কোন্ কোন্ ব্যাপারে?
এমন কতগুলো অপরাধ আছে, যা খালি চোখে ধরা যায় না। তবে একটু যদি তলিয়ে দেখা যায়। সত্য প্রকাশ পাবেই। দৃষ্টান্ত স্বরূপ প্রথমে রগার্স দম্পতি এবং পরে স্বনামধন্য বিচারপতি মিঃ ওয়ারগ্রেভের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে এ-প্রসঙ্গে।
আচমকা ধাক্কা খাওয়ার মতো করে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন আমস্ট্রং তাহলে এবার বলেই ফেলি মিঃ লম্বার্ড, তখন ওয়ারগ্রেভ আমাদের যে গল্পটা বললেন, আপনি সেটা বিশ্বাস করেন?
ওঁর মতো ধড়িবাজ লোকের কথায় বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনো প্রশ্নই থাকতে পারে না। এই ধরুন না কেন, এডওয়ার্ড সিটনকে এমন কায়দা করে তিনি সরিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশই থাকতে পারে না। নিজের সাফাই গেয়ে তিনি তো বলেই দিয়েছেন, বিচারকের আসনে বসে আমি আইনের দাসত্বগিরি করেছি মাত্র, এর মধ্যে অন্যায় কিছুই থাকতে পারে না। বাঃ বাঃ চমৎকার অজুহাত, শেষ দিকে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠতে দেখা গেলো লম্বার্ডের ঠোঁটে।
সিগারেট টান দিতে গিয়ে সেই মুহূর্তে আর্মস্ট্রং যেন সেই কোন্ সুদুর অতীতে তার হাসপাতালে চার দেওয়ালে ঘেরা অপারেশন টেবিলের সামনে গিয়ে হাজির হলেন। স্বগোতোক্তি করলেন, খুন। হা এ ভাবেই নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে অবশ্যই খুন করা যায় বৈকি। একটা কেন হাজারটা। খুন–
কিন্তু ডঃ আর্মস্ট্রং। লম্বার্ডের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলেন আর্মস্ট্রং। এই নিগার দ্বীপে আমাদের সকলকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে কি থাকতে পারে মিঃ ওয়েনের?
সেটা তো আমার প্রশ্ন। আর্মস্ট্রং-এর মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে, রগার্সের স্ত্রীর মৃত্যুটা আরো যেন ভাবিয়ে তুলেছে আমাদের। একটা ছন্দ বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে মনের মধ্যে, কিছুতেই তার সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না। তবে কি তার স্বামী তাকে খুন করলো? নাকি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাই করলো সে।
আত্মহত্যা? অসম্ভব! বিশেষ করে মার্স্টানের মৃত্যুর পর মিসেস রগার্সের মৃত্যুটাকে কিছুতেই আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া যায় না। মাত্র বারো ঘন্টার মধ্যে দুদুটো আত্মহত্যা, ভাবা যায় না, একরোখা যুবক, জীবনে যে কাউকে ভয়ডর করলো না, সত্য-মিথ্যা জানা নেই, তার বিরুদ্ধে দুটো বাচ্চাকে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছে জেনে আত্মহত্যা করবে সে? না হিসেবে বড্ড বেশী গরমিল দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া এখানে সে সায়ানাইটই পেলে কোথা থেকে। এ ত আর চকোলেট বিস্কুট নয় যে, পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে।
হ্যাঁ, এ প্রশ্নটা আমার মনেও জেগেছে বৈকি! এর একটা উত্তরই আমি খুঁজে পেয়েছি, হতে পারে।
হতে পারে কেউ তার মদের গ্লাসে সায়ানাইড মিশিয়ে দিয়ে থাকবে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে, অতি সন্তর্পণে, আর এভাবেই অতি নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তাকে খুন করে থাকবে সে। হ্যাঁ, হা, অবশ্যই খুনই হন মার্স্টান, নিষ্ঠুর খুন।
যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন আর্মস্ট্রং লম্বার্ডের যুক্তিগ্রাহ্য মতামত শুনে। তাই উৎসাহিত হয়ে তিনি এবার জানতে চাইলেন, আর মিসেস রগার্সের মৃত্যুটা?
বলবো, সব বলবো, সিগারেটে ঘন ঘন কয়েকটা টান দিয়ে লম্বার্ড তার কথার জের টেনে বললো, মার্স্টানের মৃত্যু আর রগার্সের মৃত্যুর মধ্যে কোথায় যেন একটা মিল আমি খুঁজে পেয়েছি। আপাত দৃষ্টিতে এ-দুটো মৃত্যুই নিছক আত্মহত্যা বলে প্রতিপন্ন হতে পারে। তবে এর পিছনে একটা রহস্য অবশ্যই লুকিয়ে আছে। আর সেই রহস্য।
.
০৮.
এই রহস্যের প্রসঙ্গে একটা ঘনটার কথা আমার মনে পড়ে গেলো। খানিক আগে রগার্স আমাকে ডেকে নিয়ে যায় তার রান্নাঘরে। আপনার বোধ হয় জানা নেই সেই দশটি চীনামাটির পুতুল আর সেই বিত্তবানদের খেয়ালী কবিতার কথা? তারপর সেই দশটি পুতুলের কাহিনী সংক্ষেপে বললেন আর্মস্ট্রং।
সব শোনার পর লম্বার্ড তো থ। অবাক ভাবটা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগলো লম্বার্ডের। কি আশ্চর্য! ছিলো দশটি কালো মানিক, এখন রইলো আট। এ যে দেখছি ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানাকেও হার মানায়।
দশটি, কালো মানিক, দশটি কালো হীরে।
আর এক দফা চমকানোর পালা লম্বার্ডের। বড় অদ্ভুত ব্যাপার তত। কবিতাটির সঙ্গে ঘটনার কি অদ্ভুত মিল রয়েছে। মার্স্টানের মৃত্যু হলো দম বন্ধ হয়ে। আর রগার্সের বৌ সেই যে রাত্রে ঘুমলো, সে ঘুম আর ভাঙলো না তার।
তাহলে?
তাহলে আবার কি! এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আমরা এক বদ্ধ পাগলের শিকার হতে চলেছি। হয়তো আমাদের কারোর আর রেহাই নেই। এক এক করে আমাদের দশজনকেই সেই পাগলটার হাতে প্রাণ হারাতে হবে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, কি অদ্ভুত তার দূরদর্শিতা।
কিন্তু সেই পাগলটাই বা কোথায়? আমাদের এখনে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে সে নিজেই তো গরহাজির। এই নির্জন দ্বীপে আমরা দশজন ছাড়া আর কেউ নেই, রগার্সও তাই বলেছে। তাহলে?
রগার্স আমাদের ভুল তথ্য পরিবেশন করেছে। কিংবা এও হতে পারে, ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলে সে আমাদের ভুল পথে চালিত করতে চেয়েছে।
না মিথ্যে সে বলতে পারে না, তার হয়ে সাফাই গাইল আর্মস্ট্রং। দেখলে না, ভয়ে আতঙ্কে লোকটা একেবারে পঙ্গু হয়ে গেছে। মিথ্যে বলার মতো মনের দৃঢ়তা এখন তার নেই।
গভীর ভাবে চিন্তা করলো লম্বার্ড। তারপর জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললো যে লোকটার কি রকম আক্কেল দেখুন, বেলা গড়িয়ে যেতে চললো, অথচ লারে কোনো পাত্তা নেই। এটা তো তার একটা চালাকি। তার পরিকল্পনা মাফিক এক এক করে আমাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় কাউকে এই দ্বীপ থেকে পালাতে দেবে না সে।
