এরপর এখানে অতএবের কোন স্থান নেই। নিজের যুক্তির সমর্থনে ভেরা বলে হয়তো তখন তিনি সুবিধা মতো সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে যথা সময়ে তিনি তাঁর কাজটা হাসিল করে আবার ফিরে এসেছেন এখানে।
তা সেই সময়টাই বা কখন, এখন একটু খুলে বলবেন?
সেই যে মনে পড়ছে এবার আজ দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজের ঠিক একটু আগে একটু থেমে ভেরা আবার বলে অগ্রণী হয়ে আমাদের সকলকে টপকে তিনি যখন ডঃ ম্যাকআর্থারের কাছে ছুটে গেলেন, তখনি তার কাজ হাসিল হয়ে যায়।
লম্বার্ডের চোখে গভীর বিস্ময়। সত্যি, এ কথাতো আগে কখনো আমার মনে হয়নি। যাই হোক, কাজটা সারতে গিয়ে তাতে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল নিশ্চয়ই। তা আপনার বক্তব্য কি, এবার বলবেন?
কেন ঝুঁকি নিতে যাবেই বা কেন? জানেন তো, ডাক্তার হওয়ার অনেক বাড়তি সুযোগ সুবিধে আছে। যেমন ধরুন মৃত রোগীর নাড়ী টিপে বলে দিলেই হলো, ঘণ্টা খানেক আগে মারা গেছে। ব্যস, তাতেই কাজ হয়ে যাবে। বেদ বাক্য বলে চিকিৎসকদের মন্তব্যটা আমাদের মেনে নিতে হবে। ডাক্তারী জ্ঞান আমাদের নেই, তাই তাদের অঙ্গুলী হেলনে সায় দিতে হবে আমাদের।
অপূর্ব। অপূর্ব আপনার বিশ্লেষণ ক্ষমতা। উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠলো লম্বার্ড, বোঝা যাচ্ছে আপনার মাথায় যথেষ্ট পরিমাণ ঘিলু আছে মিস ক্লেথন। আমি ভেবে অবাক হচ্ছি, এতে সব ভাবনা আপনার মাথায় এলো কি করে?
ব্লোরের সান্নিধ্যে এসে অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছিল রগার্স কথাটা বলার জন্য। শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলল সে, আমাদের মধ্যে খুনী কে হতে পারে মিঃ ব্লোর?
তেমন করে তো ভাবিনি এখনো।
মিঃ ওয়ারগ্রেভের কথা মতো আমাদের মধ্যে থেকে খুনীকে যদি টেনে বার করতে পারতাম, তাহলে
একটু ধৈর্য ধরে থাকো। যথা সময়ে তার স্বরূপ ঠিক প্রকাশ হতে দেখবে। ব্লোর তাকে বোঝায় তুমি কি মনে করো তাকে জানার ইচ্ছে তোমার থেকে আমাদের কিছুমাত্র কম। আমরা সকলেই তার ওপর নজর রাখার চেষ্টা করছি।
আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, কিছু একটা গোপন করতে চাইছেন আপনি। সত্যি করে বলুন তো? আপনি কি খুনীকে চিনতে পেরেছেন?
ঠিক এখনই জোর দিয়ে বলতে পারি না চিনেছি, তবে খানিকটা আন্দাজ করতে পারি। কিন্তু তার নাম এখন জানতে চেও না। কেবল এটুকু বলতে পারি, ভারী ঠাণ্ডা মাথার লোক এই খুনী, খুব ভেবে চিন্তে কাজ করে থাকে সে।
তার মানে কখন যে ঠাণ্ডা মাথায় আমাদেরই কাউকে সে আবার খুন করে যাবে, কেউ আমরা টেরও পাবো না। উঃ এমনি এক দুঃস্বপ্নের ঘোরে বিভোর হয়ে থাকতে হবে আমাদের দিবা রাত্রি।
তা তুমিও তো দেখছি বেশ ভাবনা চিন্তা করছে। খুনী হিসেবে কাকে তোমার সন্দেহ হয় রগার্স?
আমি আর কি বলব স্যার মুখ্য সুখ্য মানুষ, আমাদের সব চিন্তা ভাবনাই এলোমলো, আপনাদের সঙ্গে মিলবে কেন বলুন? না সত্যি আমি কিসসু জানি না। আর জানি না বলেই তো এতো ভয়, এতে আতঙ্ক
রাগে উত্তেজনায় লাল চোখ করে পায়চারী করছিলেন ঘরের মধ্যে ডঃ আর্মস্ট্রং তেমনি উত্তেজিত স্বরে বিকট শব্দ করে বলে উঠলেন তিনি, আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও থাকতে চাই না এখানে। যেভাবেই হোক এই দ্বীপ থেকে নিস্কৃতি পেতে হবে।
তার চোখে চোখ রেখে ঘাড় নাড়লেন ওয়ারগ্রেভ। তারপর মৃদু হেসে বললেন তিনি, নিস্কৃতি চাইলেই কি পাওয়া যায়? সমুদ্রের চেহারা দেখেছেন! যে ভাবে ফুঁসছে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার পরেও এই অশান্ত সমুদ্র শান্ত হবার নয়। অতএব আজ অহেতুক উত্তেজিত না হয়ে আগামীকালের কথা ভাবুন, যদি কাল অন্তত নিস্কৃতি পান এই দ্বীপ থেকে।
কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার আগেই যদি সেই উন্মাদটা খুন করে ফেলে আমাদের? যদি আমরা তার হাতে প্রাণ হারাই?
কখনই না। খুন করা অত সহজ নয়। তাছাড়া আমার এখন অনেক সজাগ। খুনীর চরিত্র আমরা জেনে গেছি। এখন আমাদের মারে কে।
আগের তিনজনও কিন্তু মৃত্যুর আগে আপনার মতোই বুক ফুলিয়ে থাকবে
ওঁরা মৃত্যুর আগে একটুও প্রস্তুত ছিলেন না। তাই ওঁদের খুন হওয়াটা একটু আলাদা ধরনের ছিলো। কিন্তু আমাদের অবস্থা ওঁদের থেকে আলাদা। আমরা এখন চারদিকে চোখ কান খুলে রেখেছি, আমরা সজাগ, আমরা খুনীর গতিবিধি চিনে ফেলেছি। এখন আমাদের সঙ্গে কোনো রকম ছলচাতুরী করতে পারবে না।
আমরা খুনীর ছলচাতুরী জেনে ফেলেছি বলেই হয়তো সতর্ক হতে পারছি, একটু আগে আপনি বললেন, খুনীর চরিত্র আমরা জেনে গেছি। কিন্তু খুনী কে তা জানি না এখনো অবধি।
জানেন, হ্যাঁ আপনিও জানেন বৈকি ডঃ আর্মস্ট্রং।
তাহলে আপনিই জানেন দেখছি, জানেন নাকি?
এখনো পর্যন্ত পাওয়া সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যদি জানতে চান, তাহলে বলবো, আমি কিছুই জানি না। একটু আগে আপনি জানতে চাইলেন, আমি কাউকে সন্দেহ করি কিনা। হা, করি বৈকি। বিশেষ একজনকে, তার নাম আমি বলবো না, আমরা সকলেই চিনি তাকে।
বিস্ময়াবিষ্ট আর্মস্ট্রং ঠিক আন্দাজ করতে না পেরে তাকিয়ে রইলেন ওয়ারগ্রেভের দিকে।
দোতলায় এমিলি তার ঘরে বসে সময় কাটাতে বাইবেলের পাতা ওল্টালেন, অক্ষরগুলো কেমন ঝাপসা হয়ে উঠলো। অগত্যা বইটা রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে টেনে বার করলেন তার সেই নোটবই আর পেন্সিলটা। তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করলেন নোট বই
