তাহলে, ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন রগার্স, আমি যাই ওঁকে ডেকে নিয়ে আসি। তাকে বাধা দেন আর্মস্ট্রং। না, আমই যাচ্ছি রগার্স, তুমি বরং এদিকটা সামলাও ততক্ষণে। এই বলে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
বাইরে তখন ঝড়ের তাণ্ডবলীলা চলছিল, বাতাসে তীক্ষ্মতা, সমুদ্রের ঢেউগুলো প্রচণ্ড ক্রোধে আছড়ে পড়ছিল বালির ওপর। খাবার টেবিলের সামনে পাঁচটি প্রাণীর অধীর প্রতীক্ষা, কারোর মুখে কথা নেই, সবার চোখে একটা বোবা চাহনি, তারই মাঝে অজস্র প্রশ্ন, কি কি হতে পারে ম্যাকআর্থারের? কেন তিনি এখনো আসছেন না।
ভেরাই প্রথমে নীরবতা ভঙ্গ করলো, ঝড় আসছে…।
আশ্চর্য। ট্রেনের সেই অদ্ভুত লোকটাও তো এই কথা বলেছিল, মৃদু হেসে বললেন ব্লোর, ঝড় আসছে–বুঝতে পারি না আগে থেকেই লোকগুলো কি করে যে টের পেয়ে যায়।
খাবার ভর্তি ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে কয়েক পা এগিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো রগার্স, দরজার দিকে ফিরে তাকিয়ে চমকে ওঠার মতো করে বলে ওঠলো সে, ঐ তো, কে যেন দৌড়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।
রগার্সের অনুমানই ঠিক, সবাই কান পেতে শুনলো বাইরে প্রাসাদের উদ্যানে দ্রুত পায়ের শব্দ, ঠিক যেন দৌড়ে কেউ
ব্যস্ত হয়ে সবাই উঠে দাঁড়ালেন। সবার ভয় আর বিস্ময় ভরা চোখের দৃষ্টি পড়ে রইলো দরজা প্রান্তে।
ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন আর্মস্ট্রং। অনেকটা পথ ছুটে আসার জন্য হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। উদভ্রান্ত দৃষ্টি তার চোখে, ভয়ে আড়ষ্ট তার মুখখানি।
কি হয়েছে ডাক্তার? পাঁচজনেই প্রায় একই সঙ্গে প্রশ্ন করে বসলেন।
জেনারেল ম্যাকআর্থার–কথাটা শেষ করতে পারলেন না আর্মস্ট্রং ভয়ে আতঙ্কে ঠোঁট কাঁপছে তার।
তবে, তবে কি তিনি মারা গেলেন শেষ পর্যন্ত? আচমকাই যেন সেই কঠিন শব্দটা মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো ভেরার।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। মাথা নিচু করে চোখ বুজলেন আর্মস্ট্রং।
আর তখনি এক অখণ্ড নীরবতা থমথম করতে থাকলো ঘরটা। এ ওর দিকে তাকালো নীরবে কারোর মুখ থেকে একটি কথাও বেরুলো না।
ঝড়ে দ্বীপটা বুঝি উড়ে যাবে। তবু সেই ঝড় মাথায় করে ছুটতে হলো সমুদ্রের ধারে। কিছুক্ষণ পরেই ম্যাকআর্থারের মৃতদেহটি বয়ে নিয়ে এলেন ব্লোর আর আর্মস্ট্রং। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে লাগলেন ওরা। হলঘরের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাকি পাঁচজন।
আর ঠিক তখনি প্রচণ্ড জোড়ে ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নামলো বৃষ্টি। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো তীব্র বাতাসের দাপটে তীরের মতো এসে বিধতে থাকলো জানলার শার্সিগুলোতে।
তারই মাঝে প্রায় সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে এক সময় খাবার ঘরে এসে ঢুকলো ভেরা, নিঃশব্দে। শূন্য ঘর চেয়ার গুলো সব ফাঁকা টেবিলের ওপর খাবারের প্লেটগুলো সাজানো অভুক্ত। জানালার শার্সিতে বৃষ্টির ফোঁটার চটপট শব্দ। আর সেই শব্দটাকে ছাপিয়ে হঠাৎ দরজা বন্ধ করার শব্দ শুনে চকিতে দরজার দিকে ফিরে তাকালো ভেরা, তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো রগার্সের অবয়ব।
কৈফিয়ত দিতে গিয়ে ভয় বিজড়িত কণ্ঠে বললো ভেরা, আ-আমি রাখতে এসেছিলাম–
জানি, আপনি কি দেখতে এসেছিলেন, রগার্স যেন তার মুখের কথাটা এক রকম লুফে নিয়ে বললো হা ঐ তো রাখুন না, একটা পুতুল কেমন কমে গেছে। আটটার পরিবর্তে এখন, বলবো। মাথার পিছনে ভারী জাতীয় কোনো কিছুর আঘাতে মারা গেছেন ম্যাকআর্থার।
একটা চাপা গুঞ্জন উঠলো কোন কিছুর মধ্যে। ওয়ারগ্রেভের পরবর্তীয় প্রশ্ন সেই ভারী জাতীয় জিনিষটা খুঁজে পেয়েছেন?
না।
তাহলে আপনার প্রমাণ
ধারণা তো নয়, আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত, কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
এবার একটু নড়ে চড়ে বসলেন ওয়ারগ্রেভ, যেমন করে বিচারক বসেন তার চেয়ারে। সারাটা সকাল কাটিয়েছেন অলস ভঙ্গিতে, এখন তার আলসেমি চলে না। ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখতে হয়।
উপস্থিত সকলের মুখের ওপর দৃষ্টি ফেলার পর এক সময় তাঁর দৃষ্টি স্থির হলো লম্বার্ডের মুখের ওপর, আপনারা হয়তো বুঝতে পারেন নি, আমি কিন্তু সকালে উদ্যানে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে আপনাদের সকলের গতিবিধি লক্ষ্য করেছি। আমার অনুমান যদি মিথ্যে না হয়, তাহলে বলি, সেই অজ্ঞাত আততায়ীটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন আপনি। বলুন আমি ঠিক বলেছি কি না?
মাথা নেড়ে সায় দেয় লম্বার্ড, হ্যাঁ আপনার অনুমান যথার্থ।
আর আপনাদের এও সন্দেহ যে, মার্স্টান কিংবা রগার্সের স্ত্রী কখনোই আত্মহত্যা করতে পারে না। সকলের অলক্ষ্যে মিঃ ওয়েনেই তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিয়েছে চিরদিনের মত।
হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আমি একমত, এবার উত্তর দিলেন ব্লোর, আর আমারে এও ধারণা মিঃ ওয়েন একজন বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
অবশ্যই সে, তাকে সমর্থন করলেন ওয়ারগ্রেভ তবে তার উন্মত্ততার বিশ্লেষণের প্রয়োজন এখন নেই। এখন সব থেকে জরুরী প্রয়োজন হলো সময় থাকতে থাকতে তার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা।
কিন্তু এই দ্বীপে আমরা ছাড়া আর তো কেউ নেই এখন। ভয়ে ভয়ে বললেন আর্মস্ট্রং, তাহলে আগের তিনজকে কি করে হত্যা করলো সে, আর আমরাই বা কি ভাবে তার হাতে খুন হতে পারি?
এ প্রশ্নের উত্তরও আমি মোটামুটি একটা ভেবে রেখেছি।
ম্লান হেসে বলতে থাকেন ওয়ারগ্রেভ, সকালবেলা এই যে আপনারা আততায়ীর সন্ধানে বেরোলেন যদি একবার ঘৃণাক্ষরেও আমাকে বলতেন তাহলে বোধহয় আপনাদের পরিশ্রম লাঘব হতে পারতো। তবে এ সবের পরেও আমি বলছি এই দ্বীপেই আছেন মিঃ ওয়েন। শুনলেন না, আমাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ সে খুঁজে বের করেছে, তার মতে আইনের মার প্যাঁচে আমরা নাকি কৌশলে শাস্তি এড়িয়ে গেছি। তাই বোধহয় সে নিজেই শাস্তির ভার তুলে নিয়েছেন। হ্যাঁ তার হাতে থেকে কেউই তাদের অপরাধের শাস্তি এড়াতে পারবে না আর শাস্তি দানের একটা অভিনব পন্থাও তিনি খুঁজে নিয়েছেন। আমাদের দলে মিশে গিয়ে এক এক করে সে তার কাজ হাসিল করে চলেছে। আর তাই আমরা তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছি না।
