কি যা তা বকছেন? শেষে আপনার মাথা কি খারাপ?
না ভেরা আমার মাথা ঠিকই আছে। আমি তোমাকে একটা নিষ্ঠুর সত্য কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মাত্র। তুমি যতোই আশাবাদী হও না কেন, জেনে রেখো–এই দ্বীপ থেকে কোনোদিনও আমাদের মুক্তি হবে না। আমার বিলীন হয়ে যাবো একদিন, যাবো ফিরে সেই শান্তির নীড়ে।
শান্তি, কিসের শান্তি? একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় কোনো রকমে কান্নাটাকে দমন করে বললো ভেরা, আপনার কোনো কথারই অর্থ আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
তাহলে শোন ভেরা, লেসলী, হ্যাঁ আমার স্ত্রী লেসলীকে আমি সত্যি সত্যি খুবই ভালবাসতাম। ওকে আমার জীবন সঙ্গিনী হিসাবের পেয়ে আমার আনন্দের সীমা ছিলো না। ওকে আমার প্রাণের থেকেও বেশী ভাল লাগতো বলেই বোধহয় অতো বড় একটা ভুল করে বসলাম।
ভুল, কি রকম ভুল?
সব বলবো তোমাকে শুধু তোমাকেই আমার মনের কথা সব খুলে বলতে পারি। মৃত্যু আমার শিয়রে। তাই আজ আর কোনো কিছুই গোপন করবো না, সব বলবো তোমাকে। জানো ভেরা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও রিচমণ্ডকে আমি ইচ্ছে করেই পাঠিয়েছিলাম যুদ্ধ ক্ষেত্রে। হ্যাঁ, হা, মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়ার অর্থই হলো আমি নিজে খুন করেছি। ছুরির আঘাতে নয় পিস্তলের গুলিতে নয় স্রেফ হুকুম। তখন একবারটি আমার মনে হয়নি, এ অন্যায়, এ পাপ, এ পাপের শাস্তি আছে, আছে প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা কিন্তু আমার ভুল ভেঙে গেছে, আজ মনে হচ্ছে
কি মনে হচ্ছে?
মনে হচ্ছে যা করেছি, যা ভেবেছি সব মিথ্যে, তাসের ঘরের মতো ক্ষণস্থায়ী। আমার সব চালাকী ধরে ফেলে থাকবে লেসলী হয়তো। না বলে চলে গেলো যে আমার কাছ থেকে, জিজ্ঞেস করারও সুযোগ দিয়ে গেলো না সে। আমি এখন একা নিঃসঙ্গ, দিন আর কাটতে চায় না। কবে যে আসবে আমার সেই শেষের দিনটা
নীরবে সব শুনে গেলো ভেরা স্থির অবিচল থেকে। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে ম্যাকআর্থার নিজেই আবার বললেন, তোমার তো ভাল লাগার কথা ভেরা, তুমি কেন কথা বলছো না? দেখবে, শেষের কদিন কতো সুখের, কতো আনন্দের, যার সঙ্গে আগের আগের কোনো দিনের সঙ্গে তুলনা হয় না।
হঠাৎ রেগে উঠে দাঁড়ালো ভেরা। তার চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ে পড়লো, তীক্ষ্মস্বরে বললো, তার মানে কি বলতে চাইছেন আপনি?
ম্যাক আর্থারের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি, অনেক কিছুই, তোমার সম্পর্কে আমার অজানা তো কিছু নেই ভেরা।
সব বাজে কথা। আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না আপনি। না, কিসসু নয়।
সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলেন ম্যাক আর্থার যেন পরম নিশ্চিন্তে, আর কিছু বলার নেই তাঁর চোখে একটা ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠতে দেখা গেলো। এক সময় নীরবে চোখ বুজলেন তিনি, আর তখনি তার মনে হলো, ঐ তো কে যেন পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে নিঃশব্দে চুপি চুপি। কে, কে ও? লেসলি?
চোখ না খুলেই একান্ত অন্তরঙ্গ সুরে ডাকলেন তিনি, লেসলি আমার প্রিয়তমা লেসলি তুমি এসেছো? আমি যে তোমারি অপেক্ষায় প্রহর গুণে চলেছি
দড়ি হাতে ফিরে এসে দেখলেন ব্লোর, লম্বার্ড নেই সেখানে, একা দাঁড়িয়ে আছেন আর্মস্ট্রং। মিঃ লম্বার্ডকে দেখছি না, তিনি কোথায়?
জানি না তো, ভ্রু কুঁচকে বললেন আর্মস্ট্রংদেখুন গিয়ে নতুন কোনো মতলব উতলব এসেছে আবার মাথায়। সেটা খতিয়ে দেখতে চলে গেলো বোধ হয়। এখানকার সব ব্যাপার আর সমস্ত লোকগুলোর রকম-সকম কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে আমার কাছে। এ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা কম নয়।
দুশ্চিন্তা কি শুধু আপনার একার, আমাদের সকলেরই।
আমি তো অস্বীকার করছি না। আসলে আমি চিন্তিত ম্যাক আর্থারের ব্যাপারে।
কেন তাকে নিয়ে আপনার আবার দুশ্চিন্তা কিসের?
দুশ্চিন্তা কিসের জানতে চান? কি জানি কেন, আজ সকাল থেকে তাকে দেখে আমার মনে একটা সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
সন্দেহ?
হ্যাঁ, সন্দেহ বৈকি। তাহলে কথাটা বলেই ফেলি। আমার ধারনা ম্যাকআর্থারই সেই উন্মাদ, যাকে আমরা সবাই খুঁজে বেড়াচ্ছি।
আমি মানসিক রোগের চিকিৎসক নই, ডাঃ আর্মস্ট্রং মাথা নেড়ে বললেন, তবু বলবো এতো তাড়াতাড়ি এমন একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে, এখনই আসা ঠিক হবে না।
তা অবশ্য ঠিক। আর আমিও তাকে ঠিক খুনী বলে ঠাওর করছি না। ঐ রকম ধরনের আর কি।
বিচিত্র কিছু নয়। হয়তো দেখা যাবে আমাদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে থেকে কলকাটি নাড়ছে। এই সময় লম্বার্ডকে ফিরে আসতে দেখে আর্মস্ট্রং প্রসঙ্গ বদল করে বলে উঠলেন ঐ তো মিঃ লম্বার্ড এসে গেছেন।
একটা বড় পাথরের টুকরোর সঙ্গে দড়িটা শক্ত করে বেঁধে দড়িটা নিচে ঝুলিয়ে দিয়ে সেটা দুহাতে ধরে নিচে ঝুলে পড়লো লম্বার্ড। এবং অচিরেই গিয়ে হাজির হলো নিচে।
তা দেখে ব্লোর আর থাকতে না পেরে মন্তব্য করলেন, লোকটা খুব একটা সুবিধের নয়। চালচলন যেন কেমন।
একটু বেপরোয়া গোছের। ভয় ডর নেই, এই তো?
ভয় তো আমার এখানেই। বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে এ পর্যন্ত কত খারাপ কাজই না করেছে। তার হিসেব কেউ আপনারা জানেন না বলে তো আমার মনে হয় না। ক্লোরের চোখে মুখে একটা ঘৃণার ভাব ফুটে উঠতে দেখা গেলো। একটু থেমে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ডঃ আর্মস্ট্রং, আপনি কি সঙ্গে পিস্তল, জাতীয় কোনো আগ্নেয়াস্ত্র রাখেন?
না তো, অবাক চোখে তাকালেন আর্মস্ট্রং তা পিস্তল আমি এখানে আনতে যাবো কিসের আশঙ্কায়?
