তা তো নিশ্চয়ই। তা তো নিশ্চয়ই। আমিও তো তাই মনে করি। বললেন ব্লোর কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার দেখুন, মিঃ লম্বার্ড একটা পিস্তল ঠিক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।
হয়তো সেটা তার অভ্যাসও তো হতে পারে।
সেটা তার অভ্যাসের দোহাই দিচ্ছেন? বিশেষ কোনো গণ্ডগোলের জায়গায় পিস্তল কেন বন্দুক সঙ্গে নিয়ে আসুন না কেন আপনি, তাতে সন্দেহ করার কিছু থাকবে না। কিন্তু এখানে এই নির্জন দ্বীপে পিস্তলের কি প্রয়োজন হতে পারে, আমি তো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে আর্মস্ট্রং এর, মুখে তার কোনো উত্তর যোগালো না।
বেশ কিছুক্ষণ পরে নিচ থেকে উপরে উঠে এলো লম্বাৰ্ড দড়ি বেয়ে। তার মুখে হতাশার ছাপ। কোনো লাভই হলো না শুধু যাওয়া আসাই সার হলো। কেউ নেই নিচে। একান্তই যদি থেকে থাকে সে, তাহলে আমার ধারণা ঐ প্রাসাদের ভেতরে কোথাও লুকিয়ে আছে নিশ্চয়ই।
প্রাসাদের ভেতরে চিরুনী-তল্লাসী চালানো হলো। কিন্তু লুকিয়ে থাকার মতো গোপন ফাঁক ফোকর চোখে পড়ল না। একতলায় তল্লাসী চালিয়ে তারা তিনজন দোতলায় উঠতে গিয়ে দেখলো, পানীয়ের ট্রে হাতে নিয়ে প্রাসাদের উদ্যানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রগার্স। তাকে ঐ ভাবে দেখে মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো লম্বার্ড, লোকটা মানুষ নাকি জানোয়ার। বউটা সবে মারা গেলো অথচ তার কোনো দুঃখ বোধ নেই? কেমন সহজ ভঙ্গিমায় কাজ করে চলেছে একের পর এক।
পেটের তাগিদে মশাই, স্রেফ পেটের তাগিদে। কাজের বিনিময়ে টাকা পাচ্ছে সে, আমাদের দেখা শোনা করার জন্যই তাকে এখানে চাকরী দিয়ে ডেকে আনা হয়েছে। তাছাড়া স্ত্রী বিয়োগের শোকে অভিভূত হয়ে কাজে ঢিলে দিলে আপনরাই কি তাকে রেহাই দিতেন? বলে হাসলেন আর্মস্ট্রং।
দোতলায় ঘরগুলোতে উঁকি মেরেও কোনো হদিশ পাওয়া গেলো না সেই বদ্ধ পাগলটার। এরপর তিনজন এসে দাঁড়ালেন সিঁড়ির মুখে।
তিনতলায় ওঠার একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ব্লোর বলে উঠলো, ঐ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গিয়ে দেখা যাক ওটাই বাকি থাকে কেন।
থাক কোনো লাভ হবে না, বাধা দিয়ে বললেন আমস্ট্রং ওখানে রগার্সের ঘর। গিয়ে দেখা যাবে তার স্ত্রীর মৃতদেহ শায়িত রয়েছে সেখানে। যেখানে কোনো বদ্ধ পাগলও থাকতে পারে না।
অতঃপর তারা তিনজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গেলেন। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে আর্মস্ট্রং এর একটা হাত চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন ব্লোর, শুনতে পাচ্ছেন, ওদিকে কার পায়ের শব্দ?
তিনজনেই কান পেতে শুনলেন, মৃদু পদসঞ্জারে কে যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে ওপরের ঘরে। তিনজনই স্তন্ধ, হতবাক। বিস্ময়ের ঘোরটা কোনো রকমে কাটিয়ে উঠে আর্মস্ট্রং প্রথমে মুখ খুললেন রগার্সের ঘরে কে যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে? চলুন দেখা যাক কে–কে হতে পারে সে।
নিঃশব্দে পা ফেলে তিনজন ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে দরজায় কান পাততেই শব্দটা যেন এবার আগের চেয়ে আরো একটু স্পষ্ট হলো। মনে হলো চোরের মতো কে যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু।
অধৈর্য হয়ে দরজায় লাথি মারলো ব্লোর, দরজা খুলে যেতেই প্রায় এক সঙ্গে তিনজনে ঢুকে পড়লেন ঘরের ভেতরে। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খাওয়ার মতো থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তাঁরা।
ঘরের মধ্যে তখন আর কেউ নয়, স্বয়ং রগার্স, আচমকা দরজায় ধাক্কা পড়তে দেখে সেও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পরবর্তী ঘটনাটা দেখার অপেক্ষায়। হাতে তার একরাশ পোষাক
সরাসরি রগার্সের দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছিলেন ব্লোর। মাথা নিচু করে কোনো রকমে আমতা আমতা করে বললেন, নিচ থেকে শুনতে পেলাম ওপরে কে যেন অতি সন্তপর্ণে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাই সন্দেহ নিরসন করতে ছুটে এলাম ওপরে।
ছিঃ ছিঃ কি লজ্জার কথা বলুন তো, অতি বিনয়ের সঙ্গে বললো রগার্স, দোষ তো আমারই স্যার, এখানে আমার আগে আপনাদের অনুমতি নিয়ে আসা উচিত ছিলো আমার। নিচে অতিথিদের ঘরগুলো তো ফাঁকাই পড়ে রয়েছে। ভাবলাম মৃতদেহ আগলে পড়ে থেকে কি লাভ, তাই আমার জিনিষপত্র নিয়ে উঠে এলাম।
সে তো বেশ ভাল কথাই রগার্স। এবার মুখর হলেন আর্মস্ট্রং এখন থেকে আমরা তোমাকে আমাদের কাছে কাছেই পাবো।
তেমনি মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালো রগার্স। তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো নিঃশব্দে।
সঙ্গী দুজনের দিকে ফিরলেন আর্মস্ট্রং এর পর আর কি জানার থাকতে পারে? ঘুরে ফিরে সবই তো দেখা হলো। চলুন এবার নিচে যাওয়া যাক।
ঘরের মধ্যে আর একটা ঘর। দরজার কাছে ছুটে গিয়ে শিকল ধরে টানাটানি করতে লাগলেন ব্লোর। দুচারবার টানাটানি করতেই শিকল খুলে গেলো। ঘরের ভেতরটা অন্ধকারে ডুবেছিল। আবছায়া অন্ধকারে তিনজন দেখলেন, সেখানে কারো অস্তিত্ব নেই, আছে শুধু ঘর ভর্তি কালি ঝুলি আর মাকড়সার জাল। তারা তিনজন কিছুক্ষণ পরে ঘর থেকে যখন বেরিয়ে এলেন, তখন চেনাই যায় না তাদের, কালি ঝুলি মেখে একাকার।
মাকড়সার জাল হাত দিয়ে সরাতে সরাতে বললো লম্বার্ড, দেখা গেলো এই দ্বীপে আমরা জীবিত আটজন অতিথি ছাড়া অন্য আর কারোর অস্তিত্ব নেই এখানে।
.
০৯.
ভুল, আমরা তাহলে শুরু থেকে ভুল করেই এসেছি। মন্তব্য করলেন ব্লোর। দুটো মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আমরা বড় বেশী ভয় পেয়ে গেছি।
