ভয় পাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়, চিন্তিত ভাবে বললেন আর্মস্ট্রং, এ্যান্টনি মার্স্টানের মৃত্যু আমি কিছুতেই আত্মহত্যা বলে মেনে নিতে পারছি না।
কেন, এটা তো একটা অঘটনও হতে পারে।
অঘটন? সরাসরি প্রশ্ন চোখে তার দিকে তাকালো লম্বার্ড।
বলছিলাম কি, আর্মস্ট্রং এর দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে বললেন, ব্লোর এই ধরুন ডঃ আর্মস্ট্রং-এর ঘুমের ওষুধ দেওয়ার ব্যাপারটা
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ালেন লম্বার্ড আপনার একথা বলার অর্থ কি জানতে পারি?
ওষুধের নামটা আমরা জানতে পারি।
ট্রায়োনস্ট। এ ওষুধে রোগীর শরীরে কোনো ক্ষতি করে না।
কিন্তু ভুল করে আপনি যদি ডোজটা একটু বেশী দিয়ে ফেলে থাকেন। হা, ভুলের কথা বলছি। মানুষ মাত্রই তো ভুল করে থাকে। তাই যদি আপনিও
না, না, জোরে মাথা নেড়ে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বললেন আর্মস্ট্রং, ভুল আমি করি নি, ইচ্ছে করেও নয়।
আরে কি আরম্ভ করলেন আপনারা? ধমক দিয়ে উঠলো লম্বার্ড, সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক শুরু করে দিলেন।
না, আমি তর্ক করতে চাই না, ব্লোর কৈফিয়েতের সুরে বলেন, ভুল সব মানুষেরই হয়ে থাকে।
সাধারণ মানুষের কথা আমি জানি না, সামান্য একটু হেসে বললেন আর্মস্ট্রং তবে ডাক্তারদের ভুল করার এক্তিয়ার আছে।
হ্যাঁ তা তো থাকবেই। বিদ্রূপ করে বললেন ব্লোর, সেই না দেখা অভিযোগকারীর কথা ঠিক বলে ধরে নিলে মনে হয়, এ রকম ভুল আপনি বোধ হয় আগেও করেছেন অনেকবার।
মুহূর্তে আর্মস্ট্রং এর মুখটা সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মনে হলো, কেউ বুঝি ব্লটিং পেপার দিয়ে তার মুখের রক্ত শুষে নিয়েছে। তাঁর সেই দুরবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসতে থাকেন ব্লোর।
সহ্য করতে পারেন না লম্বার্ড। ব্লোরের উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ম ঝাঁঝালো সুরে বললেন তিনি, আপনি মশাই আচ্ছা লোক তো। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে লজ্জা করে না আপনার? গলাবাজি করে ওঁর নামে যা তা বলে গেলেন, কিন্তু আপনিও কমতি কিসের শুনি?
আপনি চুপ করুন। ধমকে উঠলেন ব্লোর আগ বাড়িয়ে আমার ব্যাপারে নাক গলাতে আসবেন না। আমিও আপনার অনেক দোষ ত্রুটির কথা জানি।
কি কি জানেন আমার ব্যাপারে আপনি? উত্তেজিত হয়ে বললেন লম্বার্ড।
রামো, রামো, আপনার হাব-ভাব দেখে ভেবেছিলাম, আপনি বুদ্ধিমান। কিন্তু আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে আপনার মতো নির্বোধ আর কেউ নেই, এখানে, অন্তত এখন এই দ্বীপে।
আমাকে বোকা প্রতিপন্ন করে আপনার আসল উদ্দেশ্যর কথাটা কিন্তু চেপে রাখতে পারবেন না মিঃ লম্বার্ড। শেষের সুরে প্রশ্ন করলেন, ব্লোর বলুন কেন আপনি পিস্তল সঙ্গে এনেছেন? আপনার উদ্দেশ্যের কথা আপনি গোপন রেখেছেন এই তো?
হ্যাঁ ঠিক তাই। গোপন রাখার কারণ একটা অবশ্যই আছে।
কারণটা কি বলবেন?
শুনবেন? তাহলে বলি শুনুন, মিঃ ওয়েনের আমন্ত্রণ, পেয়ে আমি এখানে আসি নি। আসলে আমি এসেছি একজন ইহুদীর নির্দেশে, নাম তার আইজ্যাক মরিস। তার অনুমান এখানে নাকি বিপদের সম্ভাবনা থাকতে পারে। তারই উপদেশ মতো সঙ্গে একটা পিস্তল আনতে বাধ্য হয়েছি আমি বুঝলেন?
ওসব কথা কাল বলেন নি কেন?
আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেলো তো। বিরক্ত হয়ে বললেন লম্বার্ড, আপনাদের সঙ্গে প্রথম আলাপের সময় আমিই কি জানতাম, একটার পর একটা অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যাবে।
বেশ তো, বলার কথাটা এখনিই বা আপনার মনে হলো কেন?
এখন বুঝে গেছি, আমাদের বাঁচার আর কোনো পথ নেই। মিঃ ওয়েনের পাঠানো একশো গিনির লোভে পড়ে এই সর্বনাশা জালে জড়িয়ে পড়েছি। এই জাল ছিঁড়ে পালাবার কোনো উপায় নেই দেখে শেষ পর্যন্ত সব খুলে বললাম। একটু থেমে কি ভেবে যে আবার বলতে শুরু করলো, মাস্টার্ন ও রগার্সের স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু দশটি পুতুলের মধ্যে দুটি উধাও হয়ে যাওয়া, এ সবের অর্থ আপনারা বুঝতে পারছেন কিনা জানি না, আমি কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমরা সবাই এক কঠিন জালে জড়িয়ে পড়েছি। আর যে লোকটা আমাদের ধরার জন্য কৌশলে এই জালটা বিছিয়ে রেখেছে, তার হাত থেকে রেহাই আমরা পেতে পারি না কখনো।
ওদিকে মধ্যাহ্ন ভোজের ঘন্টা পড়লো ঢং, ঢং ঢং…….
খাবার টেবিলে তিনজনে বসতেই নিচু গলায় বললো রগার্স খাবারের বিশেষ আয়োজন করতে পারিনি। বুঝতেই পারছেন, ঘরে যা ছিলো তাই দিয়েই আপনাদের আহারের ব্যবস্থা করেছি কোনো রকমে।
জিনিসে ভর্তি ভাড়ার, ভাববেন না, টিনের খাবারও আছে প্রচুর। তারপর স্বগোতোক্তি করলো রগার্স এখনো নারীকটের কোনো পাত্তাই নেই। কেন যে সে এলো না, সেই জানে আর জানেন ঈশ্বর।
এমিলি ঘরে ঢুকে টেবিলের সামনে বসে বিড় বিড় করে আপন মনে বললেন, বাতাস ঝড়ের পূর্বাভাস, সমুদ্রের অশান্ত ঢেউগুলো যেন আক্রোশে ফুঁসছে।
তারপর ঘরে ঢুকলেন ওয়ারগ্রেভ। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে একটা চেয়ার দখল করে ঝাপসা চোখে উপস্থিত সকলের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিয়ে চোখ নামিয়ে নিলেন।
ব্যস্ত সমস্ত ভাবে ঘরে এসে ঢুকলো ভেরা। অনেক দেরী করে ফেললাম। আপনারা, নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন।
তার কথার জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন এমিলি, আচ্ছা, জেনারেল ম্যাকআর্থার এখনো এলেন না কেন বলুন তো?
উনি তো এখন বসে আছেন অনেক দূরে, সেই সমুদ্র তীরে। ওখান থেকে খাবার ঘণ্টা তিনি হয়তো শুনতেই পান নি। তাছাড়া আজ সকাল থেকেই ওঁকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল, কথাবার্তায় অসংলগ্নতা–
