আর আমার বিষয়টা অন্যমনস্ক ভাবেই বললো ব্লোর ডঃ আর্মস্ট্রং ও মিঃ লম্বার্ডকে জিজ্ঞেস করুন ওঁরা বাতলে দেবেন, কেন না সারাটা সকাল আমার কেটেছে ওঁদের দুজনের সঙ্গে।
তার মুখের কথাটা যেন লুফে নিলেন আর্মস্ট্রং আপনি কিন্তু একবার প্রাসাদে গিয়েছিলেন দড়ি আনতে।
হ্যাঁ, গিয়েছিলাম বৈকি, অস্বীকার করবো না। প্রাসাদে গিয়েছি, দড়ি নিয়ে আবার ফিরে এসেছি আপনাদের কাছে।
কিন্তু যতখানি সময় লাগার দরকার তার থেকে একটু বেশী সময়ই নিয়েছিলেন আপনি? বলে হাসলেন ডঃ আর্মস্ট্রং।
বাঃ দড়িটা খুঁজে বার করতে একটু সময় লাগতেই তো পারে।
আর্মস্ট্রং কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে ওয়ারগ্রেভ বললেন মিঃ ব্লোরের অনুপস্থিত থাকাকালীন সময়ে আপনি ও মিঃ লম্বার্ড, এক সঙ্গেই ছিলেন, নাকি….।
হ্যাঁ নিশ্চয়ই। জোর দিয়ে বললেন আর্মস্ট্রং তবে কিছু সময়ের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মিঃ লম্বার্ড। অবশ্য আমি তখন আমার জায়গা ছেড়ে এক চুলও নড়িনি।
লম্বার্ডের দিকে মুখ ফেরালেন ওয়ারগ্রেভ। উদ্দেশ্য তার অ্যালিবাইটা জেনে নেওয়া।
সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো লম্বার্ড, আমি গিয়েছিলাম ছোট্ট একটা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে। দেখতে গিয়েছিলাম, এখন থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে হিলিওগ্রাফ পদ্ধতিতে ওপারে স্টিকলহ্যাভেনে কোনো খবর টবর পাঠানো যায় কিনা। তার জন্য অবশ্য বেশীক্ষণ সময় নিইনি, মাত্র মিনিট দুয়েক হবে। তারপরেই আবার ফিরে যাই ডঃ আর্মস্ট্রং-এর কাছে।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন আর্মস্ট্রং। হুঁ, অতি অল্প সময়ের জন্য উনি আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। আমার ধারণা, এতো অল্প সময়ে তাঁর পক্ষে ম্যাকআর্থারকে খুন করে আবার ফিরে আসা অসম্ভব।
তা আপনার ঘড়ি দেখেছিলেন কি? হেসে হেসেই প্রশ্নটা করলেন ওয়ারগ্রেভ।
মুখটা শুকিয়ে গেলো আর্মস্ট্রং-এর না তো।
আমার হাতে ঘড়িই ছিলো না, দেখবো কি করে? ব্যাপরাটা হাল্কা ভেবে নিলো লম্বার্ড।
জেনে রাখুন, দু, এক মিনিট বললে, সঠিক সময়টা বলা হয় না। তাপর এমিলির দিকে মুখ ফেরালেন ওয়ারগ্রেভ মিস ব্লেন্ট, এবার আপনার বলার পালা।
ভেরা আর আমি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে উঠেছিলাম। উত্তরে এমিলি বলেন, তারপর ফিরে এসে প্রাসাদের উদ্যানে বসে উল বুনতে শুরু করি।
আমি তো সেখানেই বসেছিলাম একটা আরাম কেদারায় বললেন ওয়ারগ্রেভ, বুঝি বা একটু অবাক হয়ে কই আপনাকে তো দেখতে পাইনি সেখানে।
না দেখার কথা। ঝড়ে হাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য পূর্ব দিকের দেওয়াল ঘেঁষে আমি বসেছিলাম।
দুপুরে খাবার ঘণ্টা পড়া পর্যন্ত ছিলেন সেখানে?
আর মিস্ ক্লেথন, আপনি, আপনি কোথায় ছিলেন?
সকালে আমি আর মিস্ ব্লেন্ট পাহাড়ে উঠেছিলাম। সেখান থেকে ফিরে আমি একা একা যাই সমুদ্রের ধারে। সেখানে মিঃ ম্যাকআর্থারের সঙ্গে কিছু সময় কাটাই গল্প-গুজবে।
কখন। জিজ্ঞেস করলেন ব্লোর, তার সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার আগে না পরে?
ঠিক বলতে পারবো না। তবে তখন তাকে যেন একটু অস্বাভাবিকই লাগছিল। কেঁপে উঠলো ভেরার গলার স্বর।
অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিক বলতে কি রকম? একটু ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন ওয়ারগ্রেভ।
তার কথাবার্তাগুলো কেমন যেন বললেন, আমাদের বাঁচার আয়ু নাকি ফুরিয়ে আসছে, আমরা কেউ নাকি এখান থেকে জীবিত অবস্থায় আর ফিরে যেতে পারবো না। আরো বললেন তিনি নাকি শেষ দেখার অপেক্ষায় বসে আছেন। তাঁর অমন সব অস্বাভাবিক কথা শুনে আমি ভীষণ ভয় পেলাম, পড়ি মড়ি করে ছুটে পালিয়ে এলাম তার কাছ থেকে।
তাই বুঝি। তারপর?
প্রাসাদে ফিরে এলাম। খাবার ঘন্টা পড়ার আগে আর এক চক্কর বাইরে ঘুরতে বেরোই। আর খাবার ঘণ্টা শুনেই আবার ফিরে আসি প্রাসাদে। মিঃ ম্যাকআর্থারের বিষাদে ভরা কথা শুনে আমার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এই অভিশপ্ত দ্বীপ থেকে সত্যি, সত্যি যদি আর না ফিরি–
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বললেন ওয়ারগ্রেভ, এখন তাহলে বাকী রইলো এখানকার শেষ ব্যক্তিটি রগার্স। কিন্তু তার কাছ থেকে খুব বেশী কিছু জানা যাবে বলে তো আমার মনে হয় না।
ওয়ারগ্রেভের অনুমাণই ঠিক। রগার্স যা বললো, সংক্ষেপে এই রকম; প্রাসাদে রান্নাবান্না এবং টুকিটাকি অন্য আরো কাজে এতোই ব্যস্ত ছিলো যে প্রাসাদ ছেড়ে বাইরে কোথাও যাওয়ার একটুও ফুরসত পায়নি। খাবার ঘন্টা বাজিয়ে অপেক্ষা করেছে সে খাবার ঘরে। তারপরের ঘটনা তো সকলের সামনেই ঘটেছে। তবে একটা ব্যাপারে ভয়ঙ্কর বিস্মিত সে। তার নাকি স্পষ্ট মনে আছে সকালে খাবার ঘরের আলমারিতে আটটি পুতুল থাকতে দেখে। কিন্তু ঘণ্টা খানেক পরে ফিরে গিয়ে সে দেখে, সেখানে রয়েছে মোট সাতটি পুতুল, অর্থাৎ একটি উধাও।
রগার্স তার বক্তব্য শেষ করা মাত্র ঘরের মধ্যে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। কারোর মুখে কথা নেই। কথা নেই ওয়ারগ্রেভের মুখেও, নিচু হয়ে আধ বোজা চোখে তিনি তখন ভেবে চলেছেন আকাশ পাতাল।
কেবল দেওয়াল ঘড়িতে তখন শব্দ হচ্ছিল টিক্ টিক্ টিক……বিচার তো শেষ। এখন উনি কি রায় দেন উনিই জানেন, আর জানেন ঈশ্বর।
তার কথার রেশ মেলাতে না মেলাতেই শুরু করলেন ওয়ারগ্রেভ তাঁর রায় দান করার পালা। মাথাটা ঝুঁকে পড়লো তার মাথার কাছে। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর তার–তিন তিনটি মৃত্যুর ঘটনাই আমরা বিশদ ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলাম। আপাত দৃষ্টিতে একেকটা মৃত্যুর ব্যাপারে কোনো বিশেষ ব্যক্তির ওপর আমাদের সকলের সন্দেহ ঘনীভূত হলেও আসলে আমরা কেউ পুরোপুরি সন্দেহ মুক্ত নই। অবশ্যই একটা ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই, আসল খুনী আমাদের উপস্থিত সাতজনের মধ্যেই একজন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে কে সেই খুনী? তাকে চিহ্নিত করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ আমাদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি আমাদের আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও। এই রকম এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমার একটাই উপদেশ প্রত্যেককেই সতর্ক হয়ে থাকতে হবে, এখন থেকে আমাদের দায়িত্ব আমাদের নিজেদের হাতেই তুলে নিতে হবে, এ ছাড়া বাঁচার আর কোনো রাস্তা নেই।
