আজ জেনারেল ম্যাকআর্থারের আকস্মাৎ মৃত্যুটা আমার কাছে একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা বলে মনে হয়েছে। (এখানে বলে রাখা ভাল ম্যাকআর্থারের ভাইপোর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আমাদের ম্যাকআর্থারের) খুব সম্ভব তিনি সত্যিই সত্যিই খুন হয়েছে। ওয়াগ্রেভের সুনিশ্চিত বক্তৃতার বোঝা গেলো, তার সন্দেহ খুনী আমাদেরই মধ্যে কেউ একজন হবে। আমি তার সঙ্গে একমত। আর সেই নিষ্ঠুর খুনীকে আমি চিনি। তার নাম
এখানে থামলেন এমিলি, বর্তমান থেকে চলে গেলেন সেই সুদূর অতীতে। তাঁর স্থির দৃষ্টির সামনে অতীতের সব ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটে যেতে দেখলেন তিনি। হাতের পেন্সিলটা নিয়ে তিনি তার নোটবইতে কখন যে অক্ষরগুলো সাজাতে শুরু করেছিলেন, তা তার নিজেরই খেয়াল ছিলো না। হঠাৎ যখন হুঁশ হলো, নোটবইটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। আশ্চর্য। এ আমি কি লিখলাম? তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি নাম সে নাম বেট্রিস টেলর।
ভীষণ ভয় পেলেন তিনি। সেই ভয়ের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য দ্রুত পেন্সিল চালিয়ে কেটে দিলেন নামটা। তারপর নিজের মনে বিশ্লেষণ করতে বসলেন, মনের অগোচরে কেন লিখলাম সেই নামটা? আমি, আমি কি তাহলে পাগল হয়ে গেছি।
বাইরে তখন ঝড়ের তাণ্ডব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে বৃষ্টি।
হলঘরে এসে বসেছেন সকলে। কারোর মুখে কথা নেই। ঝড়ো বাতাসের শন্ শন্ শব্দ ছাড়া অন্য কিছু কর্ণগোচর হচ্ছিল না কারোর। সেই সময় চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলো রগার্স। টেবিলের ওপর ট্রেটা নামিয়ে রাখলো সে।
এমিলির দিকে তাকিয়ে বললো ভেরা, মিস্ ব্লেন্ট, আজ আপনিই আমাদের চা পরিবেশন করুন।
না, আমি পারবো না। কেলীটা যা ভারী, যদি হাত ফসকে পড়ে যায়। তার ওপর মনটা আমার একেই অশান্ত, উলের দুটো গোলা কোথায় যে ফেললাম, খুঁজেই পাচ্ছি না।
শেষ পর্যন্ত ভেরার হাতেই পড়লো সেই ভারী কেলীর ওপর। বাইরে রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টুং-টাং শব্দটা একটা অদ্ভুত ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছিল যেন। ঘরে এখন একটু আগের সেই থমথমে ভাবটা এখন আর নেই। চায়ের পেয়ালায় কথার ঝড় উঠতে দেখা গেলো একটু পরেই। মেতে উঠলেন সকলে নতুন করে আনন্দে গা ভাসিয়ে দিয়ে। বৃষ্টি স্নাত বিকেলে ধূমায়িত চায়ের মধ্যে একটা অদ্ভুত সামঞ্জস্যতা অনুভব করলেন সকলে। বুঝি এমনি এক মুখর আনন্দের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন তারা।
সকলেই চায়ের স্বাদ গ্রহণ করার জন্য চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলেও ওয়ারগ্রেভ কিন্তু চোখ বুজে বসেছিলেন চেয়ারে। ও রসে বুঝিবা তিনি অনাগ্রহী, আসক্তি নেই তার চায়ে। চা তিনি পান করেন না।
হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো রগার্স, মুখে তার আতঙ্কের ছাপ, হত বিহ্বল দৃষ্টি, এদিক ওদিক, কি যেন খুঁজছে সে, তার আগমনে ঘরের সহজ সাবলীব ভাবটা যেন মুছে গেলো নিমেষে।
কি খুঁজলো রগার্স? চায়ের খালি কাপটা নামাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো ওয়ারগ্রেভ, কিছু কি তোমার হারিয়েছে?
যৎসামান্য, মানে বাথরুমের পর্দাটা খুঁজে পাচ্ছি না।
সে কি। এবার প্রশ্ন চোখে তাকালেন ওয়ারগ্রেভ, আজ সকালেই তো ঝুলতে দেখেছি বাথরুমে।
হ্যাঁ স্যার, আমিও তো দেখেছি।
কি রকম পর্দা বলতো? ব্লোর জানতে চাইলো।
ঘন লাল রঙের সিল্কের পর্দা উধাও।
আরে এমন একটা তুচ্ছ জিনিষ নিয়ে তুমি মাথা ঘামাচ্ছো রগার্স? এ তোমার পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। অবশ্য এখানকার সব কিছুতেই তো পাগলামি। তবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো তুমি। ঐ পর্দা দিয়ে কাউকে খুন করা সম্ভব নয়। হারানো পর্দার জন্য চিন্তা করো না।
চিন্তা করবো না বলছেন? কথাটি ঠিক মনে ধরলো না রগার্সের তবু ঘাড় নাড়লো, ঠিক চিন্তা করবো না। তেমনি ঘাড় নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে সে। তারপর ঘরে নেমে এলো অখণ্ড নীরবতা, এ ওর দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো বিস্ময় ভরা চোখে।
নৈশভোজের পর সকলে আবার ফিরে এলেন বড় হলঘরে। তখনো কথা নেই কারোর মুখে। কেমন যেন একটা অস্বস্তিবোধ কাবু করে ফেলেছিল সকলকে। সেই ভাবেই কাটলো রাত নটা পর্যন্ত।
প্রথমে এমিলিই উঠে দাঁড়ালেন, শোবার সময় হলো যাই এবার।
তার দেখাদেখি উঠে দাঁড়ালো ভেরাও, সকাল সকাল উঠতে হবে কাল। আমিও চললাম।
তাদের অনুসরণ করলেন ব্লোর এবং লম্বার্ড। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে তাদের কানে এলো দরজার খিল্ দেবার শব্দ। হেসে বললেন ব্লোর, আচ্ছা দেখছেন মিঃ লম্বার্ড। আমাদের আর সতর্ক করে দিতে হলো না। ভয় এমনি জিনিস ওঁরা নিজেরাই কেমন নিজেদের নিরাপত্তার ভার নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন, দরজার খিল দিতে ভুল করেন নি।
তাঁর কথা যেন শুনতে পায়নি, এমনি একটা ভাব দেখিয়ে নিজের মনেই বলে গেলো, যাক, বাঁচা গেলো আজ আমরা মোটামুটি সজাগ বলেই এখন অনেকটা নিরাপদ ভাবতে পারি। তারপর একটু থেমে সে আবার বললো, যে কাজে আসা তা তো তারা নিজেরাই সেরে নিলেন। চলুন এবার তাহলে নিচে যাওয়া যাক।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলেন ওঁরা আবার।
আরো ঘন্টাখানেক গল্পগুজব করে পুরুষ চারজন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকলেন যে যার ঘরে গিয়ে শোবার তোড়জোড় করার জন্য। খাবার ঘরের দরজার আড়াল থেকে তাদের গমনপথের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রগার্স। ওঁরা কেউই তার সেই গোপন পর্যবেক্ষণ লক্ষ্য করতে পারলো না।
