কিন্তু কি?
কদিন যেতে না যেতেই তার আসল রূপ প্রকাশ পেতে থাকলো। সে যে অতি হীন চরিত্রের মেয়ে, ব্যাভিচারিণী, সেটা তখনি বোঝা গেলো-বহু পুরুষের সঙ্গে তার অবাধ মেলামেশা। তার সেই অবৈধ প্রণয়, বহু পুরুষ-ভোগ্যার ফল ফলালো অচিরেই। এমন এক নীতি জ্ঞানহীন দুশ্চরিত্র মেয়েকে ক্ষমা করার কথা মনেই এলো না। তাই বিদায় করে দিলাম তাকে। বিতাড়িত বেট্রিস গেলো তখন তার বাবা-মায়ের কাছে। কিন্তু তারাও তাকে ক্ষমা করতে পারলো না, আশ্রয় মিললো না সেখানে তার। তারপর–
তারপর তার কি হাল হলো?
তারপর আর কি? এ সব মেয়েদের যা হয়ে থাকে তাই হলো শেষ পর্যন্ত। বিবেকের দংশন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো সে। একটা পাপ ঢাকতে গিয়ে আর একটা পাপ করে বসলো সে।
আত্মহত্যা? চমকে উঠলো ভেরা, তার মৃত্যুর খবর শুনে আপনি নিশ্চয়ই খুব দুঃখ পেয়েছিলেন, মনে মনে নিশ্চয় আপনার অনুশোচনা হয়েছিল।
দুঃখ? তা কেন হবে? আর অকারণ নিজেকে অপরাধীই বা ভাবতে যাবে। কেন?
না, মানে–অমন কঠোর না হয়ে তাকে যদি ক্ষমা করতেন, তাহলে হয়তো সে আত্মহত্যার পথটা বেছে নিতো না।
জোরে জোরে মাথা নাড়লেন এমিলি, বেট্রিসের ব্যাপারে আমার করার কিছু ছিলো না। সে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছে। হ্যাঁ, আমি এখানে উপলক্ষ্য মাত্র। ঈশ্বরই বিচার করবেন তার পাপের।
তারপর আর একটা কথাও বললেন না এমিলি, তার দৃষ্টি তখন গিয়ে পড়লো সমুদ্রের দিকে, তখন তার মুখে আর কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না। ঈশ্বরের ওপর পাপ পুণ্য বিচারের ভার সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে অটুট মনোভাব নিয়ে বসে রইলেন তিনি।
হঠাৎ তার সেই পরিবর্তন দেখে দারুণ ভয় পেলো ভেরা, চমকে উঠলো।
ওদিকে একটা চেয়ারের ওপর অর্ধশায়িত অবস্থায় আধবোজা চোখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ওয়ারগ্রেভ। অদূরে লম্বার্ড ও ফ্লোর নিঃশব্দে পায়চারি করছেন পাশাপাশি।
ওয়ারগ্রেভের সামনে এসে দাঁড়ালেন ডঃ আর্মস্ট্রং। তিনি তখন ভাবছিলেন আলোচনার প্রয়োজনের কথা, কিন্তু কার সঙ্গেই বা আলোচনা করবেন, সেটাই তো একটা চিন্তার বিষয়। ওয়ারগ্রেভ। বিচারক তিনি, সূক্ষ, ন্যায়-নীতি, অপরাধ-নিরপরাধ, এসব ব্যাপারে তার বিচারের নিরীখে বহু মামলার নিষ্পত্তি তিনি করেছেন, কিন্তু এ-ব্যাপারে তিনি যে কতটা কাজে লাগতে পারেন, সেটা বলা মুশকিল। বরং লম্বার্ডকেই বেছে নেওয়া যেতে পারে, যোগ্য লোক সে, বয়সে তরুণ, চটপটে, কথা-বার্তায় তুখোড় মেধাবী অতএব
কথাটা ভাবামাত্র ইশারায় তিনি তাকে কাছে ডেকে বললেন শুনুন, মিঃ লম্বার্ড আপনার সঙ্গে জরুরী আলোচনা ছিলো।
জরুরী আলোচনা। হেসে বললো লম্বার্ড, বেশ তো, ওদিকটায় চলুন, ফাঁকা। আছে–
অপেক্ষাকৃত একটু ফাঁকা। জায়গায় এসে একটু ইতস্তত করে বললেন আর্মস্ট্রং দেখলেন তো চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে চোখের সামনে কি সব ঘটনা ঘটে গেলো, এ-ব্যাপারে আপনার কি ধারণা?
মিসেস রগার্সের এই আকস্মিক মৃত্যুর ব্যাপারে আপনার কি মনে হয়? ব্লোর যে, কাহিনী শোনালেন, বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় আপনার?
না? সব বাজে কথা। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো লম্বার্ড, জোর করে একটার সঙ্গে আর একটা সূত্র মেলানো হয়েছে।
আপনি যথার্থই বলেছেন। আপনার যুক্তি আমি সমর্থন করি।
ধরে নেওয়া যাক, অমন একটা জঘন্য অপরাধ করা সত্ত্বেও এতোদিন ওরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিলো। কিন্তু আজই হঠাৎ ভেঙ্গে পড়লো কেন? তাছাড়া আরো একটা কথা আছে–তারা যে তাদের মনিবকে খুন করেছে তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। এক্ষেত্রে তাদের অপরাধীই বা ভাবি কি করে বলুন।
হ্যাঁ, সে কথাও ঠিক। তবে এ-ব্যাপারে আজ সকালেই রগার্সের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। রগার্সের বক্তব্য হলো, তার মালকিন মিস ব্রাডির হার্টের অসুখ ছিলো। আমি একজন চিকিৎসক আমি জানি, এই সব রোগের সাময়িক উপশমের জন্য এ্যামাইল নাইট্রাইট ওষুধ ব্যবহার করা হয়, রোগীর যখন শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তখন এই ওষুধের এ্যাম্পুল ভেঙ্গে নাকের কাছে মেলে ধরলে তার শ্বাস কষ্টের উপশম হয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই, কিন্তু ভুলক্রমে কিংবা একটু অসাবধানতাবশতঃ যদি একফোঁটা সেই তরল পদার্থ তার পেটে চলে যায়, তাহলে আর নিস্তার নেই। রোগীর মৃত্যু হতে বাধ্য।
অবাক বিস্ময়ে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ডঃ আর্মস্ট্রং-এর বিশ্লেষণ শুনছিল লম্বার্ড। তার কথা শেষ হতেই জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলে উঠলো সে, দারুণ চমৎকার একটা পরিকল্পনা তো।
তাই তো বলছি মিঃ লম্বার্ড। একটা সিগারেট ধরিয়ে আর্মস্ট্রং তার কথার জের টেনে বললেন, কতই না সহজ, কোনো ঝামেলা নেই, থাকবে না কোনো প্রমাণ কিংবা চিহ্ন। এর জন্যে ব্যবহার করতে হবে না আর্সেনিক কিংবা সায়ানাইড। কোনো রকমে এক ফোঁটা এ্যামাইল নাইট্রাইট রোগীর পেটে পৌঁছে দিতে পারলেই হলো, ডাক্তারের বাবার ক্ষমতা নেই তার জীবন ফিরিয়ে দেওয়া।
আর পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পাকস্থলীতে সেই ওষুধের চিহ্ন আবিষ্কৃত হলেও সন্দেহের কিছু থাকতে পারে না। অজুহাত হিসাবে বলা যেতে পারে, নাকে শোঁকাতে গিয়ে এক ফোঁটা তরল পদার্থ অসাবধানতাবশতঃ চলে গেছে, এতে দোষ কোথায় বলুন? সে তো আর ইচ্ছে করে
কিছুক্ষণ গভীর চিন্তার পর লম্বার্ড বললো, তাহলে এখন একটা ব্যাপারে আশ্বস্ত হওয়া গেলো।
