তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলো ভেরা, কিন্তু আমার কথা আলাদা কেননা সেই সময় মিসেস রগার্সের ধারে কাছে আমি ছিলাম না। এ কথা আপনাদের কোরই অজানা থাকার কথা নয়।
শান্ত ভাবে চোখ তুলে তাকালেন ওয়ারগ্রেভ, আপনার কথা আমি অস্বীকার করছি না। ভুল আমারো হতে পারে, তবে ভুল শুধরে দেওয়ার ভার আপনাদের ওপর। সেই সময় আমরা ঠিক কে কোথায় ছিলাম বুঝিয়ে বলা যাক এখন–আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই অসুস্থ মিসেস রগার্সকে নিয়ে আমরা আটজন কেউ না কেউ একটা না একটা কাজে ব্যস্ত থাকলেও মিস্ ব্লেন্ট কিন্তু উঠলেন না তার চেয়ার থেকে, তার পরবর্তী গতিবিধির ওপরে নজর রাখার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমাদের কারোরই ছিলো না।
সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠলেন এমিলি যততো সব আজগুবি চিন্তা ভাবনা।
তাঁর কথায় ভ্রূক্ষেপ করলেন না ওয়ারগ্রেভ, তিনি তার কথার জোর টেনে বলে চললেন, মিস ব্লেন্ট, মনে আছে আপনি এখন সংজ্ঞাহীন মিসেস রগার্সের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়েছিলেন। কি, ঠিক বলছি তো?
কেন মনুষত্ব, প্রকাশ করাটা কি কোনো অপরাধ?
আমার প্রশ্ন তা নয়, উত্তরে বললেন ওয়ারগ্রেভ, যা যা ঘটেছিল সেই সময়, তারই একটা চিত্র আমি তুলে ধরার চেষ্টা করছি, দোষগুণের বিচার আপনাদের ওপর। হ্যাঁ যা বলছিলাম, তারপর রগার্স ঘরে ঢোকে ব্রান্ডির গ্লাস হাতে নিয়ে। এমনো তো হতে পারে ঘরে ঢোকার আগেই ব্রান্ডির গ্লাসে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে এনেছিল সে। রোগিনীকে সেই ব্রান্ডি খাওয়ানো হলো। একটু পরে ডঃ আর্মস্ট্রং ও রগার্স ধরাধরি করে তাকে নিয়ে উঠলেন ওপরতলায়। রগার্সের ঘর থেকে চলে আসার আগে ডাক্তার তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এলেন।
হ্যাঁ, সেই সময়কার হুবহু ঘটনার সঠিক চিত্ৰই আপনি তুলে ধরেছেন, তার কথা সমর্থন করে মৃদু হেসে বললেন ব্লোর, তাহলে, দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে আপনি, আমি, মিঃ লম্বার্ড ও মিস্ ক্লেথনকে অনায়াসেই আমাদের সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়।
দেওয়া যায় নাকি? প্রশ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ওয়ারগ্রেভ।
কেন, এর মধ্যে আবার কিন্তু কি থাকতে পারে?
হ্যাঁ, থাকতে পারে বৈকি। নিজের কথা সমর্থন করে মৃদু হাসলেন ওয়ারগ্রেভ। সেই সময়কার দৃশ্যটার কথা একবার ভেবে দেখার চেষ্টা করুন তো মিঃ ব্লোর। হ্যাঁ, আমিই আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, মিসেস রগার্স শুয়ে আছেন বিছানায়। ভিতর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ। ডঃ আর্মস্ট্রং এর দেওয়া ঘুমের ওষুধের প্রতিক্রিয়া তখন শুরু হয়ে গেছে। চেতন অবচেতনের মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছে সে তখন। আর ঠিক সেই সময় দরজায় মৃদু করাঘাতের শব্দ। টলতে টলতে কোনো রকমে দরজা খুলে দিলো সে। আগন্তুক ঘরে ঢুকলেন না, হাতটা ভেতরে সামান্য একটু বাড়িয়ে মৃদুস্বরে বললেন, এই ট্যাবলেটটা খেয়ে নিন ডঃ আর্মস্ট্রং পাঠিয়েছেন। মিসেস রগার্স ট্যাবলেটটা হাতে নিয়ে আগন্তুকের সামনেই সেটা গিলে ফেললেন। কি, এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না তো?
ব্লোর মুখে কথা নেই।
তবে মুখ খুললো লম্বার্ড, হ্যাঁ, একটু বাড়ানো হলো বৈকি। সম্ভব অসম্ভব বলে তো একটা কথা আছে। রগার্স তখন ঘরে, দরজায় শব্দ হলো অথচ সে জানতে পারলো না?
জানবেই বা কি করে? কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন আর্মস্ট্রং, সে তো তখন নিচে ঘর দোর সাফ করতে ব্যস্ত, ছিলো। সেই ফাঁকে সে কেউ তার কাজ হাসিল করে অনায়াসে ফিরে আসতে পারে, কাক পক্ষীও টের পাবে না।
তাছাড়া তাদের কথার মাঝে মন্তব্য করলেন এমিলি, ডঃ আর্মস্ট্রং এর দেওয়া ওষুধে মিসেস রগার্সের অবস্থা তখন দারুণ কাহিল। সে অবস্থায় ভাল মন্দ বিচার করবে কি করে বলুন?
দেখুন মিস্ ব্লেন্ট, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলেন আর্মস্ট্রং, কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে অনেক কিছু জানতে হয়। আর আমাদের ডাক্তারী শাস্ত্রটাই বিচিত্র ধরনের। আপনার অভিযোগ ঠিক নয় এই কারণে যে, ঘুমের ওষুধ খেলেই রোগী যে কাহিল হয়ে পড়বে তা নয়। ওষুধের প্রতিক্রিয়া শুরু হতে যথেষ্ট সময় লাগে, চটজলদি বোঝা যায় না।
ডাক্তারী শাস্ত্র দেখাচ্ছেন? আড়চোখে একবার আর্মস্ট্রং-এর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো লম্বার্ড, তা আপনাদের শাস্ত্রে বুঝি এসব কথাও আজকাল লেখা থাকে?
ডঃ আর্মস্ট্রং যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন, কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন তিনি, কিন্তু তার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো। হাতের ইশারায় থামতে বললেন ওয়ারগ্রেভ,
অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ। এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোই সার হবে। কেবল, কাজের কাজ কখনোই হবে না। তবে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যেটুকু জেনেছি, তাতে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। মিসেস রগার্স একজন মহিলা তার শয্যাপার্শ্বে স্বাভাবিক নিয়মে মিস্ ব্লেন্ট ও মিস্ ক্লেথনের থাকার কথা। ওঁরা না থেকে যদি আমি মিঃ ব্লোর কিংবা লম্বার্ড থাকতেন, তাহলে অবাক হওয়ার পরিবেশ গড়ে উঠতো তখনি। বলুন, ঠিক কিনা?
বিস্মিত ব্লোর অবাক চোখে তাকালেন, কি রকম? সে কি রকম।
গালে হাত রেগে চিন্তামগ্ন যোগীর মতো বললেন ওয়ারগ্রেভ তাহলে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আমরা সকলেই সন্দেহের আওতা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত নই। এবার জেনারেল ম্যাকআর্থারের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করা যাক। ঘটনাটা আজই সকালের, টাটকা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এখন আপনারা কোনো কিছু গোপন না করে স্পষ্ট করে বলুন, আজ সকালে কার কি অ্যালিবাই ছিলো। প্রথমেই আমি নিজের কথা বলছি, আমার অ্যালিবাই তেমন জোরালো কিছু নয়। সারাটা সকাল আমি প্রাসাদের উদ্যানে বসে কাটিয়েছি, আপনারা যারা প্রাসাদে ছিলেন, তারা নিশ্চয়ই তা লক্ষ্য করেছেন। আর মাঝে মধ্যে আপনারা যখন কেউই আমার চোখের সামনে ছিলেন না, তখন কিছু সময়ের জন্য আমি একেবারে একলা হয়ে যাই। তাহলে এর থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে, সেই একাকী থাকাকালীন সময়ে সমুদ্রের ধারে হেঁটে গিয়ে জেনারেল ম্যাকআর্থারকে খুন করে আবার প্রাসাদে ফিরে আসা সম্ভব কিছু নয়। এখন আপনারাই আমার ব্যাপারটা বিশদভাবে ভেবে দেখুন। আমাদের সন্দেহের তালিকা থেকে আমাকে কখনোই বাদ দেবেন না, যতক্ষণ না একেবারে সন্দেহমুক্ত হচ্ছেন, বুঝলেন?
