবে? তাহলেই হয়েছে। মুখ বিকৃত করে বললো লম্বার্ড, তার সম্বন্ধে আপনি আমি কতটুকুই বা জানি বলুন।
সে কি রকম? কৌতূহল ভরা চোখে তাকালেন ব্লোর।
কি বলে যে বোঝাব আপনাকে, জানেন রগার্স উধাও? তার পাত্তা নেই এ প্রাসাদের কোথাও। এমন কি, উনুন পর্যন্ত ধরিয়ে যায় নি সে।
সেকি? স্ফাউন্ড্রেলটা কি তাহলে আমাদের ফেলে সত্যি সত্যি কেটে পড়লো। গায়ে জামা গলাতে গলাতে বললেন ব্লোর, চলুন অন্য আরো অতিথিদের ঘরে। দেখা যাক ওঁরা যদি তার কোনো হদিস দিতে পারেন।
না কেউই তার খবর জানে না। আর্মস্ট্রং ওয়ারগ্রেভ কিংবা ভেরা, সকলের বক্তব্য একটাই–রগার্সকে তারা শেষ দেখেছেন গতকাল রাতে শুতে যাওয়ার আগে। এখন সকলের লক্ষ্য এমিলির ঘরের দিকে, যদি তার কোনো খবর দিতে পারেন তিনি। না তাঁর ঘরের সামনে গিয়ে আরো বেশী হতাশা হলেন সকলে। দরজা হাট করে খোলা, ঘরে নেই এমিলি।
এরপর একসঙ্গে সকলে গিয়ে ঢুকলেন রগার্সের ঘরে। এলোমেলো বিছানা রাতিযাপনের স্পষ্ট চিহ্ন চোখে পড়ে। দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম ড্রেসিং টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে ভিজে অবস্থায়।
এর অর্থ হলো, নিজের মনে লম্বার্ড বললো যথারীতি আজ ঘুম থেকে উঠে রোজকার অভ্যাস মতো দাড়ি কামিয়েছে সে।
তাহলে কি সে কোথাও লুকিয়ে ওঁৎ পেতে বসে আছে আমাদের মধ্যে থেকে কাউকে তার চতুর্থ শিকার হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য। ভয়ে ভয়ে নিচু গলায় বললো ভেরা।
অসম্ভব কিছু নয়। লম্বার্ডকে দেখে মনে হলো, খুবই চিন্তিত সে। তাই যদি হয় তাহলে চলুন আমরা এক সঙ্গে এগিয়ে চলি। আমরা এক সঙ্গে থাকলে খুনীর বাবারও ক্ষমতা নেই, আমাদের গায়ে হাত তোলে।
আর মিস ব্লেন্টও বা কি রকম মহিলা বলুন তো। বিরক্ত হলেন ব্লোর বলা নেই, কওয়া নেই, সুট করে কোথায় চলে গেলেন। এ এক নতুন ফ্যাসাদ, ওঁকে এখন খুঁজি কোথায় বলুন তো?
