নির্বিকার চিত্তে বললেন ওয়ারগ্রেভ, আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না মিস্ ক্লেথন। আমি আপনার ওপর আদৌ দোষ চাপাতে চাইনি। কথা প্রসঙ্গে বলতে হলো বললাম তাই। তারপর এমিলির দিকে ফিরে তাকেও বোঝাতে চাইলেন তিনি মাফ করবেন মিস্ ব্লেন্ট, আপনার বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ আমি আনতে চাইনি। আসলে কি জানেন, সন্দেহের তালিকা থেকে আমরা যে কেউই বাদ নই, সেটাই আমি বোঝাতে চাইছি।
ওঁর কথায় বিন্দুমাত্র সূক্ষেপ করলেন না এমিলি, এমন কি চোখ তুলে তাকালেনও না পর্যন্ত, উলের কাঁটায় একটার পর একটা ঘর তুলতে থাকলেন তিনি। অনেকক্ষণ পরে আপন মনে ফিসফিসিয়ে বললেন, আপনার কথাটা অত্যন্ত খাঁটি সত্য। আমরা সকলেই সকলের কাছে একেবারে অপরিচিত, তাই এ ওর বিরুদ্ধে সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে নিজের সমর্থনে বলতে পারি, আমার ব্যাপারে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। যে আমি একটা নগণ্য জীবও হত্যা করিনি, সেই আমি তিন তিনটি মানব জীবন নষ্ট করবো। এটা কি ভাবা যায়? হ্যাঁ আমি বারবার বলবো, আমাদেরই একজন মনুষ্যত্ব হারিয়ে শয়তান বনে গেছে। এখানকার সব অন্যায় ঘটনার মূলে সে।
উত্তম কথা, কোনো সমস্যাই আর রইলো না তাহলে। আমরা সবাই সন্দেহভাজন ব্যক্তির এক একজন।
কিন্তু রগার্স? প্রশ্ন করলো লম্বার্ড? তাকে আমরা
আমরা কি? জানতে চাইলেন ওয়ারগ্রেভ, চুপ করে রইলেন কেন, বলুন।
তাকে আমাদের সন্দেহের তালিকা থেকে অনায়াসেই বাদ দেওয়া যায়, যায় না?
না যায় না, আর কোন্ যুক্তিতেই বা বাদ দেবো বলুন।
প্রথমতঃ আমাদের মতো অতো চালাক চতুর নয় সে। দ্বিতীয়তঃ এক্ষেত্রে তার স্ত্রীও শিকার হয়েছে।
ভ্রু কুঁচকে উঠলো ওয়ারগ্রেভের। আমার দীর্ঘ বিচারকের জীবনে এরকম ভুরি ভুরি ঘটনা ঘটতে আমি দেখেছি! যেখানে স্ত্রী হত্যার দায়ে আপাত দৃষ্টিতে মুখ-সুখ সরল গোবেচারা স্বামীটি অভিযুক্ত। শুধু তাই নয়, বিচারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বামীর দোষ প্রমাণিত হতে দেখা গেছে।
আপনার অভিজ্ঞতার কথা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। আর হয়তো এও সত্য যে, সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরের অভিযোগ মাফিক অতীতের অপরাধের ঘটনা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে রগার্স তার স্ত্রীকে হত্যা করে থাকবে। কিন্তু তার স্বপক্ষে আমার একটা কথা বলার আছে রগার্স বদ্ধ উন্মাদ নয়। অতএব বাকী দুটি হত্যার জন্য কি করেই বা আমরা তাকে দায়ী করতে পারি বলুন?
মিঃ লম্বার্ড, আপনি তার স্বপক্ষে যে যুক্তি দেখালেন তার পাল্টা যুক্তি অনেক এসে যেতে পারে, তাতে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা মুশকিল হয়ে পড়বে। তাই ধরা যাক, রগার্স ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সেই অজ্ঞাত অভিযোগকারীর অভিযোগ মিথ্যা। তারা সত্যিই মিস এ্যান্ডিকে খুন করেনি। আর তাই যদি হয়, তাহলে অভিযোগ শুনে জ্ঞানই বা হারালো কেন মিসেস রগার্স? আগে থেকেই স্ত্রী অদ্ভুত অদ্ভুত আচরণের ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছিলো সে। সেই অজ্ঞাত কণ্ঠস্বর শুনে জ্ঞান হারানোটা একটা নিছক কাকতালীয় ব্যাপার, অন্য কিছু নয়।
ঠিক আছে, অগত্যা স্বীকার করে নিলাম আমাদেরই কেউ একজন মিঃ ওয়েন। যুক্তি খুঁজে না পেয়ে অবশেষে মানতে বাধ্য হলেন লম্বার্ড, আর এও মেনে নিচ্ছি, আততায়ী পুরুষ, কিংবা মহিলাও হতে পারে।
অর্থাৎ আমাদের সকলের চোখে আমরা সকলেই অপরাধী। এখানে নারী-পুরুষ, সম্মান প্রতিপত্তির ধুয়ো তুলে কাউকেই আমাদের সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারি না। প্রকৃত ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সত্যকে উদঘাটন করার চেষ্টা করবো। প্রয়োজন বোধে আমরা এক বা একাধিক ব্যক্তিকে বাদ দিতে পারি। আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে জানার চেষ্টা করবো, আমাদের মধ্যে কে, কে মার্স্টানের পানীয়ের মধ্যে সায়ানাইড প্রয়োগ করেন নি, রগার্সের স্ত্রীকে অধিক মাত্রায় ঘুমের ওষুধ খাওয়ান নি, কিংবা জেনারেল ম্যাকআর্থারের মাথায় পিছন থেকে আতর্কিত আঘাত করেন নি।
তাকে সমর্থন করলেন ব্লোর। হ্যাঁ, ঠিক এই ভাবেই আমরা প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বার করতে পারবো। তবে মার্স্টানের ব্যাপারটা নিয়ে আপাততঃ আলোচনার না করলেও চলবে। কারণ আমরা ধরেই নিচ্ছি যে, জানালার বাইরে থেকে আমাদের মধ্যে কেউ একজন অলক্ষ্যে তার পানীয়ের মধ্যে সায়ানাইড মিশিয়ে দিয়ে থাকবে। রগার্স সেই সময় ঘরে ছিলো কিনা ঠিক খেয়াল করতে পারছি না। তবে সে ছাড়া বাকী আটজনের মধ্যে যে কোনো একজন এ কাজ করতে পারে। কিছু সময় নীরব থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, এবার মিসেস রগার্সের কথায় আসা যাক। তাকে ওপরের ঘরে ধরাধরি করে নিয়ে যান ডঃ আর্মস্ট্রং, ও তার স্বামী রগার্স। এই দুজনের মধ্যে যে কোনো একজন এক ফাঁকে তাকে অধিক মাত্রায় ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিতে পারে।
কথাটা শোনা মাত্র চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন আর্মস্ট্রং, থরথর করে কাঁপছিল তার সারা শরীর। শূন্যে ঘুষি উঁচিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন তিনি, এ অন্যায়, এ ষড়যন্ত্র। এ সব আমি কিছুতেই বরদাস্ত করবো না। আমি আবার বলছি, রগার্সের স্ত্রীকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি পিলও বেশী খাওয়াইনি আমি।
আঃ থামবেন ডঃ আর্মস্ট্রং। বিরক্তিতে ফেটে পড়লেন ওয়ারগ্রেভ, জানি, নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে আপনার ভাল লাগবে না। কিন্তু তা বললে তো চলবে না। এখন তোত আপনাকে অনেক অপ্রিয় সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, এ কথা তো আপনার আগেই জানা উচিত ছিলো। এক্ষেত্রে কেবল আপনার ও রগার্সের পক্ষেই মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মিসেস রগার্সের ঘুম আর না ভাঙানো সহজ, যা অন্য কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে একেবারে যে অসম্ভব নয়, তাও আমি বলবো না, আরো বিশদ ভাবে আলোচনা করলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হতে পারে। আপনারা দুজন ছাড়া অবশিষ্ট থাকেন মিঃ লম্বার্ড ইন্সপেক্টর ব্লোর, মিস্ ভেরা ক্লেথন, মিস্ এমিলি আর আমি। এখন দেখতে হবে মিসেস রগার্সের হত্যার ব্যাপারে এই পাঁচজনের সকলকেই কি আমাদের সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব? না, আমার সিদ্ধান্ত হলো, তা কখনোই সম্ভব নয়।
