কেন কি আবার হলো? জিজ্ঞেস করলো লম্বার্ড।
দেখুন না লোকটা বলে কি, সময় নাকি খুব অল্প, আমাদের কারোর নাকি বোঝার ক্ষমতা নেই। তার ভাবখানা এই যে আমার উপস্থিতিতে বিরোক্তবোধ করছে সে, অতএব
দারুণ অসামাজিক লোক তো আনমনে বলে উঠলেন আর্মস্ট্রং সত্যিই ভদ্রতা জানে না লোকটা।
বুঝি সময় তাদেরও সংক্ষিপ্ত। লম্বা লম্বা পা ফেলে পাহাড়ের চূড়ার ওপর উঠে এলেন তারা।
দূরে, বহুদূরে সমুদ্রের ওধারে আবছায়ায় মতো সারি সারি পাহাড় ভেসে উঠলো। চোখের সামনে। আর সেই পাহাড়গুলোর আড়ালে রয়েছে বহু পরিচিত সেই গ্রাম, অতি প্রিয় গ্রাম স্টিকলহ্যাভেন। এলোমেলো বাতাস, জলের ঢেউগুলো উত্তাল হয়ে উঠেছে। অশান্ত সমুদ্র যে কোনো মুহূর্তে ঝড় উঠতে পারে লণ্ড ভণ্ড করে দিতে পারে নিগার আইল্যান্ড। যে উদ্দেশ্যে এখানে আসা সেই লোকের কোনো চিহ্ন দেখা গেল না।
ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো লম্বার্ডের। আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেলো তো। দূরের ঐ গ্রামের মানুষগুলোর চোখে এখানকার কোনো সংকেত ধরা পড়বে না, কি বিশ্রী কাণ্ড বলুন তো।
রাত্রে মশাল নেড়ে সংকেত পাঠালে ওরা নিশ্চয় দেখতে পাবে, অন্য দুই সঙ্গীর সমর্থন পাওয়ার আশায় কৌতূহলী চোখ নিয়ে তাকালো ব্লোর কি বলেন?
তাতেও কোনো ফল পাওয়া যাবে না, বোঝালো লম্বার্ড, মিঃ ওয়েন কি অতো বোকা ভেবেছেন? দেখুন গিয়ে আগে থেকেই গ্রামের লোকদের বুঝিয়ে রেখেছেন তিনি, আমরা মশাল জ্বেলে স্ফুর্তি করবো। ওরা যেন অন্য কিছু ভেবে সাড়া না দেয়।
এটা তো আপনার ধারণা মাত্র।
হতে পারে, তবে একেবারে অযৌক্তিক নয়। দেখুন গিয়ে গ্রামের লোকদের তিনি। শাসিয়ে রেখেছেন এক এক করে আমাদের সকলকে খতম না করা পর্যন্ত গ্রামের কেউ যদি দ্বীপের দিকে এগোয় তাহলে তার অবস্থাও ঠিক আমাদের মতো হবে।
হ্যাঁ সবই সম্ভব ঐ বদ্ধ পাগলটার পক্ষে। হতাশ ভাবে তাকিয়ে বললেন আর্মস্ট্রং এখন কোনো কিছুতেই অবিশ্বাস করার মতো মনের জোর যেন হারিয়ে ফেলেছি আমি।
হঠাৎ লম্বার্ড প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে উঠলো, একটা দড়ি পেলে কাজ হতো। দড়ি বেয়ে নীচে নেমে ওদিকটা দেখে আসতাম একবার। ওদিকটাই সেই বদ্ধ পাগলটার লুকোবার একমাত্র জায়গা বলে আমার মনে হয়। তা আপনারা কেউ একটা দড়ির সন্ধান দিতে পারেন।
মতলটা বেশ ভালই। ছটফট করে উঠলেন ব্লোর, কি আশ্চার্য কাছে তো দড়ি টড়ি কিছু নেই, দেখি প্রাসাদে পাওয়া যায় কিনা। একটু দাঁড়ান, আমি যাবো আর আসবো। বলেই তিনি ছুটলেন প্রাসাদ অভিমুখে।
এই ফাঁকে আকাশের দিকে তাকালো লম্বার্ড। আকালো মেঘের ঘন ঘটা। বাতাসের তীব্রতা বাড়ছে। একটু পরেই ঝড় উঠতে পারে।
এবার সে তার দৃষ্টি নামিয়ে এনে ফেললো আর্মস্ট্রং এর মুখের ওপরে। কি মনে করে বললো সে, কি ব্যাপার আপনার মুখে কথা নেই যে। আবার কি ভাবছেন?
ভাবছি, ম্যাকআর্থারের কথা ভাবছি। লম্বার্ডের দিকে পলক-পতনহীন চোখে তাকিয়ে বললেন ডঃ আর্মস্ট্রং মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি লোকটা উন্মাদ…বেলা যে যায় যায়…… রোদ্দুরের রঙ বদল হতে দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠলো ভেরা। মিস্ ব্লেন্টের সঙ্গ বড় একঘেয়ে লাগছে এখন। সকালে তার সেই মনের দৃঢ় ভাবের কথা মনে পড়তেই তার প্রতি একটা বিরূপ মনোভাব গড়ে উঠলো। মুখের সেই কাঠিন্য, চোখের দৃষ্টিতে অকরুণ তীক্ষ্মতা এখন সবই বুজরুকি বলে মনে হচ্ছে। মুখে তিনি যতোই ঈশ্বরের নাম নিন না কেন। উনি নিজেই তো এক ঘোর পাপী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তো মিথ্যে নয়। একটি গর্ভবতী নারীর জীবন নষ্ট করে দেওয়ার অর্থ হলো দু-দুটো জীবনের ইতি টেনে দেওয়া, এটা কি তার কম অন্যায় নয়, কম পাপ নয়। এই যে উনি এখন নির্বকার চিত্তে চেয়ারে শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে উল বুনছেন, দেখে মনে হয় যেন, তিনি একজন নিপাট ভালমানুষ। ভাল মানুষ না ছাই, ও সব ভে, স্রেফ ভেক্ ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।
আর ঐ যে ওপাশে বিচারপতি ওয়ারগ্রেভ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এই অবেলায় বসে বসে ঝিমুচ্ছেন, ঐ বৃদ্ধ লোকটাও কি কম শয়তান, কম পাপী। কল্পনা করে নেয় ভেরা, এডওয়ার্ড সিটন যেন ওয়ারগ্রেভের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আসামীর কাঠগড়ায়, ন্যায় বিচারের আশায়। জ্বলজ্বলে চোখ, দীর্ঘ সুঠাম চেহারা। বেচারা! বিচারের রায় বেরুনোর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতে পারেনি যে ঐ শয়তান বিচারপতির জন্যই অসময়ে তাকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে।
মিস্ ব্লেন্টের সঙ্গ এড়িয়ে একা একা হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে এসে পৌঁছালো সমুদ্রের ধারে। তার পায়ের শব্দ কানে যেতেই সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফেরালেন ম্যাকআর্থার। শান্ত সংযত চাহনি। ভেরা বিস্মিত, তার সেখানে উপস্থিতির কথা জানতেন নাকি ম্যাকআর্থার?
ভেরার অনুমান আন্দাজ করে নিয়ে ম্যাকআর্থার বলে উঠলেন, এসো ভেরা আমি তোমাকেই প্রত্যাশা করছিলাম এতোক্ষণ।
ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসে প্রশ্ন চোখে তাকালো তার দিকে, এমন নির্জন সমুদ্র প্রান্তে একা একা বসে থাকতে ভাল লাগে বুঝি আপনার?
হ্যাঁ, লাগে বৈকি। এখানে এক প্রত্যাশায় বসে থাকার একটা আলাদা আমেজ আছে যা অন্য কোথাও পাবে না তুমি।
প্রত্যাশা? কার! কিসের?
শেষের সেই দিনটির প্রত্যাশা। যেদিন পড়বে মোর পায়ের চিহ্ন এ সমুদ্রতটে–সেই সেই দিনটির প্রত্যাশা। জানো ভেরা আমরা যেদিন জন্মাই, ঠিক সেই দিন থেকেই শেষের দিনটির প্রত্যাশায় আমরা সবাই বসে থাকি। তুমি, আমি সবাই, কি ঠিক বলি নি?
