তার কথা শুনে আর্মস্ট্রং যে একেবারে বোবা বনে গেলেন। লম্বার্ডের মুখের দিকে বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে থেকে তার বক্তব্যটা উপলব্ধি করতে চাইলেন।
যাই হোক, সে নিজেকে যতো চতুরই ভাবুক না কেন, সে একটা মারাত্মক ভুল করে বসে আছে শুরুতেই। একটা ছোট দ্বীপে যে আমাদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে। আর দ্বীপটাও মোটামুটি ফাঁকা নির্জন। চলুন দ্বীপটা ঘুরে দেখে আসি। বাছাধন যেখানে থাকুন না কেন, এখানকার এই ছোট্ট জায়গায় তাকে ঠিক আমরা খুঁজে বার করতে পারবো। চলুন যাওয়া যাক–
কিন্তু অমন একজন বিপজ্জনক লোকের সঙ্গে
আরে মশাই যতোই সে বিপজ্জনক লোক হোক না কেন, এতো ভয় পেলে কি চলে? তাছাড়া সে তো রক্তে মাংসে গড়া একজন লোক তো বটে! তার মতো একজন বিপজ্জনক লোকের সঙ্গে কি ভাবে মারাত্মক হয়ে উঠতে হয়, সে কৌশল আমার জানা আছে। তবে আমি আপনি ও মিঃ ব্লোর, এই তিনজন ছাড়া অন্য কাউকে জানাবার দরকার নেই। পরে প্রয়োজন হলে অন্যদের জানালেই চলবে।
পুতুল দুটি উধাও হওয়ার কাহিনী শুনে ব্লোর তো আকাশ থেকে পড়লেন যেন। তেমনি অবাক হয়ে তিনি বললেন, আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না, সায়ানাইড মার্স্টানের গ্লাসে মেশানো হল কি করে?
এ প্রশ্ন আমারো প্রত্যুত্তরে বললো লম্বার্ড, তবে এ ব্যাপারে আমার অনুমান এই রকম জানালার ওপর মদের গ্লাস নামিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় মনে হয় বাইরের থেকে কেউ হাত বাড়িয়ে তার গ্লাসে সায়ানাইড ফেলে দিয়ে থাকবে। আর মারাত্মক বিশ মেশানো সেই মদ পান করেই তার মৃত্যু ঘটে থাকবে।
বিশ্বাস করতে পারছেন না ব্লোর। তাই বা কি করে সম্ভব। আমাদের এতগুলো লোকের দৃষ্টি এড়িয়ে
তখন আমরা কি ঠিক মতো নজর রাখতে পারছিলাম? লম্বার্ড যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলো, আমরা তো তখন নিজেদের সমস্যা নিয়ে এমন ব্যস্ত ছিলাম যে, কোথায় কি ঘটেছে, তা দেখার অবসর কোথায় তখন আমাদের।
কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তার কথায় সায় দিলেন ডঃ আর্মস্ট্রং সেই অদৃশ্য মানুষের কঠোর আদেশ শুনে আমরা তখন কেউ আর স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলাম না। সেই অবস্থায়
যাই হোক, গতশ্চ-শোচনা নাস্তি। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন ব্লোর এখন আমাদের ভবিষ্যতে যা ঘটার সম্ভবনা রয়েছে সেটা দমন করার জন্য আগে-ভাগে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, যাতে কেউ আর সেই বদ্ধ পাগলটার শিকার না হতে পারে। আচ্ছা আপনাদের কারোর কাছে পিস্তল আছে?
হ্যাঁ আছে বৈকি। ট্রাউজারের হিপ পকেটের উঁচু হয়ে ফুলে থাকা অংশটার প্রতি ব্লোরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো লম্বার্ড।
হাসলেন ব্লোর, ওটা কি আপনি সব সময় সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ান?
হুঁ, তবে খুব একটা ঝামেলায় না পড়লে বের করি না।
ঝামেলা কি এখানে নেই? মৃদু হাসলেন ব্লোর আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে। ওৎ পেতে কোথায় কোন্ পাথরের আড়ালে সে যে বসে আছে, আমরা কেউ জানি না। অথচ তার মাথার পোকাগুলো কিলবিল করে উঠলেই যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আমাদের কারোর উপর। কোনো পাগল যদি একবার ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করে তাহলে আর রক্ষা নেই।
সব পাগলই ভয়ঙ্কর হয় না, দৃঢ়স্বরে বললেন আর্মস্ট্রং এমন কিছু কিছু পাগল আছে, যাদের দেখলে মনেই হয় না তারা পাগল বা উন্মাদ। তবু দেখা যাক, আসল পাগলকে ঠিক চিনে বের করা যায় কিনা।
তারা তিনজন তাদের অভিযান শুরু করলেন অতঃপর। ছোট্ট দ্বীপ হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পথ যায় ফুরিয়ে। তিনজনের দৃষ্টিই সতর্ক, ছোট খাটো পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু করে সমুদ্রের প্রান্ত সীমানা পর্যন্ত। কিন্তু তেমন সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়ল না তাদের। গুহা কিংবা ঝোপঝাড় কিছুই নেই, যেখানে সেই উন্মাদটা লুকিয়ে থাকতে পারে। নিরাশ হয়ে অবশেষে তারা এসে নামলেন সমুদ্রের দক্ষিণ পূর্ব দিক বরাবর। মনে আছে, গতকাল লঞও এসে থেমেছিল এখানেই। জেটির সামনে এসে থামকে দাঁড়ালেন তারা তিনজন। জেনারেল ম্যাকআর্থারকে অদূরে নিশ্চল স্ট্যাচুর মতো বসে থাকতে দেখে। দূর মহা দিগন্তে চলে গেছে তার দৃষ্টি। দূর থেকে তাকে দেখে মনে হলো, যেন এক ধ্যানমগ্ন যোগী। বেগতিক সমস্ত দুঃখ শোক ভুলে গিয়ে তিনি যেন এখানে এসে বসেছেন পরম শান্তির অন্বেষণে।
সঙ্গী দুজনকে অপেক্ষা করতে বলে ব্লোর একা এগিয়ে গেলেন ম্যাকআর্থারের কাছে। তার পায়ের শব্দ হলে, কিন্তু তাতে এতটুকু বিচলিত হলেন না ম্যাকআর্থার। তেমনি নিশ্চল–হয়ে বসে রইলেন।
তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইচ্ছে করে কাশলেন ব্লোর, তাতেও তার কোনো ভাবান্তর না হওয়াতে তিনি এবার সরাসরি বলেই ফেললেন বাঃ খাসা একটা জায়গা বেছে নিয়েছেন তো আপনি।
তাতে কাজ হলো। ধীরে ধীরে ব্লোরের দিকে মুখ ফেরালেন ম্যাকআর্থার। সময় ক্রমেই কমে আসছে মিঃ ব্লোর। এ সময় আমি একটু একা থাকতে চাই, দয়া করে আপনি যদি
অপ্রস্তুত হলেন ব্লোর। কৈফিয়াত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, আপনাকে বিরক্ত করে বিন্দুমাত্র অভিপ্রায় আমার নেই। বেড়াতে বেড়াতে এসে পড়েছি এখানে, তাই আর কি।
আপনাদের কারোরই বোঝার ক্ষমতা নেই? অনুযোগ করলেন ম্যাকআর্থার একা থাকতে আমার ভাল লাগে। নিঃসঙ্গতা আমার বড় প্রিয়।
এরপর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না। ফিরে চললেন ব্লোর তার সঙ্গীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। তারপর তারা তিনজন এগিয়ে চললেন সামনে পাহাড়ের দিকে। চলার পথে উষ্মা প্রকাশ করলেন ব্লোর, বিচিত্র স্বভাবের লোকটা, মানুষের সঙ্গে কি ভাবে কথা বলতে হয় তাও শেখেনি।
